সংরক্ষিত বন কেটে স্থানীয় সরকার বিভাগের সড়ক
পেকুয়ার টৈটং ইউনিয়নের গলাছিরা তিনমোয়া এলাকায় সংরক্ষিত বন কেটে তৈরি করা হয়েছে সড়ক সমকাল
হিরু আলম, পেকুয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতায় ও জাইকার সহায়তায় পরিচালিত উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের (ইউজিডিপি) অধীনে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পাহাড় কেটে প্রায় ৩০০ মিটার দীর্ঘ সড়ক তৈরি করা হয়েছে। সেই সড়ক দিয়েই বনের গভীরে প্রবেশ করছে যানবাহন। এরপর ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন এবং পাহাড় থেকে মূল্যবান গাছ কেটে পাচার করা হচ্ছে সমতলে।
কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের গলাছিরা তিনমোয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে এমন কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে বনবিভাগ। একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।
সম্প্রতি সরেজমিন যায়, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাঝখান দিয়ে পাহাড় কেটে প্রশস্ত একটি কাঁচা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। সড়কের দুই পাশে কাটা পাহাড়ের ঢাল স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই সড়ক ব্যবহার করে ভারী যানবাহন বনের ভেতরে প্রবেশ করছে। বনাঞ্চলের ভেতরে একাধিক স্থানে বালু উত্তোলনের চিহ্নও দেখা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণের সুযোগে বালু উত্তোলন ও বনজ সম্পদ পাচার করে আসছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গলাছিরা তিনমোয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরের ছড়া থেকে বালু উত্তোলনের সুবিধার্থেই সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিদিন ওই পথে বালুবাহী ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ছমি উদ্দিন ও মোহাম্মদ হোছাইন বলেন, ‘পাহাড়ের ভেতরের ছড়া থেকে উত্তোলিত বালু পরিবহনের জন্যই পাহাড় কেটে এই সড়ক তৈরি করা হয়েছে। প্রতিদিনই বালুবাহী ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়।’
বন বিভাগ সূত্র জানায়, লিখিত অভিযোগ পাওয়ার পর সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দেলোয়ার হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)’-এর পেকুয়া উপজেলা সমন্বয়ক ও পরিবেশকর্মী দেলওয়ার হোসাইন বলেন, ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, অবৈধ বালু উত্তোলন ও বনজ সম্পদ পাচার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এটি কোনো একদিনের ঘটনা নয়; পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দ্রুত অবৈধ কার্যক্রম বন্ধ করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চল পুনরুদ্ধার, নিয়মিত নজরদারি বৃদ্ধি এবং বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। অন্যথায় পেকুয়ার জীববৈচিত্র্য, পাহাড়ি প্রতিবেশ ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।’
এ বিষয়ে টৈটং বিট কর্মকর্তা মোতালেব আল মুমিন বলেন, ‘আমি এখানে মাত্র দুই মাস আগে যোগদান করেছি। অভিযোগে যেসব ঘটনার কথা বলা হয়েছে, তার বেশির ভাগই আমার যোগদানের আগে সংঘটিত হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে যতটা সম্ভব অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে কাজ করছি।’
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। স্থানীয় একজন ইউপি সদস্য জানিয়েছেন, ইউজিডিপি প্রকল্পের আওতায় সড়কটি নির্মাণ করা হয়েছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তদন্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অনিয়ম বা অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রমাণ মিললে বন বিভাগ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি প্রকল্পের আওতায় সড়ক নির্মাণই হয়ে থাকে, তাহলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর পাহাড় কেটে কীভাবে সেই কাজের অনুমোদন দেওয়া হলো—এ বিষয়টিও তদন্তে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
এদিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, বালু উত্তোলন ও বনজ সম্পদ পাচারের অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বনাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য এবং পাহাড়ি প্রতিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাই তদন্ত দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বনাঞ্চল পুনরুদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
- বিষয় :
- সড়ক নির্মাণ