জ্যোতির হাত ধরে সচ্ছল ৪০০ নারী
নিজের বাসায় কেক তৈরির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন ফাতিমাতুজ জোহরা জ্যোতি সমকাল
প্রদীপ শীল, রাউজান (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০২৬ | ০৬:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
একসময় রাউজান ইংলিশ স্কুলের শিক্ষক ছিলেন ফাতিমাতুজ জোহরা জ্যোতি। একই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করতেন তাঁর স্বামী মোহাম্মদ আরমান। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় বন্ধ হয়ে যায় তাঁর স্কুল। কর্মহীন হয়ে পড়েন জ্যোতি-আরমান দম্পতি, দুয়ারে কড়া নাড়ে অভাব।
কিন্তু থেমে থাকেননি জ্যোতি। ঘরবন্দি সময়কে কাজে লাগিয়ে তিনি শুরু করেন অনলাইনভিত্তিক খাবারের ব্যবসা। ‘ডেইলি ফ্রেশ’ নামে একটি ফেসবুক পেইজ খুলে কেকসহ বিভিন্ন খাবারের অর্ডার নেওয়া শুরু করেন তিনি। অনলাইনে অর্ডার করা খাবার মোটরসাইকেলে করে গ্রাহকের বাসায় পৌঁছে দিতেন তাঁর স্বামী আরমান।
এই শিক্ষক দম্পতি অল্প সময়ে রাউজানে ‘খাবার উদ্যোক্তা’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্বামী শিক্ষকতার পেশায় ফিরে যান। জ্যোতি তাঁর ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন। তিনি নিজের বাসায় একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করেছেন। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক নারী খাবারের ব্যবসা শুরু করেছেন। গত সাড়ে তিন বছরে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার পাশাপাশি তিনি হাটহাজারী, রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া উপজেলার প্রায় ৪০০ নারীকে খাবার তৈরিতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তারা সবাই জ্যোতির মতোই ব্যবসা খুলেছেন, সচ্ছলতার মুখ দেখেছেন। এ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন সরকারের পক্ষ থেকে অদম্য সফল নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি।
রাউজান উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফাতিমাতুজ জোহরা জ্যোতি নিজের বাসা মুন্সিরঘাটা থেকে করোনাকালে ব্যবসা শুরু করেন। শুরুতে তিনি ঝাল আইটেম–বিরিয়ানি, ফ্রোজেন ফুড, পিজ্জা, বার্গার ও শর্মা বিক্রি করতেন। পরে তিনি লক্ষ্য করেন, গ্রাহকদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ কেকের প্রতি। ২০২৩ সাল থেকে ‘ডেইলি ফ্রেশ’-এ কেক বেকিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেন জ্যোতি। তাঁর লক্ষ্য ছিল শুধু নিজে সফল হওয়া নয়, অন্য নারীদেরও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া।
গত সাড়ে তিন বছরে ২৫টি ব্যাচে ৪০০ বেশি নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। পাউন্ড কেকের পাশাপাশি তিনি বিরিয়ানি, ফ্রোজেন ফুড, পিজ্জা, বার্গার, শর্মা, আইসক্রিম ও বিস্কুট তৈরির কোর্স পরিচালনা করছেন। এর মাধ্যমে তিনি যেমন অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জন করেছেন, তেমনি অন্য নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথও তৈরি করে দিয়েছেন।
ফাতিমাতুজ জোহরা জ্যোতি সমকালকে বলেন, ‘সময় মানুষকে অনেক পথ ও মতের দিকে নিয়ে যায়। তার উদাহরণ আমি নিজেই। চেষ্টা করলে মানুষের পক্ষে অসম্ভব বলে কিছুই নেই। একজন নারী হয়ে শিক্ষকতার পেশা ছেড়ে আমি ব্যবসায়ী হব—এটা কোনোদিন ভাবিনি। আমার মনোবল ও পরিবারের সহযোগিতায় আমি এতদূর আসতে পেরেছি। আমি আরও ৪০০ জন নারীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পেরেছি। এটিই আমার সবচেয়ে বড় সফলতা।’
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা আকলিমা সুলতানা সমকালকে ‘২০২৫ সালে অদম্য নারী পুরস্কার কর্মসূচির আওতায় ফাতিমাতুজ জোহরা জ্যোতিকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে অনন্য অবদান রেখে চলেছেন।’
- বিষয় :
- সফল উদ্যোক্তা
