ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

বন্দিদের ৭৪% সৌদি আরবে, সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই

বন্দিদের ৭৪% সৌদি আরবে, সুরক্ষার ব্যবস্থা নেই
×
×

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৮:০৭ | আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০২৬ | ০৯:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সৌদি আরবে কারাবন্দি থাকার পর ১৩ অক্টোবর দেশে ফেরেন ময়মনসিংহের ভালুকার আলী হোসেন। বড় স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। তবে গতকাল শুক্রবার শোনালেন প্রবাসজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা। 

গরিব কৃষক বাবার সন্তান আলী হোসেন (২১) ধারদেনা করে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা খরচে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবে যান। তবে কফিলের কাছ থেকে আট হাজার রিয়াল ধার নেওয়া ও মোটরসাইকেল চুরির মিথ্যা অভিযোগে জেদ্দার কারাগারে সাত মাস বন্দি থাকতে হয় তাঁকে। 

আলী হোসেন বলেন, ‘খাবার ডেলিভারিম্যানের কাজ করতাম। মাসে আড়াই হাজার রিয়াল দেওয়ার কথা ছিল। প্রথম দিকে কিছুদিন দেওয়া হয়। এর পর ৫০০ রিয়ালের বেশি দিত না। দেশে ফেরত আসার কথা জানালে মোটরসাইকেল চুরি ও টাকা ধার করার মিথ্যা অভিযোগে মামলা করা হয়।’ 

আলী হোসেন বলেন, ‘পুলিশ গ্রেপ্তারের পর সৌদি দূতাবাসের কেউ খোঁজ নেয়নি। আমাকে কখনও আদালতেও তোলা হয়নি। বন্দিজীবনের সাত মাসে বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে চারবার কথা বলার সুযোগ পেয়েছি। তাদের গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছি।’ 

তিনি বলেন, ‘পরিবারকে সান্ত্বনা দিয়েছি, দ্রুত মুক্তি পাব। এভাবে সাত মাস একটি রুমে কাটাতে হয়। কারাগারে গিয়ে রেজওয়ান নামে আরেক বাংলাদেশি ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি এখনও কারাগারে বন্দি আছেন।’

বিদেশের মাটিতে কারাভোগের যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতার কথা সমকালকে জানিয়েছেন ময়মনসিংহ থেকে আসা আলী হোসেনের মতো আরও কয়েকজন। দেশে ফিরে তারা এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।
সৌদি আরবে এক নারীসহ দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তথ্য সামনে আসার পর প্রবাসী কর্মীদের সুরক্ষার প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ছোট-বড় কিংবা বানোয়াট অভিযোগ ও মামলায় বিদেশের মাটিতে অনেক বাংলাদেশি কারাবন্দি থাকলেও তাদের জন্য কার্যকর আইনি সুরক্ষাকাঠামো পাঁচ দশকেও গড়ে তোলা যায়নি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এ কারণে অনেক সময় লঘু অপরাধে গুরুদণ্ড পাচ্ছেন প্রবাসীরা। 

সরকারি হিসাবে, বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারে ১০ হাজার ৬৬ বাংলাদেশি নাগরিক বন্দি রয়েছেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে যশোর-৫ আসনের সংসদ সদস্য কাজী এনামুল হকের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটির কারাগারে বন্দি প্রায় সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি নাগরিক। এ হিসাবে বিদেশের বিভিন্ন কারাগারে থাকা বাংলাদেশি বন্দিদের মধ্যে ৭৪ দশমিক ৫০ শতাংশ সৌদি আরবে।
অন্যান্য দেশের মধ্যে ভারতের কারাগারে বন্দি আছেন এক হাজার ৫৭৯, তুরস্কে ৫০৮, ওমানে ৪২০, কাতারে ৪২০, গ্রিসে ৪১৪, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪০৪, দক্ষিণ আফ্রিকায় ৩৮৫ ও  মালয়েশিয়ায় ২১৯ জন বাংলাদেশি। 

