ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্তর্বর্তী সরকারের ১ বছর: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি

সরকারের উদ্যোগ নেই, শুধু রুটিন কাজ করছে

সাক্ষাৎকার

সরকারের উদ্যোগ নেই, শুধু রুটিন কাজ করছে
×

অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন

অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৫ | ০১:০৮ | আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২৫ | ১৯:০৫

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেনের সঙ্গে কথা বলেছে সমকাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসনাইন ইমতিয়াজ

সমকাল: অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। এই সময়ে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে তাদের কার্যক্রমকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

ইজাজ হোসেন: আমাদের জ্বালানি খাত মূলত গ্যাস। এটি দুই বছর আগেই শোচনীয় অবস্থায় চলে গেছে। এখন যদি নিয়মিত গ্যাসের নতুন উৎস যোগ না হয়, তাহলে প্রতিবছরই অবস্থার অবনতি হবে। অন্তর্বর্তী সরকার যেসব পরিকল্পনা নিয়েছে, সেগুলা মূলত দীর্ঘমেয়াদি– যেমন ৫০টা কূপ খনন করবে। এগুলো দিয়ে তাৎক্ষণিক সমাধান হবে না। অর্থাৎ, আমাদের সমস্যা যা ছিল, তাই রয়ে গেছে বরং আরও বেড়ে গেছে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এসেছে, তাই বিদ্যুতে একটু স্বস্তি পেয়েছি। কিন্তু জ্বালানির ব্যাপারটা অত্যন্ত শোচনীয় অবস্থায় পৌঁছেছে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের জন্য হাহাকার পড়ে গেছে। এটাই হলো মূল চিত্র। এই সরকার আসার পরে তারা কোনো সমাধানের দিকে যায়নি। তাদের কার্যক্রম দেখে মনে হয়েছে, গত আমলে (আওয়ামী লীগ সরকার) যেভাবে ছিল, সেভাবেই চালিয়ে যাচ্ছে। অনেকটা সময়ক্ষেপণের মতো– দীর্ঘমেয়াদি কিছু নিয়ে লাভ কী? ঝামেলায় পড়ার দরকার কী? যদিও এ কারণে দেশ ঝামেলায় পড়ছে। 

সমকাল: ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সমালোচনার অন্যতম খাত ছিল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ চুক্তিগুলো নিয়ে তীব্র সমালোচনা ছিল। বর্তমান সরকার এসে একাধিক কমিটি করেছে চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য। কিন্তু এসব কমিটির কোনো প্রতিবেদন জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়নি। দেশের স্বার্থবিরোধী বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? 

ইজাজ হোসেন: এটাকে সাংঘাতিক দুঃখজনক মনে করি। কারণ এত বড় একটা অভ্যুত্থান হলো, একটা বড় পরিবর্তন এলো। কিন্তু যেসব মৌলিক অনিয়মের কারণে সমস্যা হয়েছে, সেখানে আমরা হাত দিতে পারলাম না। আমরা ব্যাংকিং খাতে হাত দিয়েছি, স্বীকার করলাম। যারা চুরি করেছে, হত্যা করেছে, তাদের ধরার বিষয়ে উৎসাহ রয়েছে। কিন্তু আরও তো নানা বিষয় সমাজে রয়েছে। গত সরকারের সময় যেসব খাতে চুরি-অনিয়ম হয়েছে, তার মধ্যে প্রধান জ্বালানি-বিদ্যুৎ। এখানে হাত দিতে হতো। তারা (অন্তর্বর্তী সরকার) প্রথমে এ বিষয়ে কথা বলেছিল, তার পরে কী কারণে যেন হাতটা গুটিয়ে ফেলেছে। এটা দুঃখজনক। আমি বলছি না যে, এদের ধরতে গেলে আমাদের বিদ্যুতের সমস্যা হবে। ধরারও অনেক প্রক্রিয়া আছে। হুট করে ব্যবসা বন্ধ করে দিলে তো সমাধান আসবে না। এখানে দুইটা অংশ– একটা সরকার, যারা সরাসরি নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য কিংবা চুরি করার ক্ষতিকর চুক্তি করেছিল। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু সুবিধাবাদী উদ্যোক্তা। এই দুর্নীতির জন্য সরকার দোষী। কারণ, সরকারই তো ওদের বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়েছে। নানা সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এসব দুর্নীতিবাজের শাস্তি হতে হবে। আমি বলছি না, তাদের জেলে নিতে হবে, ব্যবসার দখল নিতে হবে। তাদের অতি মুনাফার একটা অংশ ফিরিয়ে আনা দরকার। সেবামূলক কাজ যেমন– হাসপাতাল তৈরি, গরিব মানুষের চিকিৎসার কাজে তাদের বিনিয়োগে বাধ্য করতে হবে। 

