ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঠিকাদার পলাতক, বন্ধ শতকোটি টাকার কাজ

ঠিকাদার পলাতক, বন্ধ শতকোটি টাকার কাজ
×

 প্রদীপ শীল, রাউজান (চট্টগ্রাম) 

প্রকাশ: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর রাউজানের উন্ননয়কাজ ফেলে অনেক ঠিকাদার পালিয়ে যান। এতে প্রায় শতকোটি টাকার নির্মাণকাজ স্থবির হয়ে পড়ে। স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় উপজেলা প্রকৌশলীর বিশেষ প্রচেষ্টায় উপ-ঠিকাদার নিয়োগ করে অর্ধেকের বেশি কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা পাঁচটি সড়ক নিয়ে বিপাকে পড়েছে কর্তৃপক্ষ। এসব প্রকল্পের আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ ঠিকাদাররা চূড়ান্ত নোটিশের পরও কাজে ফিরছেন না। ফলে স্থানীয় সরকারের সড়ক উন্নয়নকাজ বন্ধ থাকায় স্থানীয় মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন, নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পদ।

এলজিইডি বলছে, পলাতক বা আত্মগোপনে থাকা ঠিকাদারদের চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিছু ঠিকাদার উপ-ঠিকাদার নিয়োগ (কাজ বিক্রি) করায় কাজের সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেসব ঠিকাদার চূড়ান্ত নোটিশ পেয়েও ফিরছেন না, তাদের চুক্তি বাতিল করে নতুন চুক্তির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একটি সড়কের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারের চুক্তিপত্র বাতিল করা হয়েছে।
অসমাপ্ত পাঁচ সড়কের মধ্যে একটি দক্ষিণ রাউজানের বাগোয়ান ইউনিয়নে ব্রাহ্মণ হাট-পাঁচখাইন সড়ক। ২০২৩ সালে সড়ক উন্নয়নে ১ কোটি ২০ লাখ টাকার দরপত্র আহ্বান করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। প্রমিতা কনসেন্ট্রেশন নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি পায়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সড়কের কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিমের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার শওকত হোসেন আত্মগোপনে চলে যান। তিনি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সদস্য সচিব। উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়ার পরও সড়কের কাজ শুরু না করায় ঠিকাদার বাতিল করা হয়েছে। পুনরায় দরপত্র আহবান করা হবে সড়ক নির্মাণে।
২ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে হলদিয়া ভিক্ষুভানু পুর সড়ক উন্নয়নকাজ পায় কাসেম এন্টারপ্রাইজ। ২০২৫ সালে সড়কটির নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এই ঠিকাদারও আত্মগোপনে চলে যান। পরে ঠিকাদার হিসেবে উপজেলা যুবলীগের সহসভাপতি সারজু মোহাম্মদ নাছের চুক্তিবন্ধ হন। উপ-ঠিকাদার হিসেবে সড়কের কাজ শুরু করেছেন উত্তর জেলা যুবদলের সহসম্পাদক খোরশেদ আলম জিকু। উপ- ঠিকাদারকে সময় বাড়িয়ে ২০২৬ সালের এপ্রিলে কাজ শেষ করতে বলা হয়। কিন্তু উপ-ঠিকাদারও সড়কে কংক্রিট-বালু ফেলে চার মাস আগে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। কার্পেটিংয়ের কাজ এখনও শুরুও করেননি। 

এ প্রসঙ্গে উপ-ঠিকাদার খোরশেদ আলম জিকু বলেন, ‘কিছুদিনের মধ্যেই অসমাপ্ত কাজ শেষ করা হবে। পাথর আনা হয়েছে। ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে বাজারে একদিকে বিটুমিনের সংকট ও অন্যদিকে উপকরণের দাম বাড়ার কারণে তাজ শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। সরকারিভাবে বিটুমিন ক্রয় করার আবেদন করা হয়েছে।
৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ডাবুয়া ইউনিয়নের কান্দি পাড় সড়ক নির্মাণকাজের টেন্ডার পায় তাসফিয়া এন্টারপ্রাইজ। কাজটি ২০২৪ সালের শেষের দিকে শেষ হওয়ার কথা। ঠিকাদার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা সাজ্জাদ হোসেন সড়কে কংক্রিট-বালুর ঢালাই দিয়ে কার্পেটিংয়ের কাজ ফেলে রেখে লাপাত্তা। একই ইউনিয়নের ধর বাড়ি দরগা সড়কের টেন্ডার পেয়েছিল বায়েজিদ বোস্তামী এন্টারপ্রাইজের মালিক পৌরসভার মেয়র জমির উদ্দিন পারভেজ। তিনিও কার্পেটিংয়ের কাজ ফেলে পলাতক। ১ কোটি ৬৯ লাখ টাকায় এ সড়ক নির্মাণকাজ ২০২৫ সালের শুরুর দিকে শেষ হওয়ার কথা ছিল। উপজেলা প্রকৌশলী জানান, মেয়াদ বাড়িয়ে উপ-ঠিকাদারের মাধ্যমে সড়কের বাকি কাজ করা হবে। ইতোমধ্যে আত্মগোপনে থাকা মেয়রের আরও দুটি সড়কের কাজ শেষ করেছেন উপ-ঠিকাদার বিএনপি নেতা বদিউল আলম। সড়ক দুটি হলো কলমপতি নাগেশ্বর গার্ডেন সড়ক ও ডাবুয়া গণির ঘাট সড়ক।

৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে হলদিয়া ইউনিয়নের রোস্তম শাহা সড়ক নির্মাণকাজ ২০২৪ সালে শুরু হয়ে ২০২৫ সালে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ঠিকাদার যুবলীগ নেতা সালাউদ্দিন লাপাত্তা হওয়ায় উপ-ঠিকাদার নিয়োগ হয়। এখন তিনিও লাপাত্তা বলে স্থানীয়রা জানান। এ ছাড়া কয়েকটি ছোট সড়কের ঠিকাদার পালিয়ে যাওয়ায় দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। ৩৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে চিকদাইর আকবর শাহ সড়কের সেকশন-২-এর ৫০০ ফুট কাজ অসমাপ্ত রেখে পালিয়েছেন ঠিকাদার। স্থানীয় শাহাদাত হোসেন সাজ্জাদ অভিযোগ করেন, ঠিকাদার চট্টগ্রাম শহরে অবস্থান করছেন। তিনি ইচ্ছা করে কাজ শেষ না করে স্থানীয়দের দুর্ভোগে ফেলেছেন।
এ প্রসঙ্গে উপজেলা প্রকৌশলী আবুল কালাম সমকালকে বলেন, ‘এলাকার মানুষের সহযোগিতায় ঠিকাদারের ফেলে যাওয়া অর্ধশত সড়ক, সেতু ও কালভার্টের কাজ শেষ করা হয়েছে। সময় বাড়িয়ে দিয়ে অনেক উপ-ঠিকাদারকে কাজ করতে সহযোগিতা করেছি। বাকি ৫-৬টির কাজ চলমান আছে। বিটুমিন সংকট ও দাম বৃদ্ধিও কারণে এসব কাজ ধীরগতিতে হচ্ছে। তবে বর্ষার আগেই অসমাপ্ত সড়কের কাজ শেষ হবে বলে আমি আশাবাদী।’

আরও পড়ুন

×