ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকার: মাহফুজ আলম

সরকারের কাছ থেকে সবাই সুবিধা নেয়, কেউ দায় নেয় না

শাপলা-শাহবাগের দ্বন্দ্ব জুলাইয়ে থাকলে অভ্যুত্থান সফল হতো না

সরকারের কাছ থেকে সবাই সুবিধা নেয়, কেউ দায় নেয় না
×

মাহফুজ আলম

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়াসির আরাফাত

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৫ | ০১:৩৩ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৫ | ১২:৩৮

ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে সমকাল কথা বলেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. মাহফুজ আলমের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইয়াসির আরাফাত

সমকাল: আপনিসহ কয়েকজন তরুণের নেতৃত্বে জুলাই অভ্যুত্থান হলো, পরে রাষ্ট্র পরিচালনায় এলেন। আপনার তো রাষ্ট্র নিয়ে একটা বোঝাপড়া ছিল। সে অনুযায়ী রাষ্ট্রকে নিতে পারলেন কি?

মাহফুজ আলম: অভ্যুত্থানের আগে আমাদের যে পাঠচক্র ছিল, সেখানে একটা রাষ্ট্রকল্প ছিল– কেমন প্রতিষ্ঠান হওয়া দরকার, কীভাবে রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়া দরকার ইত্যাদি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সবার সরকার। ঐকমত্যের সরকার। এই সরকারের শক্তিমত্তার দিক হচ্ছে, সবাই এই সরকারের সঙ্গে আছে। দুর্বলতার দিক হচ্ছে, সবাই অনেক কিছু দাবি করে। সবাই সুবিধা নেয়, কিন্তু কেউ দায় নেয় না। দিন শেষে সরকারকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের এটি একটি সংকট বলে আমি মনে করি। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের যে দাবিটি ছিল, সে কাজ চলমান আছে। এই জায়গায় আমাদের অগ্রগতি আছে। আমরা শুরু করে দিতে পেরেছি, পরের সরকার এসে তা চালিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশের জনমানুষের জীবনে এটা বড় প্রভাব ফেলবে। 

সমকাল: চব্বিশের জুলাইয়ে আমরা ‘বাংলা ব্লকেড’, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোজ’– এমন সব ভিন্নধর্মী নামে কর্মসূচি দেখেছি। শোনা যায়, এসব কর্মসূচির নাম আপনার দেওয়া। আপনাকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক আলোচনায় আপনি বলেছিলেন, এসব ভাষাগত কারণেই মানুষ এ আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল।

মাহফুজ আলম: ভাষা বলতে শুধু ভাষা না, ভাষার অর্থ কিন্তু অনেক বড়। বাংলাদেশে বাংলা ভাষা বলতে বাংলা সাহিত্য বোঝায়, এটা একটা সমস্যা। আসলে ভাষা বলতে আন্দোলনের ভাষা, বক্তব্য এবং কৌশল– সব কিছুকেই বোঝায়। শাপলা ও শাহবাগের যে দ্বন্দ্ব ছিল, সেক্যুলার-ইসলামিস্ট যে দ্বন্দ্ব ছিল সমাজে, সেটা জুলাইয়ের সময়ে থাকলে অভ্যুত্থান কখনোই সফল হতো না। এই দ্বন্দ্ব ভেঙে একটা অভিন্ন ভাষা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। সেটাই বিভিন্ন আদর্শের লোককে রাষ্ট্র সংস্কার, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও নির্বাচনের প্রশ্নে সবাইকে এক জায়গায় আনতে পেরেছে। একইভাবে পুরোনো বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গণতন্ত্রায়নের প্রশ্নের যে ভাষা, যেগুলোকে তারা আপন ভাবতে পেরেছে। সেটাই মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে, তাদের মনে লেগেছে। মানুষ বলতে আমি বৃহত্তর জনগোষ্ঠী– একেবারে সাধারণ আন্দোলনকারী, যেমন– শ্রমিক বা সাধারণ ঘরের নারীদের কথা বোঝাইনি। বরং এ আন্দোলনে যারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন, তারা চাইলে স্যাবোটাজ বা পুরো আন্দোলনটা ভণ্ডুল করে দিতে পারতেন। তাদের কাছে পরিষ্কার বার্তা গেছে– একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। এখানে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা আদর্শভিত্তিক বিপ্লব-অভ্যুত্থান লক্ষ্য নয়। এই অর্থে বলেছি, একটা অভিন্ন ভাষা, যা আমি বা অন্যরা তৈরি করেছি– বিষয়টা এ রকম না। এটা কোনো ব্যক্তির তৈরি না, এটি আসলে একটি পরম্পরা। কোনো ব্যক্তি যে সবকিছু ঠিক করে দিয়েছে, বিষয়টা তা নয়।

সমকাল: নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের কথা আপনি চব্বিশের ৩ আগস্ট শহীদ মিনারের বক্তব্যে বলেছিলেন। দেশের মানুষের কাছে এক বছরে সে রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কতটুকু দৃশ্যমান হয়েছে?

