সাক্ষাৎকার : মো. আব্দুর রহিম
কৃষকের জন্য ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ
মো. আব্দুর রহিম
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম খাদ্য সংকটের ঝুঁকি, কৃষক কার্ড, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে সম্প্রতি সমকালের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাহিদুর রহমান
সমকাল: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর কোন বিষয়কে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছেন?
আব্দুর রহিম: সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিষয়ে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ২০টি নির্দেশনা সংবলিত একটি অফিস আদেশ জারি করি। এর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষ করে মাঠের কাজে প্রথম সারিতে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, তাঁরা যেন নিয়মিত পাক্ষিক মাঠ পরিদর্শনের সূচি অনুসরণ করেন এবং কৃষকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ বজায় রাখেন। এ ছাড়া মাঠপর্যায়ে সার, কীটনাশক ও সেচ ব্যবস্থাপনার ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। অধিদপ্তরের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা আনতে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরকারি ই-জিপি ব্যবস্থায় দক্ষ করে তুলতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যাতে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত সম্পন্ন করা যায়। এ ছাড়া কৃষি উন্নয়নের জন্য ২৯টি নতুন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন উইংয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে প্রতি দুই মাস অন্তর সমন্বয় সভা করা হচ্ছে।
সমকাল: সরকার কৃষক কার্ড কর্মসূচি চালু করছে। এর প্রস্তুতি কেমন?
আব্দুর রহিম: কৃষক কার্ড বর্তমানে সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি। এর পাইলট কার্যক্রম সফলভাবে শেষ হয়েছে। এখন দেশের ৫০৩টি ব্লকে কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ চলছে। এ কর্মসূচি সরাসরি কৃষি মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে মনিটর করা হচ্ছে। দেশের ৫ হাজার ৫০০ উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা প্রশিক্ষণ নিয়ে মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছেন। মাত্র চার দিনেই প্রায় সাড়ে ৪ লাখ কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এই কার্ড চালু হলে কৃষকেরা সরকারি প্রণোদনা, কৃষিঋণ, বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার সুবিধা পাবেন।
সমকাল: দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অগ্রগতি কী?
আব্দুর রহিম: আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর জাতীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চলতি বছর ২৫ লাখ গাছ লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এরই মধ্যে ১৯ লাখের বেশি গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রতিটি গাছ ‘জিও-ট্যাগিং’-এর মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যাতে শুধু রোপণ নয়, গাছের টিকে থাকাও নিশ্চিত করা যায়।
সমকাল: সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
আব্দুর রহিম: সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলা–রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য ৩২০ টন উন্নত জাতের ধানবীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বিআর২২, বিআর২৩, বিনাশাইল ও নাজিরশাইল। সরকারি জমিতে বীজতলা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকেরা দ্রুত চারা পেতে পারেন। পাশাপাশি বিনা মূল্যে গাছের চারা, জৈব সার ও প্রয়োজনীয় খুঁটি সরবরাহ করা হচ্ছে।
সমকাল: এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রস্তুতি কী?
আব্দুর রহিম: জলবায়ু পরিবর্তন এখন কৃষির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। এ কারণে আমরা অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী প্রযুক্তি ও জাত সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছি। হাওর অঞ্চলের জন্য আগাম ও ঠান্ডা সহনশীল ব্রি ধান-১১৮ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি বন্যা ও লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও টেকসই করতে সোলার সেচব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাত জোন গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
সমকাল: জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় তীব্র খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে পড়বে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে আপনাদের প্রস্তুতি কেমন?
আব্দুর রহিম: অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে অর্থনৈতিক মন্দা ও স্থবিরতায় বাংলাদেশে গুরুতর খাদ্য সংকট দেখা দেবে। নিজস্ব উৎপাদন ভালো হওয়াতেই বাংলাদেশে খাদ্য নিয়ে কোনো হাহাকার হয়নি, সংকট হয়নি। বেশি জমি চাষের আওতায় আনা ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। বীজ, সারসহ নানা প্রণোদনা কৃষকদের দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারণ করা হবে।
সমকাল: কৃষিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী বলে মনে করেন?
আব্দুর রহিম: আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ হলো ফসল কাটার পরের ক্ষতি কমানো এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোও বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য ইতোমধ্যে আমরা বেশকিছু উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ও ফসলের ক্ষতি কমাতে ‘মিনি কোল্ডস্টোরেজ’ বিতরণ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি প্রশাসনিক দিক থেকে কর্মকর্তাদের নৈতিক মান আরও উন্নত করা এবং দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করাও বড় চ্যালেঞ্জ। আমার বিশ্বাস, সৎ নেতৃত্ব, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতে পারলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের কৃষিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার