ঢাকা রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগ

উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগ
×

যদি স্বপ্ন থাকে তবে নিজেকে জড়িয়ে নিন সেই স্বপ্নময় কাজে... মডেল: রিফাত, নিশাত, শাকিব, নাবিয়া ও রাহিনুর; ছবি: কাব্য

আলাউদ্দিন আলাদিন 

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরির পেছনে না ছুটে তরুণরা এখন অন্যকে চাকরি দেওয়ার কথা ভাবেন। এই ভাবনা থেকেই সৃজনশীল এবং মেধাবীরা নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছেন। উদ্যোক্তা হওয়া মানে নতুন কোনো পণ্য বা সেবার ঝুঁকি নিয়ে নিজে একটি ব্যবসা বা উদ্যোগ শুরু করা। আইডিয়া বা প্রযুক্তিকে বাস্তব পণ্যে রূপান্তর করে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার কথা লিখেছেন আলাউদ্দিন আলাদিন 

উচ্চশিক্ষার করপোরেট অফিসে চাকরি করতেন নিশান। হঠাৎ চাকরিটা ছেড়ে দিলেন। অবশ্য বন্ধু-বান্ধব ও পরিবারের কাছে হঠাৎ মনে হলেও নিশান কিন্তু অনেক ভেবেচিন্তে চাকরিটা ছেড়েছেন। কেন? পরাধীনতার শিকল আর ভালো লাগে না তাঁর। কিছু একটা করবেন ভেবে অনেকদিন পার করেছেন। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিস আর ভালো লাগে না! এই যখন পরিস্থিতি তখন হঠাৎ করে পান এক বড় ভাইয়ের দেখা। আড্ডার ফাঁকে নিশান খুলে বলেন চাকরি নিয়ে নিজের অসন্তুষ্টির কথা। বড় ভাই নিশানকে নিয়ে যান আরেক বড় ভাইয়ের কাছে; যিনি নিজেকে পরিচয় দিলেন একজন উদ্যোক্তা হিসেবে। শুনে নিশান একটু কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। উদ্যোক্তা বা এন্টারপ্রেনার শব্দটির সঙ্গে তিনি বেশ পরিচিত। কোনো উদ্যোক্তার মুখোমুখি এটিই প্রথম। তাই কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করেন, উদ্যোক্তা হিসেবে আপনি কী করেন? কিছু না! সোজাসাপ্টা জবাব দেন বড় ভাইটি। অবাক হন নিশান। তখন খুলে বলেন তিনি, একজন উদ্যোক্তা আসলে তেমন কিছুই করেন না। বরং একজনের ভেতরে থাকা সম্ভাবনাটা শুধু উস্কে দেন, জাগিয়ে দেন। নিজের উদ্যোগ শুধু নিজের মাঝে চেপে রাখেন না। ছড়িয়ে দেন সমাজে, সবার মাঝে। শুনে কৌতূহল বাড়ে নিশানের। এভাবেই শুরু তাঁর সৃজনশীলতার। 

ঘটনা-২
ছোটবেলা থেকেই চাঞ্চল্যে ভর দিয়ে চলছেন সুহাসিনী। পড়ালেখায় মনোযোগ তেমন নেই বললে চলে। ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় একদিন তাঁর হাতে আসে চীনা প্রবাদ বাক্যের একটি বই। বইয়ের একটি প্রবাদ তাঁর জীবনকে নাড়া দেয়। ফলে তিনি উদ্যোক্তার পথে হাঁটেন। এই পথ মাড়িয়ে হয়ে ওঠেন একজন বড় উদ্যোক্তা। এক সময় সুহাসিনীকে নিয়ে পরিবারের সবাই খুব দুশ্চিন্তা করতেন। ভাবতেন, পড়াশোনা শেষ করে তিনি চাকরি পাবেন তো? চাকরি পেলে নিজের এই চঞ্চলতার কারণে তা ধরে রাখতে পারবেন? সেই সুহাসিনী আজ অনেক মানুষকে চাকরি দিচ্ছেন। কীভাবে সম্ভব এসব? সম্ভব সঠিক উদ্যোগের মাধ্যমে। আর কী ছিল সেই চীনা প্রবাদ, যা সুহাসিনীর জীবনকে এত পরিতৃপ্ত আর সুন্দর করে দিল? হ্যাঁ, সেই প্রবাদটি ছিল এমন–‘তুমি যদি কাউকে একটা মাছ দাও, তাহলে তার এক দিনের খাবার ব্যবস্থা করলে। তুমি যদি কাউকে মাছ ধরা শিখিয়ে দিতে পার, তাহলে তার সারাজীবনের খাবারের ব্যবস্থা করে দিলে।’ সুহাসিনী ঠিক সেটিই করেছেন। আজ তাঁর বুটিক হাউসের ব্যবসায় শতাধিক কর্মদ্যোমী নারী কাজ করেন; যারা আবার স্বপ্ন দেখেন এ রকম একশজনের কর্মের ব্যবস্থা করে দেওয়ার।  