মাহফুজ আলম: নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বলতে শুধু রাজনৈতিক বন্দোবস্ত নয়; সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, আদর্শিক এবং রাজনৈতিক– এই চার ধরনের বন্দোবস্ত আছে। আমরা বারবার এই কথাও বলেছি, ক্ষমতার একটা ত্রিভুজ আছে– সামরিক, বেসামরিক ও আমলাতান্ত্রিক। একইভাবে গণমাধ্যম, অভিজাত সাংস্কৃতিক কাঠামো এবং মুষ্টিমেয় ব্যক্তির কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা– এ তিনটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে একটি নিপীড়নমূলক শাসন ব্যবস্থা তৈরি হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলকে এই তিনটির সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী হতে দেখেছি। ফলে এগুলোর যদি বিকল্প তৈরি না করা যায়, এদের অন্তর্নিহিতভাবে পরিশুদ্ধ না করা যায়, তাহলে পরিবর্তন সম্ভব নয়। সব পরিবর্তনই কসমেটিক হবে– ওপরে ওপরে হবে, প্রলেপ হবে। আমূল যে সংস্কারের কথা আমরা বলছি, সেটি সম্ভব হবে না। গত এক বছরে কাজটা শুরু করা গেছে, কিছু কিছু জায়গায় হয়তো পরিশুদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি শুরু করতে পেরেছি। এটি দীর্ঘ একটি যাত্রা, এক-দুই বছরে সম্ভব নয়। 

সমকাল: ছাত্রদের নতুন দলের নেতাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ছাত্র নেতৃত্ব নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য কতটা কাজ করতে পারছে?

মাহফুজ আলম: অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, সমাজে বৃহত্তর কিছু ঘটলে সেখানে কিছু বিচ্যুতিও থাকে। এই বিচ্যুতিকে সমর্থন করার কোনো সুযোগ নেই। এখনও ছাত্রদের মধ্যে সেই নিখাদ আবেগ ও স্পিরিটটা আছে। রাজনৈতিক দলগুলো, ছাত্র সংগঠনগুলো যদি ছাত্রদের রাজনৈতিক শিক্ষাটা দিতে পারে, রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে পারে, তাহলে আস্তে আস্তে এই দুর্বৃত্তায়ন এবং দুর্নীতি কমে যাবে।

সমকাল: প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, রমজানের আগে ফেব্রুয়ারিতেই জাতীয় নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের এই মেয়াদ আশানুরূপ সংস্কারকাজ করার জন্য যথেষ্ট কি?

মাহফুজ আলম: সরকারের সদিচ্ছা ছিল; কিন্তু শক্তিমত্তা যদি থাকত, নিজে সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের দিকে যেতে পারত। কিন্তু অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ভাবলেন, আসলে এভাবে সরকার কর্তৃক না করে বরং জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে সবার সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্যের ভেতর দিয়ে সংস্কার করতে হবে। তিনি এই চেষ্টাটা করছেন। যদিও এতে জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। তার পরও দেশে এটি সফল উদাহরণ তৈরি হলো। রাজনৈতিক দলগুলোও বসে দেশ নিয়ে, রাষ্ট্র নিয়ে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার নিয়ে ভাবতে পারে এবং ঐকমত্যে আসতে পারে– এটি দেখা গেল। আমি মনে করি, একটি ভালো চর্চার উদাহরণ তৈরি হলো। 

সমকাল : আপনি বললেন, সরকারের যদি শক্তিমত্তা থাকত! ঘাটতিটা আসলে কোথায়?

মাহফুজ আলম: আসলে পুরো দেশে বা সরকারের সব জায়গায় রাজনৈতিক কর্মী বাহিনী নেই। সরকারের বক্তব্য প্রচারের যেই ক্লীশে পদ্ধতি আছে, সেটিও এখন নেই। সরকারের ওই অঙ্গগুলো নেই, যা একটি রাজনৈতিক সরকারের থাকে। এই সরকার তো কোনো রাজনৈতিক সরকার না এবং তার কোনো ছাত্র সংগঠন নেই। এই আমলাতন্ত্র একটি রাজনৈতিক সরকারের মধ্যে কাজ করতে অভ্যস্ত। ফলে রাজনীতির বাইরে থেকে আসা এ রকম একটি সরকার আসলে চালিয়ে নেওয়া কঠিন। আসলে এই সরকার এক ধরনের সংকটে পড়ছে। যেটি আসলে বাস্তবায়নের সংকট। যেটি আসলে সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা বা জবাবদিহির সংকট নয়। 

সমকাল : আপনি তথ্য মন্ত্রণালয়ে নিজের কাজের মূল্যায়ন কীভাবে করবেন?

