ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ছায়ানট

শুদ্ধসংগীত উৎসবে বাজল ক্ষত ও প্রতিরোধের সুর

শুদ্ধসংগীত উৎসবে বাজল ক্ষত ও প্রতিরোধের সুর
×

শুদ্ধসংগীত উৎসবে শিল্পীদের পরিবেশনা। শুক্রবার বিকেলে ছায়ানট ভবনে সমকাল

 দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৮:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে গতকাল শুক্রবার বিকেলে শুরু হলো দুই দিনব্যাপী শুদ্ধসংগীত উৎসব ১৪৩২। এবারের উৎসব উৎসর্গ করা হয় কিংবদন্তি ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে। জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে প্রথম অধিবেশন চলে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।

স্বাগত বক্তব্যে ছায়ানটের সভাপতি সারওয়ার আলী বলেন, এই ভবনে হামলার পর এটিই আমাদের প্রথম আয়োজন। মধ্যরাতের পরে একদল মানুষ জোর করে ঢুকে ছয়তলা ভবনের প্রতিটি কক্ষে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়। তাদের প্রধান আক্রোশ ছিল বাদ্যযন্ত্রগুলোর ওপর।

তিনি আরও জানান, হামলাকারীরা ‘নালন্দা’ শিশু বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক ও সহায়ক বই নষ্ট করে। এতে আর্থিক ক্ষতির চেয়েও বড় ক্ষতি হলো শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। তবে এই ক্ষত আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। তিন সপ্তাহের মধ্যে ছায়ানট স্বাভাবিক ছন্দে তার কার্যক্রমে ফিরেছে। সংগীত শিক্ষা ও বাক্-মঞ্জরির ক্লাস ফের শুরু হয়েছে।
নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার দাবিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা নিরাপদে গান গাইতে চাই, নিরাপদে সংগীত চর্চা ও পরিবেশন করতে চাই। এটি আমাদের মৌলিক দাবি। বাংলা সংস্কৃতি চর্চা এই রাষ্ট্রে অবাধ ও নির্বিঘ্ন হোক।

বক্তব্য পর্ব শেষে শুরু হয় পরিবেশনা। প্রথমে মঞ্চে ওঠে অসিত কুমার দের পরিচালনায় ছায়ানটের সম্মেলক গানের দল। মালকোষের মূর্ছনায় পাঁচটি রাগের সুরসমাহার, তবলার বোলের দৃঢ় বিন্যাসে বাদল চৌধুরীর তালসংগত, আর হারমোনিয়ামে টিংকু শীলের মিহি মূর্ছনা। সব মিলিয়ে সূচনা তৈরি করে এক গভীর ধ্যানী আবহ। এরপর কণ্ঠসংগীতে দীপ্র নিশান্ত পূরবী রাগে সুরের বিস্তার ঘটান, তার গলায় ছিল সন্ধ্যার বিষণ্নতা ও আলোর সহাবস্থান; তবলায় প্রশান্ত ভৌমিকের সংযত অথচ তীক্ষ্ণ তাল, সারেঙ্গীতে শৌণক দেবনাথ ঋকের দরদি আলাপ, আর হারমোনিয়ামে অভিজিৎ কুণ্ডুর পরিমিত সংগত সেই পরিবেশনাকে দেয় শাস্ত্রীয় পূর্ণতা।

মঞ্চের পরের পর্বে তবলার যুগলবাদনে অনন্য ইগ্নেসিউস রোজারিও ও অপ্রতিম রায় তাল-লয়ের দ্বৈত সংলাপ তৈরি করেন; কখনও প্রতিযোগী, কখনও পরিপূরক। তবলার সেই দুই সত্তা যেন কথা বলে ওঠে আগুনে পোড়া ভবনের বুক থেকে। যন্ত্রসংগীতে এরপর আসে সেতারের সুর। এবাদুল হক সৈকত ইমনকল্যাণ রাগে সেতারের তারে আলাপন তোলেন, তাঁর প্রতিটি মিড় ও গমকে ছিল একেকটি সুরের প্রতিশ্রুতি; তবলায় প্রশান্ত ভৌমিকের তাল সেই প্রতিশ্রুতিকে বেঁধে রাখে শুদ্ধ কাঠামোয়, আর তানপুরায় রিদওয়ান রহমানের স্থির সা-পা-সা ধ্বনি মিলনায়তনজুড়ে তৈরি করে সুরের অবিচ্ছিন্ন ভিত্তিভূমি।
রাজশাহীর শিল্পী শায়লা তাসমীন শ্যামকল্যাণ রাগে কণ্ঠের গভীরতায় মঞ্চে আনেন নদীপারের শান্ত অথচ দৃঢ় সুরভাষা; হারমোনিয়ামে টিংকু কুমার শীলের সংগত, তবলায় ইফতেখার আলম ডলারের তাল-লয়ের ভারসাম্য, আর তানপুরায় গৌরব বাগচী ও লাইসা বিনতে কামালের যুগল সংগত সেই পরিবেশনাকে দেয় এক গীতল ঐক্য। এরপর বিটু শীল বাচসপতি রাগে কণ্ঠের বিস্তার ঘটান; তার গলায় ছিল আবেগ ও প্রতিরোধের মিশ্রণ। এটা শ্রোতাদের স্থবিরতা ভেঙে দেয়। তবলায় কুমার প্রতিবিম্বের তাল-সমর্থন আর হারমোনিয়ামে টিংকু কুমার শীলের সংগত সেই সুরের শরীর নির্মাণ করে।
যন্ত্রসংগীতে বাঁশির সুরে মৃত্যুঞ্জয় দাস রাগেশ্রী রাগে রাতের দিকে সুরের বাঁক ঘুরিয়ে দেন; বাঁশির প্রতিটি মূর্ছনায় ছিল অদৃশ্য ক্ষতের নিরাময়ী ফুঁ, আর তবলায় প্রশান্ত ভৌমিকের তাল তাকে দেয় পরিণতির দৃঢ়তা। অসিত কুমার দের পরিবেশনায় শেষ হয় আয়োজন।

আরও পড়ুন

×