তবে বিদেশের মাটিতে কারাবন্দি বাংলাদেশিদের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে বেশি বলে মনে করছে এ খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলো। তাদের ভাষ্য, বিশ্বের অনেক দেশের কারাগারে বন্দি বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রকৃত সংখ্যা সম্পর্কে সরকারের কাছে তথ্য নেই। 

ব্র্যাকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আউট পাস নিয়ে দেশে ফিরতে হয়েছে ৫৩ হাজার ২১২ বাংলাদেশিকে। তাদের মধ্যে পুরুষ ৫১ হাজার ৫২৫ জন এবং নারী এক হাজার ৬৮৭ জন। চলতি বছর আউট পাস নিয়ে ফেরত আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ৩৩ হাজার ৬১১ জন সৌদি আরব থেকে এসেছেন। এ হিসেবে আউট পাস নিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৩.১৬ শতাংশ সৌদি আরব থেকে এসেছেন।  
এ ছাড়া মালয়েশিয়া থেকে এসেছেন ছয় হাজার ৬৩, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এক হাজার ৮৪৩, লিবিয়া থেকে এক হাজার ৭৯৩, কুয়েত থেকে এক হাজার ৫৭৬, ওমান থেকে ৮৪০, জর্ডান থেকে ৪৭০, লেবানন থেকে ৩৬২, সিঙ্গাপুর থেকে ৩৬২, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২১৬, ভারত থেকে ১৮১ এবং পাকিস্তান থেকে ১১৩ জন ফিরেছেন। সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৬৮টি দেশ থেকে আউট পাস নিয়ে বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর তথ্য রয়েছে। 

২০২৫ সালে ফেরত এসেছেন ৭৫ হাজার ১১৭ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৭৩ হাজার ২২৬ জন এবং নারী এক হাজার ৮৯১ জন। 

২০২৪ সালে ফেরত এসেছেন ৮৮ হাজার ৮৬৮ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৮৫ হাজার ৪৯৩ জন এবং নারী তিন হাজার ৩৭৫ জন। 
২০২৩ সালে ফেরত এসেছেন ৮৬ হাজার ৬২১ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৮৩ হাজার ৭১৯ জন এবং নারী দুই হাজার ৯০২ জন।

সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ সমকালকে বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের আইন সহায়তাকারীদের (লিগ্যাল অ্যাসিসটেন্ট) দায়িত্ব হলো নিয়মিত কারাগার ও আদালতে যাওয়া। বাংলাদেশের নাগরিকদের আইনি সুরক্ষায় সহযোগিতার বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদারক করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গাফিলতি থাকলে কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের সংকট আরও বাড়ে।  
গোলাম মসিহ জানান, তিনি যখন রাষ্ট্রদূত ছিলেন, তখন ১০ থেকে ১২ জন মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামির জীবন বাঁচিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষ নিয়মিত বাংলাদেশের নাগরিকরা কে কোন অপরাধে আটক আছেন, সেই তথ্য পাঠাত। সরকারের উচিত, স্থানীয় কমিউনিটির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারেন—এমন জনবল দূতাবাসে নিয়োগ দেওয়া। 

গোলাম মসিহ বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের নারী কর্মীদের নির্যাতনের বিষয়টি প্রায়ই সামনে আসে। যে চুক্তির ভিত্তিতে তাদের পাঠানো হয়, সেখানে তাদের সুযোগ-সুবিধা ও সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে উল্লেখ করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের নারী শ্রমিকরা অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম বেতন পান।  এমন নারী কর্মীদের সেখানে পাঠাচ্ছি, যারা জীবনে প্রথমবার শহর দেখেছেন। অনেকের যথাযথ প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতার অভাবেই সমস্যা হয়।’

ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক (মাইগ্রেশন ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্ম) শরিফুল হাসান সমকালকে বলেন, অপরাধে জড়ানোর অভিযোগে অনেক বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশের কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিরপরাধ। পৃথিবীর এমন দেশ পাওয়া যাবে না, যেখানে বাংলাদেশিদের কেউ না কেউ বন্দি নেই। দেখা যায়, কারও কারও নথিপত্র ভুয়া। যেখানে কাজ করার কথা, সেখানে তারা নেই। এসব কারণে তাদের ফেরত পাঠানো হয়।

