প্রেরণা
কাজ শুরু করলেই আশার আলো ছড়িয়ে পড়ে
গ্রেটা থুনবার্গ ছবি : সংগ্রহ
আরমান খান
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
গ্রেটা থুনবার্গ। পরিবেশকর্মী। জলবায়ুর জন্য স্কুল ধর্মঘট ও ফিলিস্তিনপন্থি আন্দোলনে তরুণদের কণ্ঠস্বর। বিশ্বজুড়ে তরুণ অ্যাক্টিভিস্টদের অনুপ্রাণিত করা এই পরিবেশকর্মীর বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রেরণার কথা তুলে এনেছেন আরমান খান
২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে আমার জন্ম। মা মালেনা এরম্যান অপেরা শিল্পী আর বাবা স্ভান্তে থুনবার্গ অভিনেতা। বাবা অভিনয়ের গুণটি পেয়েছেন দাদার কাছ থেকে। দাদা ওলফ থুনবার্গও ছিলেন অভিনেতা এবং পরিচালক। আমি আট বছর বয়সে প্রথম জলবায়ু পরিবর্তনের কথা শুনতে পাই। বারবার চেষ্টা করেও বুঝতে ব্যর্থ হই কেন এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। সে যাক, ১১ বছর বয়সে হতাশ হয়ে পড়ি। তখন আমার কথা বলা এবং খাওয়া-দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। দুই মাসে দশ কিলোগ্রাম ওজন কমে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়।
ঘর থেকে শুরু
তবে প্রয়োজনের সময় চুপ থাকতাম না। আমার অনেকটা এমন মনে হচ্ছিল যে, আমি যদি জলবায়ু সম্পর্কে প্রতিবাদ না করি তাহলে ভেতরে ভেতরে আমি মারা যাচ্ছিলাম। আমার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল পরিবার। যদিও বাবা বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। তিনি বলেন, আমার মেয়ে ঘরে বসে থেকে মন খারাপ করে। বাইরে গিয়ে প্রতিবাদ করলে যদি তার মন ভালো থাকে তবে তাই করতে দেওয়া উচিত। এর মধ্যে আমি কার্বনের প্রভাব কমাতে পরিবারের সব সদস্যকে বিমানে চড়ে ভ্রমণ বাদ দিতে বলি।
পরিবেশের জন্য পরিবারের ত্যাগ
এভাবে প্রায় দুই বছর কেটে যায়। আমি পরিবারের সদস্যদের কার্বনের প্রভাব কমাতে সক্ষম হই এবং নিজে নিরামিষাশী হয়ে উঠি। বিমান চড়া বিসর্জন দিয়ে পরিবেশের ওপর সামগ্রিক প্রভাব কমানোর চেষ্টা করি। জলবায়ু-সংক্রান্ত গ্রাফ এবং ডেটা পরিবারকে দেখানোর চেষ্টা করি। এর ইতিবাচক প্রভাব না দেখে পরিবারকে সতর্ক করি এই বলে যে, তারা আমার ভবিষ্যৎ নষ্ট করছে! যদিও আমার মা কেবল এ জন্য কর্মজীবন ছেড়ে দেন। কারণ, তাঁকে নিয়মিত বিমানে চড়ে বিভিন্ন স্থানে যেতে হতো গান করার জন্য। ২০১৯ সালে বিবিসিতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও বলেছিলাম, আমার বাবা তাঁর স্ত্রীকে বলেন, বিমানে চড়া বন্ধ করে মেয়েকে বাঁচাতে এবং পরিবেশ রক্ষা করতে।
বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের জলবায়ু অ্যাকশন সামিটে সরাসরি আমি বিশ্বনেতাদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে বলেছিলাম, আপনারা আপনাদের ফাঁপা বুলি দিয়ে আমার স্বপ্ন এবং আমার শৈশব চুরি করেছেন। তবুও আমি সৌভাগ্যবানদের একজন। মানুষ ভুগছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, পুরো ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ছে। আমরা এক গণবিলুপ্তির শুরুতে দাঁড়িয়ে আছি, অথচ আপনারা শুধু টাকা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির রূপকথার গল্প করছেন; সাহস কত!
তরুণদের শক্তি
২০১৯ সালে দাভোসে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও নেতাদের উদ্দেশে বলেছিলাম, আমি চাই না আপনারা আশাবাদী হোন। আমি চাই আপনারা আতঙ্কিত হোন। আমি চাই আপনারা সেই ভয়টা অনুভব করুন, যা আমি প্রতিদিন করি এবং তারপর আমি চাই আপনারা ব্যবস্থা নিন। আপনারা এমনভাবে কাজ করুন, যেন আমাদের বাড়িটিতে আগুন লেগেছে। আসলে তা-ই হয়েছে। পরিবর্তনের জন্য কেউ ছোট নয়; যদি গুটিকয়েক শিশু স্কুল বর্জন করে সারা বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে, ভাবুন, আমরা সবাই একসঙ্গে হাত মেলালে কী করতে পারি!
তারুণ্যের আশা
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে নেতাদের কাছ থেকে আমরা শুধু শুনি, পুনর্গঠন, সবুজ অর্থনীতি, নেট জিরো–এগুলো শুনতে দারুণ। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। সবই কেবল ফাঁপা বুলি। তরুণদের হাত গুটিয়ে বসে না থেকে মাঠে নামতে হবে। আশা কেবল বসে বসে সুন্দর কথা বলা বা নিষ্ক্রিয় থাকা নয়। আশা মানে সততার সঙ্গে সত্যকে মেনে নেওয়া। আশা আসে কর্ম থেকে, কেবল কথার কথা থেকে নয়। যখন আমরা কাজ শুরু করি, তখনই আশার আলো ছড়িয়ে পড়ে।
- বিষয় :
- প্রেরণার কথা