উদ্যোক্তা হওয়ার পথ
এক সময় মনে করা হতো উদ্যোক্তা কেবল বংশ পরম্পরায় হয়ে থাকে। সবার দ্বারা এটি সম্ভব নয়। এটি বিজ্ঞানসম্মত ধারণা নয়। উদ্যোক্তা বা এন্টারপ্রেনার হওয়ার জন্য চাই প্রবল মানসিক বিকাশ লাভের চিন্তা এবং সৃজনশীলতার বহির্প্রকাশ করার ক্ষমতা। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য আপনাকে বেছে নিতে হবে একটি নির্দিষ্ট দিক এবং সে বিষয়ে আপনাকে জানতে হবে, পড়াশোনা করতে হবে।

আপনি নিশ্চয় ভাবেন সমাজের কথা
আপনি যদি জানতে চান, উদ্যোক্তা কেন হবেন– তাহলে বলব, আপনার উদ্যোক্তা হওয়ার খুব একটা ইচ্ছা নেই। উদ্যোক্তা কাউকে জোর করে বানানো যায় না। এটি সম্পূর্ণ নিজের প্রচেষ্টায় হতে হয়। সুতরাং আপনি যদি উদ্যোক্তা হতে চান, তাহলে কেন আপনি উদ্যোক্তা হতে চান সেটি আপনাকে নির্ধারণ করতে হবে। স্বাভাবিকভাবে যারা উদ্যোক্তা হন, তাদের লক্ষ্য থাকে তারা নিজের জন্য যেমন কিছু করতে চান, তেমনি সমাজের প্রতিও তারা একটা দায়িত্ব মনে করেন। আপনি হয়তো পড়াশোনা করে ভালো জব নিয়ে ভালো থাকতে পারেন। বড়জোর দু’একজন অভাবীকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে পারেন। এর বেশি নয়। অথচ একজন উদ্যোক্তা চাইলে সমাজটাকে পাল্টে দিতে পারেন। হাজারো মানুষকে করে তুলতে পারেন মূল্যবান। সুতরাং ভাবনার বিষয় এটি হতেই পারে।

হাতের ওপর হাতের পরশ
আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে এমন, যারা আপনার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে অপেক্ষায় আছে। কষ্ট করে খুঁজে বের করে কথা বলুন তাদের সঙ্গে। তাছাড়া এখন ঢাকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উদ্যোক্তাদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে থাকেন বিভিন্ন সময়ে। চাইলে সেগুলোতে অংশ নিতে পারেন।

এ পথে যারা হাঁটবেন
আপনি যদি মনে করেন আপনার সৃজনশীল ক্ষমতা ভালো, খুব সহজে চমৎকার কোনো আইডিয়া মাথায় চলে আসে, ম্যানেজমেন্ট পাওয়ার পরিপূর্ণ তাহলে উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগ আপনি নিতে পারেন। খ্যাতিমান উদ্যোক্তা ক্যামেরন হ্যারল্ড এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘উদ্যোক্তা হতে হলে এমবিএ করতে হবে, স্কুলে ভালো ফল করতে হবে–এমন কোনো কথা নেই।’ কথাটি ভেবে দেখার মতো। সুতরাং আপনিও কথাটিকে হিসাবে নিতে পারেন।

প্রয়োজন সুন্দর পরিকল্পনা
সফল উদ্যোক্তা তিনি, যিনি তাঁর কাজের জন্য সুন্দর একটি পরিকল্পনা করতে পারেন। কথাটা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের। বলা হয়ে থাকে, সুন্দর একটি পরিকল্পনা আপনার কাজের অর্ধেক হয়ে যাওয়া একই কথা। সুতরাং কী নিয়ে কাজ করবেন সেটি ভেবে নিয়ে সুন্দর একটি পরিকল্পনা করে ফেলুন এখনই। তারপর সেটির পজিটিভ এবং নেগেটিভ দিকগুলো চিহ্নিত করুন। দেখবেন চমৎকার একটি দরজা খুলে গেছে আপনার সামনে। 

আপনিই চাকরি দিন
সবার আগে নিজের দুর্বল দিকগুলো খুঁজে দেখুন। সেগুলো কীভাবে সমাধান করবেন–সেটিই হোক আপনার মুখ্য বিষয়। এই ব্যাপারটা ঠিকঠাক হলে ভাবুন আপনার উদ্যোক্তা বিষয়টি নিয়ে। সম্ভাব্য  বিষয়টি নিয়ে সুন্দর ছক তৈরি করুন। ভালো এবং মন্দ দিকগুলো কাগজে লিপিবদ্ধ করুন। অবশ্যই সেগুলো অভিজ্ঞদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না। চাকরি চাওয়ার কী দরকার; যখন আপনি আরেকজনের চাকরি দিতে পারছেন? উদ্যোক্তা হওয়ার উদ্যোগে আপনাকে সুস্বাগতম। 

আরও পড়ুন

×