মাহফুজ আলম : আমার কাছে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ আছে। যেগুলো বাস্তবায়নযোগ্য ও আশু করণীয়, সেগুলো আমরা করে যাব। আর আমাদের একটা কাজ ছিল, গত ১৫ বছরের যে সাংবাদিকতা, তার একটা বিচার করা। এক ধরনের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং, তারা আসলে কী কী করেছে এবং তারা কীভাবে ফ্যাসিস্ট রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করেছে। আমরা তা করার চেষ্টা করছি। 

সমকাল : ভারত বা অন্য দেশ থেকে বাংলাদেশবিরোধী অপপ্রচার হচ্ছে বলে সরকার থেকেও অভিযোগ করা হয়েছে। এই অপপ্রচার মোকাবিলায় সরকার কী উদ্যোগ নিয়েছে? 

মাহফুজ আলম : পিআইবিতে ‘বাংলা ফ্যাক্ট’ নামে একটি টিম কাজ করছে। ভারতীয় পার্লামেন্টে বাংলা ফ্যাক্টকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। আমি মনে করি, বাংলা ফ্যাক্ট একটা ইমপ্যাক্ট ফেলতে পেরেছে। তার পরও সরকারের ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানের বাইরে প্রাইভেট ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব আছে। 

সমকাল : রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো এখনও জনপ্রিয়তা পাচ্ছে না। আগের সব সরকারের মতোই অনেকটা ঢিমেতালে চলছে। আসল সমস্যা কোথায়?

মাহফুজ আলম : বিটিভির দর্শক বেড়েছে। বেতারে আমরা একটা জরিপ চালিয়েছি– কী ধরনের কনটেন্ট দরকার। জরিপটা একবার স্থায়ীভাবে করেছি। আরেকটি জরিপ করছি তরুণদের ধরে। এ দুই জরিপ মিলিয়ে অনুষ্ঠান সাজানোর চেষ্টা করব। বিটিভিতে বিটিভি নিউজ নামে আরেকটি চ্যানেল চালু হয়েছে। এটা অফিসিয়ালি আমরা এক-দুই মাসের মধ্যে চালু করব। বিটিভিতে নতুনকুঁড়ি, সিসিমপুর ও মিনা কার্টুন থেকে শুরু করে যে যে কনটেন্ট আসলে জনগণ পছন্দ করত, সেসব ফেরত এনেছি। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকেও (বাসস) যুগোপযোগী করার চেষ্টা করছি। 

সমকাল : সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিনের একটা অসন্তোষ, অসংগতি রয়েছে। কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে ওয়েজবোর্ডের প্রয়োগ সীমিত। এ বিষয়ে আপনার ভাবনা কী?

মাহফুজ আলম : সাংবাদিকদের ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে কাজ করা হবে। ওয়েজবোর্ড সম্পর্কিত আইনি কার্যক্রমগুলো আমাদের পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে। ওয়েজবোর্ড শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীন, সাংবাদিকতাও অন্য পেশার মতোই, তারাও শ্রমিক। ওই অর্থে শ্রম মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কাজ আছে। এগুলো আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় করে আমরা চেষ্টা করব এই সরকারের সময় নবম ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়ন করে দিয়ে যেতে।

সমকাল : আপনি ফেসবুক পোস্টে বলেছেন, এক-এগারোর প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে। এ সময়ে এসে এ কথা বলার অর্থ কী?

মাহফুজ আলম : এটা নিয়ে আমি আর মন্তব্য করতে চাই না।

সমকাল : নির্বাচন নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

মাহফুজ আলম : দেশে একটা জাতীয় নির্বাচন দরকার এবং সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, যাতে একটা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হয়। সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়, বিশেষ করে তরুণদের। 

সমকাল : সরকারের মেয়াদ শেষ হলে অথবা এর আগেই যদি দায়িত্ব ছাড়েন, সে ক্ষেত্রে পরবর্তী পরিকল্পনা কী?

মাহফুজ আলম : নির্বাচন করব কি করব না, কোনো রাজনৈতিক দলে যোগ দেব কি দেব না, যোগ দিলে কোন দলে যোগ দেব– এখনও কিছু নিশ্চিত নয়। বরং সরকারের যে কাজ, সেগুলো আগে শেষ করতে চাই। পরে রাজনীতি নিয়ে ভাবা যাবে।

সমকাল : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মাহফুজ আলম: সমকালকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

×