ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

পাঁচ লাখ দিয়ে শুরু, খামারে এখন ৩ কোটি টাকার গরু

পাঁচ লাখ দিয়ে শুরু, খামারে এখন ৩ কোটি টাকার গরু
×

নিজেই গরুকে গোসল করান, খাবার খাওয়ান কুসুমপুরা ইউনিয়নের খামারি আবদুল কাদের সমকাল

 আহমদ উল্লাহ, পটিয়া (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

এক সময় বেকারত্বের হতাশায় দিন কাটত। চাকরির জন্য ছোটাছুটি করেও ফল পাননি। তবে দমে যাননি পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের আবদুল কাদের। ১০ বছর আগে মাত্র পাঁচটি গরু নিয়ে শুরু করেন খামার। বর্তমানে তার রয়েছে ১৩৫টি গরু। এসবের দাম প্রায় ৩ কোটি টাকা। এখন তিনি পরিচিত ‘গরু কাদের’ নামে।

কাদের জানান, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এবার ৭০টি গরু প্রস্তুত করেছেন। দেশীয় খাবার ও প্রাকৃতিক উপায়ে গরু মোটাতাজা করা হয়েছে। কোনো ক্ষতিকর ইনজেকশন বা স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয় না।  এ ছাড়া ৬০টি গরু থেকে প্রতিদিন পাওয়া যায় ৭০০ থেকে ৭৫০ লিটার দুধ। প্রতি লিটার দুধ ৭০ টাকা দরে বিক্রি করে প্রতিদিন তার আয় হয় ৩৫ হাজার টাকা। 
গত রোববার সকালে সরেজমিন দেখা যায়, বিশাল জায়গাজুড়ে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে বিভিন্ন জাতের গরু। এক পাশে দুগ্ধজাত গরু, অন্য পাশে মোটাতাজাকরণ ইউনিট। পরিচ্ছন্ন পরিবেশে কর্মচারীরা ব্যস্ত গরুর পরিচর্যায়। কোথাও খড় কাটার কাজ চলছে, কোথাও গরুকে খাওয়ানো হচ্ছে ঘাস ও বিশেষ খাদ্য।
জানা যায়, কুসুমপুরা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের হাজী নুর হোসেন সওদাগরের ছেলে আবদুল কাদের বায়তুশ শরফ মাদ্রাসা থেকে আলিম পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করলেও চাকরি পাননি। পরে বেকারত্ব দূর করতে নিজের বাড়িতেই গড়ে তুলেন গরুর খামার।

২০১৬ সালে প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে পাঁচটি মোটাতাজা ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরু দিয়ে শুরু করেন খামার। ধীরে ধীরে পরিশ্রম, পরিকল্পনা ও পরিচর্যার মাধ্যমে খামার বড় করতে থাকেন। মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে ২০২২ সালে তার খামারে গরুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২০টিতে। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৩৫টি।
আবদুল কাদেরের মেসার্স একে সাফা এগ্রো ফার্মে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি টাকা মূল্যের গরু রয়েছে। এর মধ্যে একটি ব্রাহামা জাতের গরুর ওজন প্রায় ২৫ মণ, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ১০ লাখ টাকা। এ ছাড়া ১১ মণ ওজনের একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গরুর দাম হতে পারে প্রায় ৬ লাখ টাকা। কাদের বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবা ঘরে দুই-চারটি গরু পালন করতেন। বাবার কাছ থেকেই গরু পালনের অনুপ্রেরণা পেয়েছি। ধীরে ধীরে এটাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছি। এখন এই খামারই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।’
কাদের আরও বলেন, ‘শুরুতে অনেকেই বলত গরুর ব্যবসা করে লাভ হবে না। কেউ কেউ নিরুৎসাহিতও করতেন। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। প্রথম দিকে নিজের হাতে সব কাজ করেছি। গরুকে গোসল করানো, খাবার দেওয়া, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সব নিজেই করতাম। এখন খামারে কয়েকজন কর্মচারী কাজ করছেন।’
তবে খামার পরিচালনায় নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে জানান এই উদ্যোক্তা। তাদের বলেন, ‘বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা পশুখাদ্যের দাম বৃদ্ধি। খড়, ভুসি, ভুট্টা– সবকিছুর দাম বেড়েছে। সরকার সহজ শর্তে ঋণ ও খাদ্যে ভর্তুকি দিলে আরও অনেক তরুণ এই খাতে আসতে পারতেন।’

স্থানীয়রা জানান, আবদুল কাদেরের সফলতা দেখে এলাকার অনেক যুবক এখন গরু পালনে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। কেউ ছোট পরিসরে একটি বা দুটি গরু দিয়ে শুরু করছেন, আবার কেউ বাণিজ্যিকভাবে গরু মোটাতাজাকরণের উদ্যোগ নিচ্ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইলিয়াছ বলেন, ‘এটি একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। উপজেলার অনেক মানুষ গরু পালন করেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। অনেক বেকার তরুণের কর্মসংস্থান হচ্ছে। প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে খামারিদের বিনামূল্যে ঘাস চাষের কাটিং দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রোগবালাই প্রতিরোধে পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবাও দেওয়া হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

×