ব্যর্থ থেকে বিশ্বজয়ী
ছবি (ওপর থেকে নিচে) ব্রায়ান অ্যাকটন, ড. গ্লেন কনিংহ্যাম, বেয়ার গ্রেইলস, ওয়াল্ট ডিজনি ও জে.কে. রাউলিং কোলাজ: জেমেনি এআই ন্যানো ব্যানানা
আশিক মুস্তাফা
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:০৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সামাজিক মাধ্যমে ঢুকে পড়েছে আমাদের জীবন! ফলে এখানের সফলতা আমাদের ভাবায়। নিজেদের অযোগ্য মনে করায় বার বার। জীবনে ব্যর্থতা এসে পথ আগলে ধরতে পারে যে কোনো সময়। তাই বলে থমকে যাওয়ার কোনো মানে হয় না। ব্যর্থতাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে, সাফল্যের শীর্ষবিন্দু ছুঁয়েছেন অনেকেই। এমনই অনুপ্রেরণাদায়ক পাঁচ ক্ষেত্রের পাঁচ কিংবদন্তির জীবনের গা-ঝাড়া দিয়ে ওঠার গল্প হাজির করলেন আশিক মুস্তাফা
২০০৯ সালের মাঝামাঝি সময় তখন। একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার দ্বারে দ্বারে চাকরি খুঁজছিলেন। অথচ তাঁর ঝুলিতে আছে ইয়াহু ও অ্যাপল কম্পিউটারসহ ডজনখানেক নামি কোম্পানিতে চাকরির অভিজ্ঞতা। বর্তমানে যাদের হাতে অনলাইনের রাজত্ব–এমন দুটি কোম্পানি এক্স হ্যান্ডল (সাবেক টুইটার) আর ফেসবুকেও ঢুঁ মারলেন। কাজের কাজ কিছুই হলো না। কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই নিজেকে যোগ্য হিসেবে তুলে ধরতে পারলেন না তিনি। উপায়ান্তর না পেয়ে একটা টিম বানালেন ইয়াহু আলম এবং জান কুমকে নিয়ে। বানালেন ক্লাউডভিত্তিক মেসেজিং অ্যাপ্লিকেশন হোয়াটসঅ্যাপ। বলছি ব্রায়ান অ্যাকটনের কথা। যে ফেসবুকের কাছে চাকরি চেয়েও এক সময় শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়েছিল তাকে, সেই ফেসবুকের কাছে ২০১৪ সালে তিনি হোয়াটসঅ্যাপ বিক্রি করেন ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এর পরের কথা শুধুই ইতিহাস!
গল্পটা দ্রুততম মানবের
স্কুলে আগুন লাগলে ভয়াবহ দগ্ধ হন এক ছাত্র। আগুনের উত্তাপ টের পেয়ে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, আর কখনও আলোর মুখ দেখবেন না। হাসপাতাল থেকে তাঁর মাকেও জানানো হয়, আপনার ছেলে বাঁচবেন না! কারণ, তাঁর শরীরের প্রায় অর্ধেক পুড়ে গেছে। যদি ভাগ্যের গুণে বেঁচেও যান, সারা জীবন পঙ্গু হয়ে থাকবেন। এমন কথা শোনার পর কোনো মা স্বপ্ন দেখবেন ছেলেকে নিয়ে? কিন্তু পুড়ে যাওয়া সেই ছেলে এভাবে হার মানতে চাননি নিয়তির কাছে। এমনকি পঙ্গু হয়েও থাকতে চাননি। চিকিৎসকদের অবাক করে দিয়ে সে যাত্রায় বেঁচে গেলেও, কোমর থেকে নিচের অংশে চলাফেরার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এভাবেই একদিন তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেওয়া হয়। বাড়ি ফেরার পর হুইলচেয়ার তাঁর নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। একদিন হুট করে চেয়ার ছেড়ে সবুজ ঘাসে নেমে পড়েন। এ কী! ঠিকই তিনি একটু একটু করে হাঁটতে পারছেন। তিনি আরও হাঁটতে থাকলেন। হাঁটতেই থাকলেন। পরদিনও ঠিক নিয়ম করে হাঁটা শুরু করেন। নিজেকে বিশ্বাস করান, আগের মতোই হাঁটতে পারবেন। এভাবে হাঁটতে হাঁটতে দৌড়!