সমকাল : বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের বহুল আলোচিত দায়মুক্তি আইন বাতিল করায় এ খাতের অগ্রগতি কমেছে বলে অনেকে মনে করেন। 

ইজাজ হোসেন: বিশেষ বিধান বাতিল করেছে, এটা খুবই ভালো কাজ। আমি এটাকে সমর্থন করি। কিন্তু ওই যে বলে, ‘বেবি উইথ দ্য বাথ ওয়াটার’ অর্থাৎ, বাথটাবের পানির সঙ্গে বাচ্চাকেও ফেলে দিলাম, এটা তো হয় না। আইন বাতিলের সঙ্গে সঙ্গে এমন কিছু প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে, যা সমগ্র খাতে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ৩১টি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। এগুলোর কোনো দোষ ছিল না। এভাবে প্রকল্প বাতিল করায় বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা গেছে। অনেকের বিনিয়োগ জলে গেছে। তারা নতুন করে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চাচ্ছেন না। 
এই আইনে প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে থাকা দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্প বাতিল করা হলো, এটাও ঠিক হয়নি। কারণ, গ্যাস সংকট আরও ঘনীভূত হলে অর্থ থাকলেও আমরা আমদানি করতে পারব না। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল, দ্রুত দরপত্র আহ্বান করা। কিন্তু তা করেনি। এর মধ্যে একটা বছর চলে গেছে। বরং আমরা ওই উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতাম। নানা শর্ত দিয়ে তাদের প্রকল্পের কাজ দেওয়া হলে ২০২৬ সালের শেষে এগুলো চলে আসত। এখন ২০২৭ সালেও সম্ভাবনা নেই। তাই গ্যাসের সংকট কাটানোর উপায় থাকছে না। 

সমকাল: একটা বিষয় বলা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার থাকায় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই সাড়া দেননি। 

ইজাজ হোসেন: এটা অবশ্যই ঠিক যে, অন্তর্বর্তী সরকারের কারণে দেশি-বিদেশি বিনয়োগকারীরা ভরসা পাচ্ছেন না। তবে নির্বাচনের একটা সময়সীমা পাওয়া গেছে। এখন অনেকে আগ্রহী হতে পারেন। সরকার এর মধ্যে দরপত্রের কাজগুলো এগিয়ে রাখতে পারে। এতে নির্বাচনের আগে না হলেও নতুন রাজনৈতিক সরকার এসে দ্রুত কাজগুলো সম্পন্ন করতে পারবে। তবে এটা বলতে হয়, বিনিয়োগকারীরা সরকারকে অস্থিতিশীল ভাবলেন, এটা সরকারের ব্যর্থতা। কারণ, তারা বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি।
 
সমকাল: ভর্তুকি কমিয়ে আনতে গত আওয়ামী লীগ সরকার বছরে কয়েকবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো শুরু করেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল কয়েক বছর এভাবে দাম বাড়িয়ে উৎপাদন খরচ আর খুচরা বিক্রির মধ্য পার্থক্য কমিয়ে শূন্য করা। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়নি। তারা বলছে, খরচ কমিয়ে ভর্তুকি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। সরকারের এই উদ্যোগটা কি টেকসই?

ইজাজ হোসেন: এটা ঠিক হয়নি। দেশ এবং বিদ্যুৎ খাত সবকিছু মিলে যে অবস্থায় আমরা আছি, আজ হোক বা কাল দাম বাড়াতে হবে। এখন যদি আমি পিছিয়ে দিই, তার মানে কী? পরে একবারে বেশি দাম বৃদ্ধি করতে হবে। তখন গ্রাহকদের ওপর চাপ বেশি পড়বে।
 
সমকাল : আপনার দৃষ্টিতে বর্তমান শুধু রুটিন ওয়ার্ক যাচ্ছে? 

ইজাজ হোসেন: আমি তো তাই মনে করছি– তারা রুটিনভাবে কাজ করে গেছে। এই যে গ্যাস অনুসন্ধানের ৫০-১০০টা কূপ খনন, এটা গত সরকার চালু করে গেছে। এরা অব্যাহত রেখেছে, সরে আসেনি। তাদের আরেকটা ব্যর্থতা, নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ নিয়ে। এটি নিয়েও এই সরকার কিছু করেনি। আজকাল ১০০ মেগাওয়াটের একটা সৌর প্রকল্প ছয় মাসে করে ফেলা যায়। কিন্তু এক বছর হয়ে গেছে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন একটুও বাড়েনি। তাই বলতে হচ্ছে, সরকার দায় এড়িয়ে শুধু নিয়মিত কাজগুলো করে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

×