উদ্যোগ
ছয় শতাধিক পাঠাগারে বই দিয়েছেন যিনি...
যেখানে বইমেলা সেখানেই কাজী এমদাদুল হক খোকন-এর দেখা... ছবি: সংগ্রহ
মো: হারুন মিয়া
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:৩০ | আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১২:০২
| প্রিন্ট সংস্করণ
কাজী এমদাদুল হক খোকন। মনের দিক থেকে এখনও তরুণ; যিনি কারও কাছে বইবন্ধু, কারও কাছে বইয়ের ফেরিওয়ালা নামে পরিচিত। তবে তাঁর কাজ সবার চাইতে আলাদা। কেউ কেউ পাঠাগার তৈরি করে মানুষকে বইমুখী করার চেষ্টা করছেন; আবার কেউ কেউ পাঠাগারে বই বিলি করছেন। এমদাদ তাঁদেরই একজন। তবুও তিনি সবার চাইতে ভিন্ন। বাংলাদেশের পাঁচ শতাধিকেরও বেশি পাঠাগারে নিজ অর্থায়নে বই বিলি করেন তিনি। এমদাদুল হক খোকনের গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। জন্ম ১৯৫৬ সালে ময়মনসিংহ জেলায়। বাবা ময়মনসিংহে চাকরি করার সুবাদে শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছেন এই শহরে। নগরীর বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং আনন্দ মোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছেন। বিএ পাস করেন শরীয়তপুরের ডামুড্যা কলেজ থেকে। পৈতৃক বসতবাড়ি ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের প্রিয়কাটি গ্রামে। পরিবারের মোট সদস্য সংখ্যা ৪ জন। এক মেয়ে আরেক ছেলে নিয়ে ছোট পরিবার। শিক্ষাজীবন পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন স্টেনোগ্রাফার হিসেবে। অবসরে যান ২০১৫ সালে। শরীয়তপুর গ্রামের বাড়ি হলেও রাজধানীর মিরপুরে থাকেন ভাড়া বাসায়।
ছয় শতাধিক পাঠাগারে ৩১ লাখ টাকার বই
দেশের ৬৪ জেলার আনাচেকানাচে গড়ে ওঠা ছোট পাঠাগারকে তিনি প্রাধান্য দেন বেশি। যাদের পাঠাগারে বই সংখ্যা কম এবং ভালো মানের বই নেই সেসব পাঠাগারে তিনি বই পাঠান। বই পাঠানোর ক্ষেত্রে ঢাকাকেন্দ্রিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কোনো কোনো পাঠাগার পছন্দের বইয়ের তালিকা দিলেও সেই অনুযায়ী তিনি বই পাঠান। সুন্দরবন কুরিয়ারে গ্রাম থেকে শহর আর শহর থেকে পাহাড়–সব জায়গাতেই পৌঁছেছে এই বইয়ের ফেরিওয়ালার বই। বই পাঠানোর ক্ষেত্রে তিনি সুন্দরবন কুরিয়ারে বই পাঠান। কুরিয়ার খরচও তিনি বহন করেন।
অনুপ্রেরণায় বাবা
বাবা কাজী আব্দুল গণী জীবিত থাকার সময়ে ছেলে এমদাদুল হক খোকনকে পরামর্শ দেন নিজেকে যেন সবসময় ভালো কাজে জড়িয়ে রাখে। সেই থেকে তিনি মানুষের পরোপকারী বন্ধু। মানুষকে আর্থিকভাবে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ২০১৬ সাল থেকে গ্রাম থেকে শহর, দেশের নানান প্রান্তে নিজস্ব অর্থায়নে বই বিলি করছেন। এমদাদের বাবা ১৯৮০ সাল মৃত্যুবরণ করেন। মা আবেদা খাতুন মারা যান ২০১০ সালে। এরপর থেকে তিনি বাবার কথায় নিজেকে ভালো কাজে জড়িয়ে রেখেছেন অবিরত।
সঙ্গী কেবল বই
২০২৪ সালে দেশের ৬ বিভাগে রাষ্ট্র সংস্কারে পাঠাগারের ভূমিকা শীর্ষক আয়োজনে ও সম্মিলিত পাঠাগার আন্দোলনের সহযোগিতায় বিভাগীয় পাঠাগার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট, রংপুর এবং চট্টগ্রাম অন্যতম। প্রতি বিভাগীয় সম্মেলনে কাজী এমদাদুল হক খোকন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সম্মেলনে আসা পাঠাগারকর্মী এবং উপস্থিত সকলের জন্য তিনি উপহার হিসেবে নিয়ে আসতেন বই। কোথাও বেড়াতে গেলে অথবা কোনো আয়োজনে অতিথি হিসেবে থাকলে সঙ্গে নিয়ে যান বই।
কাজ করে যেতে চান অবিরত
আগামীর পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে বইবন্ধু কাজী এমদাদুল হক খোকন বলেন, ‘ব্যাংকে থাকা স্বামী-স্ত্রীর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অর্থের লভ্যাংশ থেকে আমরা প্রতি মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গড়ে ওঠা পাঠাগারে বই পাঠাই। আমাদের দেশের মানুষ নিয়মিত বই পড়লে আমরাও একদিন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় থাকতাম। বাংলাদেশের মানুষ বই পড়ায় খুব পিছিয়ে আছে। আমি চাই বাংলাদেশের পাঠাগারগুলোতে পাঠকের উপস্থিতি বাড়ুক, মানুষ বই পড়ার দিকে অগ্রসর হোক। আমি যতদিন বেঁচে আছি ততদিন বইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকবো। দেশের দুর্বল পাঠাগারগুলো সচল করতে এবং মানুষকে বইমুখী করতে আমার লড়াইও চলমান থাকবে।’