সেই পুড়ে যাওয়া স্কুলেই ফের হাঁটা শুরু করলেন তিনি। তার সঙ্গে দৌড়টাও যোগ হলো। কলেজে উঠেই একটা ট্র্যাক টিম গড়ে নিলেন। তারপর সবাইকে অবাক করে বনে গেলেন বিশ্বের দ্রুততম দৌড়বিদ! ড. গ্লেন কনিংহ্যামের কথা বলছি। যে ছেলের স্কুলজীবনে মরে যাওয়ার কথা, বাঁচলেও পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে থাকার কথা, তাঁর ঘুরে দাঁড়ানো অবাক করে দিয়েছে সেই চিকিৎসকদের। এমনকি তাঁর প্রিয় মাকেও!
বেয়ার গ্রেইলস; দুনিয়া মাতানো উপস্থাপক
এই ভদ্রলোকের ঘাড়ে ব্যর্থতা উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনের ঢোকার পর। স্কুল ছাড়ার পর তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ ও হিমালয় পর্বতমালা আরোহণের কথা ভাবতে থাকলেন। ভেবেই বসে থাকলেন না, যোগ দিলেন টেরিটোরিয়াল আর্মিতে। তারপর তিন বছরে ২১টি এসএএস রেজিমেন্ট আর্টিস্ট এবং রিজার্ভ এসএএসের দায়িত্বও পালন করেন। তবে ১৯৯৬ সালে তিনি জাম্বিয়াতে ফ্রি-ডাউন প্যারাসুটিং দুর্ঘটনায় পড়েন। প্রায় ১৬ হাজার ফুট ওপর থেকে আংশিক খোলা প্যারাসুট নিয়ে পড়ে যান তিনি। গুরুতর আহত অবস্থায় মুখোমুখি হন সার্জনের। শরীরে চলে কাটাছেঁড়া। সার্জনের সন্দেহ, তিনি কি আসলেই হাঁটতে পারবেন আর! সুস্থ হওয়ার জন্য প্রায় এক বছর সামরিক পুনর্বাসনে কাটাতে হয় তাকে। ১৬ অক্টোবর ১৯৯৮। তাঁর প্যারাসুট দুর্ঘটনার প্রায় ১৮ মাস হতে চলল তখন। এ দিনেই তিনি এক অভাবনীয় কাণ্ড ঘটিয়ে বসলেন। ছেলেবেলার স্বপ্ন ছুঁয়ে ফেললেন! সেই সর্বনাশা প্যারাসুটেই ছুঁয়ে ফেললেন এভারেস্ট চূড়া। এই সেই বেয়ার গ্রেইলস, যিনি ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড শিরোনামের অনুষ্ঠান দিয়ে দুনিয়া মাত করে চলেছেন।
চাকরি হারানো মিকি মাউসের স্রষ্টা
কল্পনা শক্তি আর ভালো আইডিয়ার অভাব–এই দোহাই দিয়ে যে সংবাদপত্রে তিনি চাকরি করতেন, সেখান থেকে ছাঁটাই করে দেওয়া হলো তাঁকে। ১৯১৯ সালের কথা। এর এক বছর পর চাকরি হারানো কল্পনাশক্তির অভাব-অনটনে থাকা এই কার্টুনিস্ট হলিউডে পাড়ি জমান। আরেক কার্টুনিস্টকে নিয়ে একটা কোম্পানি গড়ে তোলেন; যার শুরুটা তেমন ভালো ছিল না। ফলে বেশিদূর এগোতে পারেননি। এর মাঝে কিছুদিন রেড ক্রসের অ্যাম্বুলেন্সে চালকের চাকরিও করেন। সেখানেও থিতু হতে পারলেন না। রক্তে যে মিশে আছে কার্টুন! লাফ-ও-গ্রামস নামে স্টুডিও করে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন। কিন্তু না, অর্থনৈতিক সংকটে ১৯২২ সালে বন্ধ হয়ে যায় নিজের হাতে গড়া ফিল্ম