শরিফুল হাসান বলেন, সমস্যা হলো, প্রবাসীদের জন্য কার্যকর কোনো সুরক্ষাকাঠামো গড়ে তোলা যায়নি। বিদেশের মাটিতে কীভাবে তারা আইনি সহায়তা পেতে পারেন, তা অনেক প্রবাসী জানেন না। কেউ কারাগারে আছেন, তা পরিবার জানলেও দেশে কোথায় যোগাযোগ করলে কার্যকর সহযোগিতা পাওয়া যাবে, সে সম্পর্কে পরিবারের সদস্যদেরও ধারণা নেই।

শরিফুল হাসান আরও বলেন, অনেক দেশে খুব সামান্য অপরাধে বাংলাদেশিদের গুরুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় ছোটখাটো অপরাধে বেত্রাঘাত করা হয়, যেটিকে তারা ‘রটান’ বলে থাকে। তিনি বলেন, সৌদি আরবে বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হলে অনেক সময় উল্টো তাদের বিরুদ্ধে চুরিসহ নানা ধরনের মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়। এসব দেশের নীতিনির্ধারকরা যখন দেখেন, নিজ দেশের নাগরিকদের সুরক্ষায় তাদের দেশের কর্তৃপক্ষের শক্ত ভূমিকা নেই, তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আরও বাড়ে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের বিদেশের কারাগারে বন্দি থাকার তথ্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি দূতাবাস বা মিশনের কারাগার কিংবা ডিটেনশন সেন্টার পরিদর্শন করে বন্দির সঙ্গে দেখা করা উচিত। এরপর আটক ব্যক্তির প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ, মামলাসংক্রান্ত পরামর্শ এবং আইনি সুরক্ষা পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়। অনেক দেশে এসব বিষয়ে যথাযথ নজর দেওয়া হয় না।
কোনো বন্দির আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য না থাকলে আদালতের মাধ্যমে আইনজীবী নিয়োগের জন্য সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি মিশনকে প্রচেষ্টা চালাতে হয়। বন্দির পরিবার আলাদাভাবে আইনজীবী নিয়োগ করতে চাইলে মিশনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দিতে হয়।

সৌদিতে কারাগারে ছিলেন নয়ন সর্দারও 
সৌদি আরব থেকে অক্টোবরের শুরুতে দেশে ফেরত আসা আরেকজন নয়ন সর্দার (২৬)। তাঁর বাড়ি শরীয়তপুর সদরের মাহমুদপুরে। তিনি সমকালকে বলেন, ‘২৯ দিন জেদ্দার একটি কারাগারে ছিলাম। সেখানে দুইশ জনের মতো বাংলাদেশি ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন মিয়ানমারের নাগরিক। বাকিরা সবাই বাংলাদেশি। কারাগারে থাকার সময় এক দিন দূতাবাস থেকে একজন লোক আসেন। তিনি কারাবন্দিদের একজনের সমস্যা নিয়ে কথা বলেন। আমি ও অন্য বাংলাদেশি বন্দিরা সহযোগিতা চাই। দূতাবাসের ওই লোক আমাদের কথা শুনতে চাননি।’
নয়ন সর্দার বলেন, ‘২০২৩ সালে চার লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরবে যাই। মেডিকেলসহ আরও বেশি খরচ হয়েছে। সৌদি আরবের রাস্তায় গম বিক্রির মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। মক্কা থেকে ধরে জেদ্দার কারাগারে নেওয়া হয়। এখন ভাগ্য আর পরিস্থিতির শিকার।’ তিনি বলেন, ‘সৌদি আরবে কারাগারে থাকার সময় ঠিকমতো খাবার দিত না। যেটুকু দিত, তা মুখে নিতে পারতাম না। বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে কোনোমতে বেঁচে ছিলাম।’ 

আরও পড়ুন

×