ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পিলারে ফাটল দরজা-জানালা ভাঙা টয়লেট পরিত্যক্ত

পেকুয়া

পিলারে ফাটল  দরজা-জানালা ভাঙা   টয়লেট পরিত্যক্ত
×

 হিরু আলম, পেকুয়া (কক্সবাজার) 

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্যোগের আভাস পেলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পেকুয়া উপজেলার উপকূলীয় জনপদে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যাপ্রবণ এ অঞ্চলের হাজারো মানুষের কাছে আশ্রয়কেন্দ্রই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই এখন জীর্ণশীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ। এতে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে তিন ইউনিয়নের বাসিন্দাদের।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, পেকুয়া উপজেলার তিন উপকূলীয় ইউনিয়নে মোট ১৬টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে ৯টি বর্তমানে জীর্ণশীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। মগনামার কাকপাড়া আশ্রয়কেন্দ্র ইতোমধ্যে বঙ্গোপসাগরে বিলীন হয়ে গেছে। বাইন্যাঘোনা, মটকাভাঙ্গা ও সোনালী বাজার এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে প্রায় ২০ হাজার মানুষ নিরাপদ আশ্রয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।

উপজেলার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী হওয়ায় প্রতিবছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে হয় স্থানীয়দের। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের স্মৃতি এখনও তাড়া করে ফেরে অনেককে। জনসংখ্যার তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের স্বল্পতা এবং বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর বেহাল অবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অধিকাংশ মানুষ মাছ ধরা, লবণ চাষ ও শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। নিম্ন আয়ের এসব পরিবারের বেশির ভাগই বেড়িবাঁধের পাশে অস্থায়ী ঘরে বসবাস করেন। ফলে বর্ষা বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় জীবন রক্ষার একমাত্র উপায় হয়ে ওঠে আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া। তবে যে আশ্রয়কেন্দ্র একসময় নিরাপত্তার প্রতীক ছিল, এখন সেগুলোর অনেকই পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে। ভাঙা দেয়াল, খসে পড়া পলেস্তারা, মরচেধরা লোহার রড আর চুরি হয়ে যাওয়া দরজা-জানালা– সব মিলিয়ে এসব ভবনে আশ্রয়ের বদলে বাড়ছে ঝুঁকি।
সরেজমিন মগনামা ইউনিয়নের মটকাভাঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্র কাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটির দেয়াল ও পিলারের পলেস্তারা খসে পড়ে ভেতরের রড বেরিয়ে এসেছে। কাঠের দরজা ভেঙে গেছে, জানালার গ্রিল নেই, বারান্দার রেলিং প্রায় বিলুপ্ত। ভেতরে পড়ে থাকা ভাঙা আসবাবপত্রে জমেছে ধুলা ও ময়লা। স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল কবির বলেন, ‘এই আশ্রয়কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ছয় হাজার মানুষ। কিন্তু এখন ঝড়ের সময় কোথায় যাব, সেই চিন্তায় ঘুম আসে না।’

বাইন্যাঘোনা আশ্রয়কেন্দ্রে ব্র্যাক স্কুল পরিচালনা করেন শিক্ষক শাহানা আক্তার শাহিন। তিনি বলেন, ভবনটিতে এখন কোনো বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। চোরের দল ফ্যান, লাইট, বৈদ্যুতিক তারসহ প্রায় সব সরঞ্জাম নিয়ে গেছে। তীব্র গরমে শিক্ষার্থীরা কষ্টে ক্লাস করে। এ ছাড়া ভবনের পিলারে ফাটল, সিঁড়ির রেলিং ভাঙা এবং টয়লেট পরিত্যক্ত।
উজা নটিয়ার সুতাচুড়া ঠান্ডার পাড়া আশ্রয়কেন্দ্রেও একই চিত্র। ভবনের পিলারে ফাটল, কোথাও কোথাও বেস পিলার হেলে পড়েছে। নেই বিদ্যুৎ, সুপেয় পানি বা টয়লেট। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি এখন মাদকাসক্তদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছে। এক বাসিন্দা বলেন, “এই ভবনটি যে কোনো সময় ধসে পড়তে পারে। ঝড় এলে আমরা কোথায় যাব, তা ভেবে আতঙ্কে থাকি।”
পেকুয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কাউছার আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর এই অবস্থা হয়েছে। বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
মটকাভাঙ্গা এলাকার গৃহবধূ দিলফুরুজ বেগম এখনও ভুলতে পারেন না ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের ভয়াবহতা। তিনি বলেন, “সেই ঝড়ে চোখের সামনে তিন সন্তানকে হারিয়েছি। এখনও সেই ভয় কাটেনি। এখনকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর অবস্থা দেখলে মনে হয় আবারও এমন কিছু ঘটতে পারে।” 

আরও পড়ুন

×