সাতকানিয়া
পানি নামার পর কষ্ট আরও বেশি
সুকান্ত বিকাশ ধর, সাতকানিয়া (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঘরের ভেতরের পানি ধীরে ধীরে নেমে গেছে। কিন্তু উঠোন পেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই এখনও হাঁটুসমান পানি। রান্নাঘরের চুলায় আগুন জ্বলেনি কয়েক দিন। ঘরে থাকা চিড়া-মুড়িও শেষ। ছোট শিশুর কাশি বেড়েছে, বিশুদ্ধ পানির সংকটে বাড়ছে অসুস্থতার শঙ্কা। কাজে যেতে না পারায় হাতে নেই একটি টাকাও। সরকারি বা বেসরকারি কোনো সহায়তা এখনও পৌঁছায়নি।
টানা বর্ষণ আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের বন্যায় সাতকানিয়ার হাজারো পরিবারের অবস্থা এমনই। পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগের শেষ হয়নি। বরং ঘর থেকে পানি নামার পর শুরু হয়েছে নতুন লড়াই– খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ আর জীবিকা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম।
উপজেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ঢেমশা ইউনিয়নের উত্তর ঢেমশা শাহ মোহছেন পাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরের ভেতর থেকে পানি নেমে গেলেও চলাচলের রাস্তায় এখনও হাঁটুসমান পানি। কোথাও ভেসে বেড়াচ্ছে নষ্ট আসবাব, কোথাও শুকাতে দেওয়া হয়েছে ভেজা কাপড়, বিছানা ও বই-খাতা। মানুষের চোখেমুখে ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা আর দীর্ঘশ্বাস।
সেখানে কথা হয় আব্দুল হালিমের সঙ্গে। একটি বিস্কুট কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি (এসআর) হিসেবে নতুন করে চাকরি শুরু করেছিলেন। দীর্ঘ তিন মাস বেকার থাকার পর সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে বলে আশা করেছিলেন। কিন্তু বন্যা সেই আশায় আবারও ভাটা ফেলেছে।
ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে অশ্রুসজল চোখে তিনি বলেন, ‘ছয় দিন ধরে খাটের ওপর বসে-শুয়ে আছি। ঘরে যে শুকনো খাবার ছিল, সব শেষ হয়ে গেছে। পাশের বাড়ির মানুষ একটু চিড়া, মুড়ি আর গুড় দিয়েছে। একজন কিছু রান্না করা খাবারও দিয়েছিলেন। এগুলো দিয়েই কোনো রকমে বেঁচে আছি। কিন্তু সরকারি-বেসরকারি কোনো সহায়তা এখনো পাইনি।"
চার মেয়ে ও এক ছেলের জনক আব্দুল হালিম জানান, দুই মেয়ে বেড়াতে এসে বন্যার মধ্যে আটকা পড়েছে। ঘরে পানি ঢুকে খাট, আলমারি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। রান্নাঘর এখনো পানির নিচে থাকায় চুলায় আগুন জ্বালানো সম্ভব হয়নি। ঘরের পানি সেচে বের করলেও সামনে রাস্তাজুড়ে এখনো হাঁটুসমান পানি।
একই পাড়ার বাসিন্দা হাবিবুল্লাহর অবস্থাও ভিন্ন নয়। কেরানীহাটে রং চা ও কফি বিক্রি করেই চলে তার সংসার। বন্যায় দোকান বন্ধ, আয়ও বন্ধ।
তিনি বলেন, "আমার পকেটে এখন এক টাকাও নেই। ছয় দিন ধরে পানিবন্দি। শুকনো খাবার শেষ হয়ে গেছে। কিছু বিত্তবান মানুষ কয়েক বেলা রান্না করা খাবার দিয়েছেন। কিন্তু সরকারি কোনো ত্রাণ পাইনি। সবচেয়ে বেশি চিন্তা পাঁচ বছরের ছেলে মুনতাসিরকে নিয়ে। সর্দি-কাশিতে ভুগছে, অথচ চিকিৎসার জন্য কোথাও নিয়ে যেতে পারছি না। রাস্তা এখনো পানির নিচে। আল্লাহ ছাড়া এখন আর কাউকে ভরসা করার নেই।"
হাবিবুল্লাহর মতো একই দুর্ভোগে রয়েছেন টমটমচালক আবুল কালামের পরিবারও। পরিবারের জন্য খাবার জোগাড় করতে তিনি বের হয়েছেন কোমরসমান পানি মাড়িয়ে। ঘরে পাওয়া যায় তার স্ত্রী হাসিনা আক্তারকে।
তিনি বলেন, "পাঁচ দিন হাঁটুসমান পানির মধ্যে একটি খাটে বসে-শুয়ে কাটিয়েছি। এখন ঘর থেকে পানি নেমেছে, কিন্তু থাকার মতো পরিবেশ নেই। পাশের একটি পাকা ঘরে আশ্রয় নিয়েছি। এক কাপড়েই আছি। কয়েক দিন গোসলও করতে পারিনি। মনে হচ্ছে আল্লাহ আমাদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছেন।"
- বিষয় :
- বন্যা