বন্যা থেকে বাঁচতে পাহাড়ে, সেখানেই মৃত্যুর নির্মম ফাঁদ
চকরিয়ার মছনিয়াকাটায় পাহাড় ধসে মারা গেছে শিশু রুমি আক্তার ও ওবাইদুল ইসলাম সমকাল
এম আর মাহমুদ, চকরিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘মা, আমাকে ভাত দাও’– বিদ্যালয়ে যাওয়ার আগে কিংবা ফিরে এসে প্রায় প্রতিদিনই এভাবেই ডাক দিত ওবাইদুল ইসলাম। সেই ডাক আর কোনোদিন শুনতে পাবেন না মা নাজমা আক্তার। পাহাড় ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছে তার আদরের ছেলে ওবাইদুল। ছেলেকে হারানোর পর থেকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন মা। চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাসই এখন তার একমাত্র ভাষা।
ওবাইদুল ইসলাম (১২) চকরিয়া উপজেলার বরইতলী উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিল। তার বাড়ি পহরচাঁদা গ্রামের মছনিয়াকাটায়। বন্যা থেকে বাঁচতে জন্মভিটা ডেইঙ্গাকাটা থেকে তারা মছনিয়াকাটায় ঘর বেঁধেছিলেন পাহাড়ের কোলে। বন্যার কবল থেকে বাঁচতে গিয়ে পাহাড়ের রোষে প্রাণ গেল ওবাইদুলের। একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে তাদের স্বজন রুমি আক্তার (১৫)।
ছেলের কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাজমা আক্তার বলেন, ‘আমার নাড়িছেঁড়া ধন আর কোনোদিন আমাকে ‘মা, ভাত দাও’ বলে ডাকবে না। অনেক আশা ছিল, বড় হয়ে আমাদের কষ্ট দূর করবে। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।”
ওবাইদুলের বাবা আব্দুল মজিদও শোকে নির্বাক। ছেলের মৃত্যুর পর থেকে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছেন না। শুধু নীরবে চোখের পানি ফেলছেন। পরিবারের সদস্যরা জানান, দুর্ঘটনার পর থেকে মা-বাবা দুজনই ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করতে পারছেন না।
ওবাইদুলের নানা আলতাফ হোসেন জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি ছিল বরইতলী ইউনিয়নের ডেইংগাকাটা এলাকায়। এটি উপজেলার সবচেয়ে নিচু অঞ্চলগুলোর একটি। প্রতি বর্ষায় হারবাং ছড়া, সোনাইছড়ি ও মাতামুহুরী নদীর বন্যায় গ্রামটি তলিয়ে যায়। বছরের পর বছর বন্যার দুর্ভোগ সইতে না পেরে পরিবারটি জন্মভিটা ছেড়ে একই ইউনিয়নের পহরচাঁদা গ্রামের মছনিয়াকাটা পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। কিন্তু বন্যা থেকে বাঁচতে গিয়ে পাহাড় ধসে সন্তান হারাতে হবে– এমন দুঃস্বপ্ন কখনও কল্পনাও করেননি তারা।
তিনি বলেন, ‘চার ভাইবোনের মধ্যে ওবাইদুল ছিল দ্বিতীয়। লেখাপড়ায় ছিল মনোযোগী। পরিবারের সবার আশা ছিল তাকে ঘিরেই।’
একই ঘটনায় প্রাণ হারানো রুমি আক্তার (১৫) আগামী বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। অনেক আগেই বাবা কাজল মিয়াকে হারিয়েছে রুমি। মা অমানুষিক কষ্ট করে সন্তানদের মানুষ করছিলেন। চার বোন ও দুই ভাইয়ের সংসারে দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। অবিবাহিত সন্তানদের মধ্যে রুমিকেই নিয়ে ছিল মায়ের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন।
স্থানীয়রা জানান, দারিদ্র্য আর প্রতিকূলতার মধ্যেও লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিল রুমি। কিন্তু পাহাড় ধস সেই স্বপ্নও কেড়ে নিয়েছে। একমাত্র অবিবাহিত মেয়েকে হারিয়ে রুমির মা প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারানোর মতো অবস্থায় রয়েছেন।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান বলেন, ‘নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারই অত্যন্ত অসহায় ও হতদরিদ্র। তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো সহায়-সম্পদ নেই। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে মোট ৪০ হাজার টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়রাও বিভিন্নভাবে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে সন্তানের শোক কোনো সহায়তাই পূরণ করতে পারে না।’
এদিকে, বন্যার ভয়াবহতায় একই ইউনিয়নের রসুলাবাদ গ্রামে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নৌকা থেকে পড়ে স্রোতে ভেসে মারা গেছে ঝর্ণা নামে এক কিশোরী।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এবারের বন্যায় চকরিয়া উপজেলার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বরইতলী ইউনিয়ন। গোবিন্দপুর, বিবিরখিল, ডেইংগাকাটা, শান্তিবাজার, রসুলাবাদ, চাঁদের বাপেরপাড়া, পপিপাড়া, পশ্চিম হিন্দুপাড়া ও পঁহরচাঁদাসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ এখনো দুর্ভোগে রয়েছেন। পাহাড়ি এলাকার পাশাপাশি সমতলের অসংখ্য পরিবারও পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, দুর্যোগের কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি ত্রাণ এখনো তাদের হাতে পৌঁছায়নি। অনেক পরিবার এখনো অপেক্ষায় আছে একবেলা খাবার আর নিরাপদ আশ্রয়ের।
- বিষয় :
- বন্যা