সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৪ : সর্বোচ্চ গোলদাতা ও টুর্নামেন্ট সেরা
আগামীর তারকা মিরাজুল
সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৪–এ সর্বোচ্চ গোলদাতা ও টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার হাতে মিরাজুল ইসলাম
আশিক মুস্তাফা
প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৪ | ২৩:২৫
প্রথমবারের মতো সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জিতল লাল-সবুজের বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে নেপালের কাছে গ্রুপ পর্বে হারের মধুর প্রতিশোধও নিলেন তরুণরা। দাপুটে ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষকে রীতিমতো উড়িয়ে দিলেন তারা। ২৮ আগস্ট কাঠমান্ডুর আনফা কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ৪-১ গোলের বড় ব্যবধানে জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। কোচ মারুফুল হকের সাজানো মূল একাদশের তিন ফরোয়ার্ডই খুঁজে নেন জালের দেখা। দলের পক্ষে জোড়া গোল করেন মিরাজুল ইসলাম। একবার করে লক্ষ্যভেদ করেন রাব্বি হোসেন রাহুল ও পিয়াস আহমেদ নোভা। স্বাগতিকদের হয়ে ব্যবধান কমান সমীর তামাং।
তরুণদের বড় অর্জন
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের যুবপর্যায়ে বাংলাদেশের ছেলেদের এটি প্রথম শিরোপা। প্রতিযোগিতার ষষ্ঠ আসরে এসে শেষ হলো তাদের অপেক্ষার পালা। আগের পাঁচটি আসরের দুটি অনূর্ধ্ব-১৮, দুটি অনূর্ধ্ব-১৯ এবং একটি ছিল অনূর্ধ্ব-২০ পর্যায়ের। শ্রীলঙ্কাকে ২-০ গোলে হারিয়ে এবারের আসরে নিজেদের অভিযান শুরু করেছিল বাংলাদেশ। এরপর নেপালের কাছে ২-১ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় তারা। সেমিফাইনালে কঠিন বাধা পাড়ি দিতে হয় তাদের। আগের তিন আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারতের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে জিতে ৪-৩ ব্যবধানে। দুর্দান্ত পারফর্ম করা মিরাজুল নিজে দু’বার জাল কাঁপানোর পাশাপাশি অ্যাসিস্ট করেন রাব্বির গোলে। তাঁর জ্বলে ওঠার আগে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চললেও ম্যাচে আধিপত্য ছিল নেপালেরই। তবে প্রথমার্ধের শেষ দিকে বদলে যায় চিত্র। মিরাজুলের নান্দনিক ফ্রি-কিকে লাগাম চলে আসে বাংলাদেশের হাতে। তাঁর জোরালো শট নেপালের গোলরক্ষক জয়রথ শিখের গ্লাভস ফাঁকি দিয়ে জালে জড়ায়।
ফাইনালে ছিল চোখ
২০২২ সালে অনূর্ধ্ব-২০ ক্যাটেগরির আসরে ভারতের বিপক্ষে হেরে রানার্সআপ হয়েছিল বাংলাদেশ। এবার সেমিফাইনালে তাদের টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে ফাইনালের মঞ্চে উঠে আসে বাড়তি আত্মবিশ্বাস নিয়ে। শুরুতে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণে জমে ওঠে ম্যাচ; কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আধিপত্য বাড়তে থাকে নেপালের। আট মিনিটে প্রথম কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েন সেমিফাইনালে টাইব্রেকারে ভারতের বিপক্ষে দুটি সেভ করা গোলরক্ষক আসিফ হোসেন। প্রথমার্ধের শেষ দিকে মিরাজুলের ওই দৃষ্টিনন্দন গোলে বদলে যায় ম্যাচের দৃশ্যপট। বক্সের একটু ওপরে ফাউলের শিকার হন এই ফরোয়ার্ড, ফ্রি কিক পায় বাংলাদেশ। মিরাজুলের বুলেট গতির শট ঝাঁপিয়ে পড়া জয়রথ শিখের গ্লাভস ফাঁকি দিয়ে পোস্টের ভেতরের দিকে লেগে জালে লুটোপুটি খায়। এগিয়ে যাওয়ার আনন্দ নিয়ে বিরতিতে যায় বাংলাদেশ। দ্বিতীয়ার্ধে উজ্জীবিত ফুটবল খেলতে থাকে বাংলাদেশ। ৫৫তম মিনিটে মিলে যায় ব্যবধান দ্বিগুণ করা গোল। আসাদুল ইসলাম সাকিবের লং পাসে দূরের পোস্টে থাকা আসাদুল মোল্লার হেড পাস থেকে হেডেই লক্ষ্যভেদ করেন মিরাজুল। ম্যাচের ভাগ্য হেলে পড়ে বাংলাদেশের দিকে। ৭০তম মিনিটের গোলে বাংলাদেশের জয় অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। বক্সের ভেতর থেকে মিরাজুলের ছোট পাস ধরে জায়গা বানিয়ে ডান পায়ের বাঁকানো শটে লক্ষ্যভেদ করেন রাব্বী হোসেন রাহুল। ১০ মিনিট পর বক্সে আসা লং ক্রসে রাজীব লাফিয়ে হেড করলেও পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে পারেননি। সমীরের হেডে ঘুরে দাঁড়ানোর উপলক্ষ পায় নেপাল। কিন্তু পরে নির্ধারিত সময় শেষে ১০ মিনিটের যোগ করা সময়েও তারা আর খুঁজে পায়নি পথ। বরং যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে রাব্বীর আড়াআড়ি পাসে নোভার শট গোলরক্ষককে ফাঁকি দেওয়ার পর এক ডিফেন্ডার ক্লিয়ার করেন, কিন্তু তার আগেই বল পেরিয়ে যায় গোললাইন। নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের জয়।
যেভাবে জাতীয় দলে
মিরাজুল ইসলাম সাফ অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জন্য জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় সিনিয়র দলে। জাতীয় দলে ডাক পেয়ে উচ্ছ্বসিত মিরাজুল শুক্রবার ভুটান যাওয়ার আগে বলেন, ‘স্বপ্ন ছিল জাতীয় দলে খেলব। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে নিজেকে আরও এগিয়ে নিতে হবে। লক্ষ্য, জাতীয় দলে নিয়মিত হওয়া।’ এর আগেও জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন মিরাজুল। সেবার ক্যাম্প করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘একবার জাতীয় দলে ডাক পেলেও করোনার জন্য শেষ পর্যন্ত ক্যাম্প হয়নি।’
শুরুর গল্প এবং তাঁর আদর্শ
মিরাজুলের জন্ম বরিশালের ঝালকাঠি পৌরসভায়। মা হেনারা বেগম ও পিতা খলিলুর রহমান। অসুস্থ বাবা কাজ করতেন রেস্টুরেন্টে। তিন ভাইয়ের মধ্যে মিরাজ সবার ছোট। মিরাজুলের ফুটবলে হাতেখড়ি বিকেএসপিতে। বাফুফের এলিট একাডেমি থেকে প্রথম ফুটবলার হিসেবে ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল তাঁর। অনেক ফুটবলারের আইডল মেসি, রোনালদো, নেইমার। মিরাজুল ব্যতিক্রম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর আদর্শ। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো খেলোয়াড়কে আইডল মানি না। আমার একমাত্র আইডল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)।’ মিরাজুল ধর্মপরায়ণ। তাঁর এই সাফল্য মহান আল্লাহর অবদান বলে মনে করেন তিনি। u
- বিষয় :
- সাফ অনূর্ধ্ব–১৬ চ্যাম্পিয়নশিপ