ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

মায়ের বুকেও বাঁচতে পারল না

মায়ের বুকেও বাঁচতে পারল না
×

সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় ধসে মারা গেছে ৯ মাস বয়সী আশরাফুল আলম সমকাল

 এম সেকান্দর হোসাইন, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করেন মঈন উদ্দিন। স্থায়ী কোনো বাড়ি ছিল না। আর্থিক অনটনের কারণে জঙ্গলসলিমপুরের ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বাস করতেন পরিবার নিয়ে। নিজের বাড়ি নোয়াখালীতে। দুই বছর আগে সংসার শুরু করেছিলেন এখানে। পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটি টিনের ঘর, অনেক স্বপ্ন আর ভালোবাসা নিয়েই এগোচ্ছিল জীবন। নয় মাস আগে জন্ম নিয়েছিল সন্তান আশরাফুল ইসলাম তানভীর। সন্তানের হাসিতে মুখর হয়ে উঠেছিল পুরো ঘর। সেই থেকেই তানভীরকে নিয়ে নানা স্বপ্ন বুনছিলেন মঈন-লামিয়া দম্পতি। কিন্তু কয়েক মিনিটের পাহাড় ধসে সব স্বপ্ন মাটিচাপা পড়ে গেল। পাহাড় ধসের আগমুহূর্তে মা লামিয়া শিশুকে বাঁচাতে বুকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিলেন। কিন্তু মায়ের বুকেও বাঁচতে পারল না শিশুটি।
একইভাবে নগরের পাঁচলাইশ থানার চশমা পাহাড় এলাকায় পাহাড় কেড়ে নিয়েছে ১৩ বছরের শিশু সুমাইয়াকেও। মেয়ের এমন মৃত্যুতে পাগলপ্রায় মো. ফারুক ও শিরিন বেগম দম্পতি। গত বুধবার পাহাড় ধসে মাটিচাপা পড়ে মৃত্যু হয় সুমাইয়ার। 
আর জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় ধসে মারা যায় আশরাফুল ইসলাম। দুই সন্তানকে হারিয়ে এখন দুই পরিবারেই নেমে এসেছে শোকের ছায়া। দুই শিশুর ব্যবহার করা নানা সামগ্রী বুকে আঁকড়ে ধরে কান্না করছেন তাদের মা-বাবা, বোনসহ সবাই। 

মায়ের বুকেও বাঁচতে পারল না আশরাফুল 
পাহাড় ধসের আগমুহূর্তে মা লামিয়া ৯ মাসের সন্তান আশরাফুল ইসলাম তানভীরকে বাঁচাতে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি তিনি। স্থানীয়রা মাকে মাটির নিচ থেকে জীবিত বের করতে পারলেও শিশুটিকে উদ্ধার করা হয় মৃত। শিশুটির কাপড়, খেলনা আর দোলনাও চাপা পড়েছে মাটির নিচে। বুধবার সকালে শিশুটি মায়ের পাশে ঘুমিয়ে ছিল। বাইরে তখনও ঝুমবৃষ্টি। হঠাৎ বিকট শব্দে পাশের পাহাড়ের একটি অংশ লামিয়াদের ঘরের ওপর ধসে পড়ে। মুহূর্তেই ঘরটি মাটির স্তূপে পরিণত হয়। প্রতিবেশীরা ছুটে এসে মা ও শিশুকে উদ্ধার করেন।
লামিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি কেন বাঁচলাম? আমার একমাত্র সন্তানকে ছাড়া কী নিয়ে বাঁচব আমি।’ একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ বাবা মঈন উদ্দিন। বলেন, ‘তানভীরই ছিল আমার পরিবারের সব। ওকে নিয়েই ছিল আমাদের ভবিষ্যতের সব স্বপ্ন। তার মুখেই জীবনে প্রথম বাবা ডাক শুনেছি। এখন ঘরে ফিরলে আর কেউ বাবা বলে ডাকবে না, আদর করবে না।’ 
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘টানা কয়েকদিন ধরে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এ জন্য জঙ্গলসলিমপুর পাহাড়ি এলাকায় ঝূঁকিপূর্ণস্থানে বসবাসরতদের সরিয়ে যেতে আমরা রাতদিন মাইকিং করে আসছি। কিছু পরিবার অন্যত্র সরে গেলেও বেশির ভাগই রয়ে গেছে। এর মধ্যে পাহাড় ধসে শিশুটির মৃত্যু হলো। এমন মৃত্যু কখনও কাম্য নয়।’ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ২৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।’

সামিয়া বলত, পাহাড় ধসে পড়তে পারে
নগরীর চশমা পাহাড় এলাকায় পাহাড় ধসে নিহত সামিয়া ইসলাম তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট, ছিল পরিবারের ছিল মধ্যমণি। মা শিরিন বেগম পেশায় গৃহকর্মী। বাবা মো. ফারুক মাছ বিক্রেতা। অভাব-অনটনে কষ্টের সংসার ছিল তাদের। ছোট মেয়েকে হারিয়ে নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। পাহাড় ধসে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এমন আশঙ্কা ছিল তাদের মাঝেও। 
মো. ফারুক বলেন, ‘আর্থিক অনটন আমার নিত্যসঙ্গী। পাহাড় ধসে পড়ার আশঙ্কা আমাদের মধ্যে ছিল। কিন্তু অভাবের কারণে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিতে পারিনি। সামিয়াও পাহাড় ধসের ভয়ের কথা আমাকে বলেছিল। আজ তাই সত্যি হলো। আমার মেয়ে সামিয়াকে কেড়ে নিল পাহাড়।’ সামিয়ার বড় বোন রিয়া আক্তার বলেন, ‘মৃত্যুর আগের রাতেও আমাদের সঙ্গে কত খুনশুটি করেছে সামিয়া। এখন সে আর নেই। তার নানা স্মৃতি তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের। আর কখনও আপু বলে ডাকবে না সে।’ 
চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক শাহ ইমরান বলেন, ‘পাহাড় ধসের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে মাটিচাপা অবস্থায় শিশুটির লাশ উদ্ধার করে। পাহাড় ধসের সময় সুমাইয়ার মা-বাবা বের হতে সক্ষম হলেও পাশের কক্ষে থাকা সুমাইয়া বের হতে পারেনি। তাই ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।’ 
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এখানে এসে দেখেছি পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড়টি প্রায় খাড়াভাবে কাটা হয়েছে। ফলে পুরো এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’

আরও পড়ুন

×