টেকনাফের ঘরে ঘরে সন্তান হারানোর কান্না
আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ১২ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
মোহাম্মদ আনাছ টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ হাজি বশির আহমদ উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণির ছাত্র। ১৪ বছর বয়সী আনাছের নেশা ছিল ফুটবল। বিদেশে ফুটবল খেলার প্রলোভন দেখিয়ে তাকে ঘর থেকে বের করে আনে মানব পাচারকারী চক্রের দালালরা। পরে মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয় চক্রের হাতে। কৌশলে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে তাকে তুলে নেওয়া হয় নৌকায়। পরে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত দালালচক্র তার পরিবারের কাছে ফোনে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। টাকা না দিলে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেয়। পরিবার সর্বস্ব বিক্রি করে মুক্তিপণ দিলেও ছেলেকে ফিরে পায়নি। টেকনাফে অসংখ্য কিশোর তরুণকে জোরপূর্বক মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে। অনেক কিশোর খেলতে গিয়ে অপহৃত হয়েছে পাচারকারীদের হাতে। টেকনাফের ঘরে ঘরে এখন মানব পাচারের করুণ গল্প। অসংখ্য পরিবার অপেক্ষায়– কখন ফিরবে তাদের স্বজন। মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখের সামনেই ঘটছে সমুদ্রপথে নিষ্ঠুর মানব পাচার বাণিজ্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সাগরপথে মানব পাচারের ঘটনায় কক্সবাজারে ৩ হাজার ১৩৪ মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্য বেশির ভাগই রোহিঙ্গা। এসব ঘটনায় উখিয়া-টেকনাফ থানায় ১ হাজার ১০০ জনকে আসামি করে ১১৫টি মামলা করা হয়েছে। এদের মধ্য ৬০০ পাচারকারীকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি সেন্টমার্টিন দ্বীপের ৩০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় একটি কাঠের নৌকাসহ সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাচারের সময় নারী-শিশুসহ ২৬৩ জনকে উদ্ধার করেছে নৌবাহিনী। এ সময় আটক করা হয়েছে পাচারকারী চক্রের ১০ সদস্যকে।
আনাছের পরিবারের অভিযোগ, পাচারের পর টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা মালয়েশিয়া অবস্থানরত মো. ইব্ররাহীম ফোনে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং টাকা না দিলে আনাছকে হত্যার হুমকি দেয়। ধারদেনা করে মুক্তিপণ পরিশোধ করলেও আজও ছেলেকে ফিরে পায়নি। বরং অভিযুক্ত দালালরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও পুলিশ তাদের ধরছে না।
আনাছের মা ছমুদা বেগম বলেন, ‘তিন মাস হয়ে গেল আমার ছেলেকে এখনও ফিরে পাইনি। ফুটবল খেলার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় দালালরা আমার ছেলেকে বিক্রি করে দেয়, সাগরপথে মালয়েশিয়া পাচার করে। পরে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়ায় মালয়েশিয়া অবস্থানরত শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা দালাল ইব্রাহীমের কথা মতো তার ভাতিজা স্থানীয় মো. ফারুকসহ স্বজনকে তিন লাখ টাকা দিই। তবে এখনও ছেলেকে ফিরে পাইনি। এ বিষয়ে স্থানীয় পুলিশসহ জনপ্রতিনিধির কাছে অভিযোগ দিয়েছি, তবে কোনো সুরাহা হয়নি।’
এদিকে সম্প্রতি সীমান্তবর্তী নাফ নদী ও সাগর সংলগ্ন শাহপরীর দ্বীপের ঘোলার চর এলাকা ঘিরে মানব পাচারের তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ছোট ছোট ট্রলারে করে লোকজনকে প্রথমে গভীর সমুদ্রে নেওয়া হচ্ছে, এরপর সেখানে অবস্থানরত বড় জাহাজে তুলে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এদের মধ্যে অনেকে জোরপূর্বক পাচারের শিকার, যাদের পরিবার মুক্তিপণ পরিশোধ করেও স্বজনদের ফিরে পাচ্ছেন না।’
পাচারের আব্দুর রহমানের বাড়ি টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের উত্তরপাড়ায়। তার ভাই আব্দুস
সালাম বলেন, ‘আমার ভাই খেলতে বের হয়ে নিখোঁজ। কয়েকদিন পর জানতে পারি, স্থানীয় দালালচক্র তাকে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করেছে। সেখানে পৌঁছানোর পর দালালরা আমাদের কাছে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এবং টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়। এত টাকা জোগাড় করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
রাতের আঁধারে প্রতিদিন টেকনাফের ১৫ পয়েন্ট দিয়ে চলছে মানব পাচার। মানব পাচারের অভিযোগ রয়েছে শাহপরীর দ্বীপের মোহাম্মদ তাহের, মোহাম্মদ ইসমাইল, শাহাব মিয়া, মো. আজগর, নুরুল নবী, হেলাল উদ্দিন, মো. ফেরুজ, পোয়া মাঝি, শওকত আলম, নজির আহমেদ, আবু তাহের, মাম্মা, নজরুল পুতু, লাল মিয়া, শাহজান মিয়া, সৈয়দ উল্লাহ, মো. শামীম কাসু, মো. ফয়সাল, আব্দুল আমিন, মো: হোসন, প্রকাশ মাহসন, মো. হাসান প্রকাশ আতুড়ি, রেজাউল করিম (মোরাদ), মাহামুদুল হক, মোহাম্মদ আমিন প্রকাশ বদ্দা মাঝি, আজিজুল হক, মোহাম্মদ দেলোয়ার, জামাল হোছন, মোহাম্মদ রফিক প্রকাশ বার্মায়া রফিকের বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘মানবপাচার একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ, যা প্রতিরোধে পুলিশ সর্বোচ্চ তৎপর রয়েছে। দালালচক্রের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মানবপাচার সম্পূর্ণভাবে বন্ধে আমরা প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছি এবং এ বিষয়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়াগামী ট্রলার সংক্রান্ত কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলো আমরা খতিয়ে দেখছি। উপকূলীয় এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অন্যান্য বাহিনীও সক্রিয়ভাবে দায়িত্ব পালন করছে।’
- বিষয় :
- সন্তান
