বিপজ্জনক পাওয়ার কারে যাত্রী কেন
তৌফিকুল ইসলাম বাবর
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৩৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাত সাড়ে ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যাবে তূর্ণা নিশিতা। তার কিছু সময় আগে এক তরুণ চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকেই এদিক-সেদিক তাকাচ্ছিলেন। এ সময় সামনেই পেয়ে গেলেন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) এক সদস্যকে। সেই তরুণকে ওই আরএনবি সদস্য নিয়ে গেলেন ট্রেনটির পাওয়ার কারের দরজার সামনে দাঁড়ানো রেলওয়ের একজন কর্মীর কাছে। কথাবার্তার এক ফাঁকে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে দিতেই তরুণটিকে পাওয়ার কারের ভেতরের দিকে নিয়ে যান ওই রেলকর্মী। এরপর ভেতরে ব্যাগটি রেখে বাইরে এসে প্ল্যাটফর্ম থেকে পানি কিনছিলেন তিনি।
জানতে চাইলে আহসান মোরশেদ নামে সেই তরুণ সমকালকে বলেন, ‘জরুরি কাজে প্রায় ঢাকায় যেতে হয়। কখনও ট্রেনের টিকিট পাওয়া যায়, কখনও পাওয়া যায় না। টিকিট না পেলে ট্রেনে দায়িত্বে থাকা লোকজনকে টাকা দিয়ে উঠে পড়ি। এবারও ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। ভেতরে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে তারা।’
আন্তঃনগর, মেইল ও কমিউটার ট্রেনগুলোতে নিয়মিত এমন ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম-ঢাকা, চট্টগ্রাম-সিলেট, চট্টগ্রাম-চাঁদপুরসহ বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোতে টাকার বিনিময়ে যাত্রী নিচ্ছেন রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। যেসব ট্রেন বেসরকারিভাবে পরিচালনা করা হয়, সেগুলোতে ঠিকাদারদের নিয়োজিত কর্মচারীরাও একই কাজ করেন। ট্রেনের খাবারের বগি, নামাজের স্থান, ইঞ্জিন রুম, গার্ড রুমসহ হাঁটাচলার জায়গাগুলোতেও যাত্রী নেওয়া হয়। বাদ যায় না সংরক্ষিত ও বিপজ্জনক ট্রেনের ‘পাওয়ার কারও! এ জন্য ট্রেন ও দূরত্বভেদে ২০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়।
গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ট্রেন ‘চট্টলা এক্সপ্রেসের’ পাওয়ার কারে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে একটি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কোচও পুড়ে গেছে। গত বছরের ৩ এপ্রিল গাজীপুরের শ্রীপুরের সাতখামাইর এলাকায় ময়মনসিংহগামী মহুয়া কমিউটার ট্রেনের পাওয়ার কারে আগুনের ঘটনা ঘটে। বারবার দুর্ঘটনার পেছনে পাওয়ার কারে অবৈধ যাত্রী পরিবহন একটি কারণ বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
ট্রেনের ‘পাওয়ার কারে’ থাকে জেনারেটরচালিত একটি স্বয়ংক্রিয় বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা। যেখান থেকে লোকোমেটিভ (ইঞ্জিন) ছাড়া পুরো ট্রেনে লাইট, ফ্যান ও শীততাপ সচল রাখতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফলে ট্রেনের পাওয়ার কারে বা জেনারেটর কারের ভেতরে বা বাইরে ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই কারে থাকে উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, জেনারেটরের অতিরিক্ত তাপ, শব্দ এবং আগুনের ঝুঁকি থাকায় যাত্রীদের জন্য এই স্থানটি ঝুঁকিপূর্ণ।
দুর্ঘটনার কারণে গত বছরের ৬ এপ্রিল আন্তঃনগর, মেইল বা কমিউটার ট্রেনের পাওয়ার কারের বাইরে বা ভেতরে কোনো যাত্রী না নিতে এই নির্দেশনা দেয় রেলওয়ে। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের প্রধান বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, পাওয়ার কারের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় যাত্রী পরিবহন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। যাত্রী পরিবহন প্রতিরোধ করতে স্টেশনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র সেকশন ইঞ্জিনিয়ারদের (এসএসএই) নজরদারি বাড়াতে হবে।
জানা গেছে, চট্টলা এক্সপ্রেস ট্রেনের পাওয়ার কারের দায়িত্বে ছিলেন রেলওয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মী জাহেদুল হক ও মোহাম্মদ মনসুরের। তবে প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীরা সেই বগি থেকে কয়েকজনকে বের হয়ে আসতে দেখেন। স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে– দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের বাইরে যারা বগিটি থেকে নেমেছেন, তারা কারা? ধারণা করা হচ্ছে, তারা মূলত টাকার বিনিময়ে ওঠা অবৈধ যাত্রী।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী সবুক্তগীন বলেন, ‘ট্রেনে যাতে কেউ অবৈধভাবে যাত্রী পরিবহন করতে না পারে সে জন্য সময় সময় অভিযান চালানো হয়। এটা পুরোপুরি বন্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে। রেলওয়ের কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- গাড়ি
