ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘ভালো থেক, বাচ্চাদের দেখ, আমি মালয়েশিয়া যাচ্ছি’

‘ভালো থেক, বাচ্চাদের দেখ, আমি মালয়েশিয়া যাচ্ছি’
×

নাতি রাশেদের খবর না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাজাখালীর সাফুরা খাতুন সমকাল

 হিরু আলম, পেকুয়া (কক্সবাজার) 

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

২ এপ্রিল সকালে চট্টগ্রাম শহরে কাজে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। রাত ৮টা ২০ মিনিটে স্ত্রীর কাছে আসে শেষ ফোন– ‘ভালো থেক। বাচ্চাগুলোকে দেখ। আমি মালয়েশিয়া যাচ্ছি। ধারদেনা করে বাচ্চাদের দুধ ও ওষুধের ব্যবস্থা করিও। মালয়েশিয়া পৌঁছে ফোন দেব।’ এরপর আর কোনো খবর নেই মো. বেলালের। স্ত্রী সুমি আক্তার (১৮) এখন দুই শিশুসন্তান নিয়ে দিশাহারা। তিনি আহাজারি করতে করতে বলেন, ‘আমি বিধবা হতে চাই না। আমার বাচ্চাগুলোকে এতিম বানাইয়েন না। আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেন।’
পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী ইউনিয়নের ৭ পরিবারে এখন শোকের মাতম। নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় ট্রলারডুবির ঘটনায় নিখোঁজ এসব পরিবারের মানুষ। কেউ সন্তান, কেউ স্বামীর অপেক্ষা রয়েছেন। কিন্তু কারও খোঁজ মিলছে না।

গত ১-৫ এপ্রিল টেকনাফ উপকূল থেকে অন্তত তিনটি ট্রলার পাঁচ শতাধিক বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাকে নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা দেয়। এর মধ্যে একটি ট্রলার ৮ এপ্রিল সকালে আন্দামান সাগরে ডুবে যায়। ৯ এপ্রিল আন্দামান সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া নয়জনকে গভীর সমুদ্রে টহলরত কোস্টগার্ডের জাহাজ ‘মনসুর আলী’র কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশের পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজ ‘মোটর ট্যাংকার মেঘনা প্রাইড’। রাজাখালী ইউনিয়নের যেসব বাসিন্দা নিখোঁজ তারা হলেন– মিয়াপাড়ার আব্দুর রহিমের ছেলে মো. বেলাল (২০), আব্দুল মালেকের ছেলে মো. রহিম (২০), হাজিরপাড়ার শহিদুল ইসলামের ছেলে মো. সোহেল (২১), আহমদ ছবির ছেলে মো. এহেসান (১৯), নুরুল আমিনের ছেলে রাশেদুল ইসলাম (১৯), নতুন ঘোনার বাদশা মিয়ার ছেলে রহুল কাদের (২২) ও শহিদুল্লাহর ছেলে মানিক (২৪)।
মিয়াপাড়ার অটোরিকশাচালক মো. বেলাল উদ্দীন (২৪) সাত মাস বয়সী জমজ দুই ছেলেকে রেখে পাড়ি দেন অজানা পথে। 
উদ্ধারকারীদের বরাত দিয়ে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন সাংবাদিকদের জানান, ৯ এপ্রিল দুপুরে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের কাছাকাছি এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় আটজন পুরুষ ও একজন নারীকে উদ্ধার করে বাংলাদেশি জাহাজটি। রাশেদের নানি সফুরা খাতুন বলেন, ‌‘নাতিটা আমার চোখের সামনেই হয়েছে, এখন তার কোনো খবর পাচ্ছি না। আর কিছু চাই না, নাতিটাকে ফেরত চাই।’
কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, ‘ট্রলারডুবির ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেখানে আসলে কী হয়েছে বা কতজন ট্রলারে ছিল সে বিষয়ে আমাদের জানার 

সুযোগ ছিল না। আমাদের কাছে নয়জনকে হস্তান্তর করার পর আমরা তাদেরকে দেশে নিয়ে আসি।’
ফিল্মস ফর পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ সিদ্দিকী বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করে বুঝেছি, দেশে বেকারত্ব বৃদ্ধিই মানবপাচারের একটি বড় কারণ। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তারাও এসব দালাল চক্রের সাথে জড়িত রয়েছে বলে ধারণা করা যায়। দালালরা মূলত অসহায় শ্রেণির দরিদ্র পরিবারের বেকার ও অভাবী মানুষগুলোকে টার্গেট করে থাকে এবং বিো পয়সায় মালেশিয়া নিয়ে যাওয়ার লোভ দেখায়। বলে মালেশিয়া পৌঁছে টাকা দিলেই হবে। বিশাল অংকের বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়েই বোটে তুলে তাদের। ২০১৫ সালে মালয়েশিয়া-থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী ঘন জঙ্গলে মানব পাচারকারীদের পরিত্যক্ত আস্তানা থেকে অনেকগুলো গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়, যা আন্তর্জাতিকভাবে তোলপাড় সৃষ্টি করে। মানব পাচারের এই বিশাল নেটওয়ার্ককে ভাঙতে সরকারি ও বেসরকারি  পদক্ষেপ এবং সচেতনতা তৈরি করতে হবে।’

কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজদের কোনো হদিস এখন পর্যন্ত মেলেনি এবং ডুবে যাওয়া ট্রলারটিরও কোনো ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ রাশেদের মামা মোহাম্মদ দিদার (৪০) টেকনাফ থানায় গিয়ে কোনো কার্যকর সহায়তা পাননি বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘ছবি আর ঠিকানা নিয়ে থানা পুলিশ আমাদের তাড়িয়ে দিয়েছে। একটু ভালো করে কথাও বলেনি, বলেছে খোঁজ পেলে জানাব।’
রাজাখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য নেজাম উদ্দিন নেজু বলেন, ‘শুধু টেকনাফের না, স্থানীয় একটা চক্রও অবৈধ পথে মালয়েশিয়া নেওয়ার কাজে জড়িত আছে। তারা দরিদ্র, বেকার তরুণদের টার্গেট করে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আরও পরিবার শেষ হয়ে যাবে।’
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক শরীফ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। তবে এখনো কোনো ভুক্তভোগী পরিবার লিখিত বা মৌখিক কোনো অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×