স্টুডিও লাফ-ও-গ্রামস। তিনি একেবারে দেউলিয়াও হয়ে যান। এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস যেন বেড়ে যায় আরও। এই আত্মবিশ্বাসে ভর করে তিনি বানালেন ওসওয়ার্ল্ড অ্যান্ড লাকি র্যাবিট। এতেই আসে তাঁর প্রথম সাফল্য। এরপর এলিস কমেডিস চলচ্চিত্রটি বানিয়ে রাতারাতি প্রতিভাবান ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যান। ১৯২৮ সালের ১৮ নভেম্বর প্রথম মিকিমাউস আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৩২ সালে ওয়াল্ট ডিজনি নির্মাণ করেন তাঁর প্রথম রঙিন কার্টুন ছবি ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড ট্রিস। এ কার্টুনটি নিয়ে আসে ডিজনির জীবনে প্রথম একাডেমি অ্যাওয়ার্ড। ১৯৫০ সালে তিনি তাঁর বিনোদন পার্কের সম্প্রসারণ করেন আর ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ডিজনিল্যান্ড। নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন এটি ওয়াল্ট ডিজনির গল্প!
বিষণ্ন লেখকের দুনিয়া
তাঁর জন্য কোনো ভূমিকা রাখার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। নামেই সবাই চিনে নিতে পারবেন; যার বই বিক্রি হয়েছে সারা দুনিয়ায়। তাও ৪০০ মিলিয়ন কপির ওপরে। অথচ এই লেখিকা একসময় বিষণ্নতায় ভুগতেন। শুধু তাই নয়, আত্মহত্যাকেও বেছে নিতে চেয়েছিলেন তিনি! এর কারণ, দাম্পত্য জীবন ভেঙে গিয়েছিল তাঁর। বেকার হয়ে পড়েন তখন। ঘরে ছিল সন্তান। উপায়ান্তর না দেখে তিনি সরকারি অনুদানের জন্যও ঘুরেছেন। ১৯৯০ সালে ভাগ্য বদলের জন্য ম্যানচেষ্টার থেকে লন্ডনের পথ ধরলেন। ট্রেন দেরি করায় একটি গল্পের প্লট ভাবলেন তিনি। সেই ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিলেন ১৯৯৫ সালে। তারপর সেই পাণ্ডুলিপি জমা দিলেন একে একে ১২টি প্রকাশনীর কাছে। সবাই তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। এর মধ্যে সম্পাদক ব্যারি কানিংহামের মায়া হলো তাঁর প্রতি। তাঁকে ছোটদের বই লেখার একটা কাজ দিলেন।
এরপর তো সব যেন রূপকথা! সেই লেখিকার বই নির্দিষ্ট সময়ে হাতে না পেলে তাঁর পাঠকরাই যেন বিষণ্নতায় ভোগেন এখন! বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ বিক্রীত লেখক। এখন তাঁর জীবনীও লুফে নেন পাঠক। আত্মহননের পথে চলা এক সময়ের সেই বিষণ্ন লেখকই আজকের জে.কে. রাউলিং।
ঘুরে দাঁড়ানোর এমন অসংখ্য মন্ত্র খুঁজে পাবেন বিখ্যাতদের জীবনী ঘাঁটলে। এবার আপনি খুঁজুন নিজের ঘুরে দাঁড়ানোর মন্ত্র। ব্যর্থতা হোক আপনার জেগে ওঠার শক্তি!
- বিষয় :
- বিশ্ব
