আমাজনের দুয়ারে ভবিষ্যতের লড়াই
ন্যায়বিচার ও আঞ্চলিক সুরক্ষার দাবিতে গতকাল শনিবার বেলেমে একটি বৃহৎ শোভাযাত্রায় জলবায়ুকর্মীরা অংশ নেন -ছবি : লেখকের সৌজন্যে
সোহানুর রহমান
প্রকাশ: ১৬ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
১০ নভেম্বর পৃথিবীর ফুসফুসখ্যাত আমাজনের রেইনফরেস্টের প্রবেশদ্বার বেলেম শহরে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন- কপ৩০। চলবে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত। দুই সপ্তাহের এই বৈশ্বিক দরকষাকষির আসরে মূল প্রশ্ন একটিই–পৃথিবীকে কি এখনও বাঁচানো সম্ভব? আর বাঁচাতে হলে কারা এখনই দায়িত্ব নেবে? দেড় শতাধিক দেশের প্রতিনিধি, বিজ্ঞানী, নীতিনির্ধারক ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা একত্র হয়ে সেই পথ খুঁজছেন। এই আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ প্রতিনিধিরাও। সরকারি প্রতিনিধি দলের তরুণ সদস্য হিসেবে মাঠের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন সোহানুর রহমান
সুন্দরবনের দেশ থেকে এসে দাঁড়িয়েছি আমাজনের সামনে। ব্রাজিলের ছোট্ট শহর বেলেম। নদী আর আকাশ যেন একই ফ্রেমে মিশে আছে এখানে। বাতাসে আর্দ্রতার গন্ধ, ভ্যাপসা গরম। চারপাশে ঘন সবুজ। একসময় পর্তুগিজ উপনিবেশবাদীরা এখান থেকেই আমাজন জয়ের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। আজ সেই ইতিহাসের ধারাবাহিকতা বুকে নিয়ে আমাজনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, বৃষ্টিভেজা দিনগুলোকে সঙ্গী করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বৈশ্বিক জলবায়ু রাজনীতির মঞ্চ। বৈশ্বিক তাপমাত্রার পারদ চড়ছে, আবহাওয়া অনিশ্চিত ও বিপদসংকুল হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর টিকে থাকার লড়াই কঠিনতর হচ্ছে। জীবাশ্ম জ্বালানির যথেচ্ছ ব্যবহার, অবিরাম কার্বন নিঃসরণ ও অন্যায় ভোগবিলাসের ওপর যোগ হয়েছে যুদ্ধ-দখল-সহিংসতার ছায়া।
সতর্কতা...
সম্মেলনের প্রথম কয়েক দিনে বিশ্বনেতারা জানিয়েছেন, জলবায়ু জরুরি অবস্থার তীব্রতা আর লুকিয়ে রাখা যাবে না। বিজ্ঞানীরাও সতর্ক করেছেন যে, কার্যক্রমে আরও দেরি হলে থামানো যাবে না বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ বা চরমভাবাপন্ন আবহাওয়ার প্রভাব। প্রতিদিন সকালে আমাজন হ্যাঙ্গার কনভেনশন অ্যান্ড ফেয়ার সেন্টারের বাইরে ভিড় জমে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষের। ১৯৯২ সালের ধরিত্রী সম্মেলনের পর ব্রাজিলে এই প্রথম জলবায়ু নিয়ে এত বড় সমাবেশের আয়োজন। গলায় ব্যাজ ঝোলানো শত শত মানুষ কেউ ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রের প্রতিনিধি, যেখানে প্রতিদিন সাগরের পানি ঘর ছুঁয়ে ফেলছে। কেউ বরফগলা পাহাড়ি অঞ্চল থেকে, যেখানে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে হিমবাহ।
অভিযোজনের কপ
এবারও কনফারেন্সের প্রধান আলোচ্য বিষয় জলবায়ু অর্থায়ন। উন্নত দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা আজও পূর্ণ হয়নি। ২০২৫ সালের পর নতুন অর্থায়ন লক্ষ্যমাত্রার রূপরেখা ঠিক করার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমানো ছাড়াও অভিযোজন ও ক্ষয়-ক্ষতি মোকাবিলায় জোর বেশি। বাংলাদেশে নদীভাঙন ও বন্যা, ভারতে তাপপ্রবাহে ফসল ক্ষতি, আফ্রিকায় খরা, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রের সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতার ঝুঁকি মিলিয়ে দক্ষিণ গোলার্ধ ভয়াবহ অস্থিরতায় রয়েছে। তাই অনেক দেশ চাইছে, কপ৩০ হোক ‘অভিযোজনের কপ’, যেখানে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব অর্থ ছাড় ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের রূপরেখা থাকবে।
উন্নয়নশীল ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রধান দাবি
এ বছরের আলোচনায় নতুন মাত্রা এসেছে, জলবায়ু ক্ষয়-ক্ষতি ও ক্ষতিপূরণ আর কোনো বিমূর্ত তত্ত্ব নয়। দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো টিকে থাকার লড়াই করছে, আফ্রিকার দেশগুলো উন্নয়নের দায় না নিয়েও ক্ষতির বোঝা বহন করছে, আর দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। তাই সহায়তা নয়, এটিকে উন্নত বিশ্বের দায়বদ্ধতা হিসেবে দেখতে হবে। বাংলাদেশের জন্য কপ৩০ শুধু বৈশ্বিক আলোচনার বিষয় নয়, এটি অস্তিত্বের লড়াই। লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিল ঘোষণার পরও বাজেট অপ্রতুল, বিতরণ অনিশ্চিত। নদীভাঙনে গ্রাম হারিয়ে যাচ্ছে, ঘূর্ণিঝড়ে মানুষ রাতারাতি গৃহহীন হচ্ছে। তাই দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজ প্রক্রিয়ায় তহবিল প্রবাহ এবং অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানো এই সম্মেলনে প্রধান দাবি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর।
