মেঘনায় ইলিশের জন্য হাহাকার
মেঘনা নদীতে সারাদিন জাল ফেলে এক-দুটির বেশি মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা সমকাল
মিসু সাহা নিক্কন, রামগতি (লক্ষ্মীপুর)
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
রামগতি উপজেলার মেঘনা নদীতে আশানুরূপ ইলিশ না মেলায় উপকূলজুড়ে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক স্থবিরতা। ভরা মৌসুমেও জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় মৎস্যজীবী, আড়তদার, পাইকার, দাদন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে হাজারো জেলে পরিবারে নেমে এসেছে হতাশা।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরে মেঘনা নদীতে অসংখ্য ডুবোচর জেগে ওঠায় নদীর নাব্য ও গভীরতা কমে গেছে। ফলে ইলিশের স্বাভাবিক বিচরণ ও অভিবাসন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদী দূষণ, পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তনও ইলিশ উৎপাদন কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রামগতি মাছঘাটের আড়তদার মো. ফেরদৌস বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর মেঘনায় ইলিশের পরিমাণ ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কম। এতে পুরো উপকূলীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।’ নৌকার মালিক লিটন ব্যাপারী জানান, স্থানীয় নদীতে মাছ না পাওয়ায় জেলেদের এখন ৬০ থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে হচ্ছে। এতে ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু আয় বাড়েনি। বরং অনেকেই ঋণের বোঝা নিয়ে দিন পার করছেন।
৬৬ বছর বয়সী অভিজ্ঞ জেলে বিউল হক মাঝি বলেন, ‘রামগতি সীমান্তজুড়ে ছোট-বড় একাধিক ডুবোচর সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষায় এগুলো পানির নিচে থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে দৃশ্যমান হয়। তাঁর মতে, এসব চরই মেঘনায় ইলিশ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ।’
চরগাজী জেলেপল্লির বাসিন্দা প্রাণ কৃষ্ণ জলদাশ বলেন, ‘চাঁদপুর সীমান্ত থেকে নোয়াখালীর হাতিয়া পর্যন্ত মেঘনার বিস্তীর্ণ এলাকায় নতুন নতুন চর জেগে উঠেছে। দৃশ্যমান চর ছাড়াও নদীর তলদেশে রয়েছে আরও বেশ কয়েকটি বড় ডুবোচর।’
রামগতি বাজারের ব্যবসায়ী বিজয় মাহমুদ মামুন বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা পুরোপুরি নদীকেন্দ্রিক। নদীতে মাছ না থাকলে বাজারেও ক্রেতা থাকে না। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।’ জেলে ফিক মাঝি জানান, ভরা মৌসুমেও ইলিশ না পাওয়ায় পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দাদন ও এনজিওর ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এ বছর মেঘনায় পোয়া ও তপসে মাছের পরিমাণ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কোডেক চরগাজী শাখার ব্যবস্থাপক মো. শাহজাহান বলেন, ‘নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় মানুষের আয় কমেছে। ফলে ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বাড়ছে এবং অনেকেই সঞ্চয়ের টাকা তুলে সংসার চালাচ্ছেন।’
সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. সৌরভ উজ জামান বলেন, ‘জেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার। এর মধ্যে রামগতিতে রয়েছেন ২৩ হাজার ১০০ জন। চলতি অর্থবছরে নদী থেকে ইলিশ আহরণ হয়েছে ৫ হাজার ২৭ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।’
তিনি আরও বলেন, নদীর প্রবেশমুখে ডুবোচর সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, সময়মতো বৃষ্টি না হওয়া, পানির তাপমাত্রা ও লবণাক্ততার পরিবর্তন, নদীর নাব্য হ্রাস এবং দূষণের কারণে ইলিশের উৎপাদন ও অভিবাসন পথ পরিবর্তিত হতে পারে। নদীতে পর্যাপ্ত ইলিশ ফিরলে এ অঞ্চলের অর্থনীতিও আবার সচল হবে।’
- বিষয় :
- মাছ ধরা