বাংলাদেশের চাওয়া ও ন্যায্য রূপান্তর
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লেও জীবাশ্ম জ্বালানি এখনও কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। বাংলাদেশের ভূমিকা কার্বন নিঃসরণে প্রায় শূন্যের কোঠায়, কিন্তু ক্ষতির বোঝা সবচেয়ে বেশি। সে কারণে বাংলাদেশ চায় জলবায়ু সুবিচার। দ্রুত, সহজ ও ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন; লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলে সরাসরি প্রবেশাধিকার; নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা; জলবায়ু উদ্বাস্তুদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি; স্বচ্ছ ও ন্যায্য কার্বন বাজার; এবং ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক জাস্ট ট্রানজিশন; যেখানে শ্রমিক, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী ও যুবদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
কপ৩০ সম্মেলন আমরা বাংলাদেশের তরুণরা শুধু পর্যবেক্ষক হিসেবে নয়, দেশের কণ্ঠস্বর হিসেবে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছি। যারা সরকারি প্রতিনিধি দলে তরুণ প্রতিনিধি আছেন তারা নিয়মিত নেগোশিয়েশন মিটিংয়ে যোগ দিচ্ছেন। আমরা বিশ্ব মঞ্চে আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি। দলের অন্য তরুণদের কাজ শুধু বক্তব্য বা প্যানেলে আলোচনায় সীমাবদ্ধ নয়; তারা কনফারেন্সের বাইরে পথসভা, মিডিয়া ইন্টারভিউ, বিশ্বের প্রভাবশালীদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং যৌথ উদ্যোগে অংশগ্রহণ করছে। তারা নিশ্চিত করছে যে, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাবে এবং নীতি প্রণয়নেও তা অন্তর্ভুক্ত হবে। তরুণরা বলছে, যারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে, তাদের নেতৃত্ব ও সমাধানকেই কেন্দ্র করে তৈরি হতে হবে ভবিষ্যতের জলবায়ু নীতি। শুধু সমস্যা তুলে ধরাই নয়, তুলে ধরছি বাংলাদেশের টিকে থাকার গল্পও। আমরা সমাধানের পথও দেখাচ্ছি।
বাংলাদেশের হয়ে বার্তা
আমি একদল ব্রিটিশ এমপির সঙ্গে বৈঠকে একটাই বার্তা দিয়েছি, ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন, স্থানীয় নেতৃত্ব এবং বাস্তব অভিযোজনই আগামীর পথ। উদাহরণ হিসেবে ঢাকার করাইলের জলাভূমি পুনরুদ্ধার রি-ওয়েট উদ্যোগকে তুলে ধরেছি; যেখানে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ ও সঠিক নেতৃত্বে তৃণমূলে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। জলবায়ু সুবিচার দিবসের মঞ্চে এবং গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপশনের যুব প্যানেলে আমাদের দেশের বদ্বীপে নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও উপকূলের, হাওরের, চরের, পাহাড়ের নারী ও তরুণ এবং আদিবাসীদের দৈনন্দিন সংগ্রাম তুলে ধরেছি; যা সরাসরি আমাজনের আদিবাসী ও বনরক্ষক নেতাদের লড়াইয়ের সঙ্গে মিলে। এই আমাজনই এখন কপ৩০-এর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। বন উজাড়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং টেকসই জীবিকারএ তিনটি বিষয় এই সম্মেলনের মূল সুর নির্ধারণ করছে।
তরুণরা বদলাচ্ছে আলোচনার ভাষা
সম্মেলন কক্ষের করিডোরে হাঁটলেই বোঝা যায় আলোচনার ভাষা বদলে যাচ্ছে। আগে ‘সহায়তা’ শোনা যেত, এখন উচ্চারিত হচ্ছে ‘সুবিচার’, ‘অধিকার’, ‘জবাবদিহি’। তরুণ কর্মী ও আদিবাসী নেতারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন প্রযুক্তিগত সংকট নয়, এটি ক্ষমতা ও বৈষম্যের সংকট। কনফারেন্সের বাইরে তরুণরা পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে বলছেন–‘আমাদের ভবিষ্যৎ বিক্রির জন্য নয়।’ বড় ধরনের অবরোধ করে বনরক্ষক আদিবাসীরা সতর্ক করছেন, বন ধ্বংস শুধু পরিবেশগত ক্ষতি নয়, এটি সাংস্কৃতিক হত্যাও।
ভবিষ্যতের লড়াই...
কপ৩০-এর সাফল্য নির্ভর করছে বড় নিঃসরণকারী দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। জলবায়ু সংকট কোনো এক দেশের সমস্যা নয়, এটি মানবাধিকারের লড়াই, বেঁচে থাকার লড়াই। বেলেম তাই এক ধরনের বিশ্ব-সিদ্ধান্ত কেন্দ্র, এখানেই নির্ধারিত হবে, আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন হবে। বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো এখন তাকিয়ে আছে ন্যায্যতা, সহমর্মিতা ও বৈশ্বিক দায়বদ্ধতার আশায়। আমি বিশ্বাস করি, যদি বিশ্ব নেতৃত্ব সুবিচার, সাম্য এবং সম্মিলিত দায়বদ্ধতার পথে এগোতে পারে, তবে একটি সবুজ, টেকসই এবং ঝুঁকিমুক্ত ভবিষ্যৎ সম্ভব। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তোলার
দায়িত্ব এখনও আমাদের হাতেই। এ কারণেই আমরা বলি, ‘নিরাপদ ধরিত্রী সবুজ অরণ্য, নিশ্চিত করবে দুর্জয় তারুণ্য’!
- বিষয় :
- আমাজন
