ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ বাদ, এবার বর্ষবরণে হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’

‘মঙ্গল’ ও ‘আনন্দ’ বাদ, এবার বর্ষবরণে হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’
×

ছবি: ফাইল

 সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:৩৭

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ঐতিহ্যবাহী শোভাযাত্রা এবার থেকে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামে অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বাদ পড়ল মঙ্গল ও আনন্দ নামটি। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই নতুন নামকরণ নিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নাম বদলালেও শোভাযাত্রার মূল ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যে কোনো পরিবর্তন আসছে না।

গতকাল সচিবালয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত জাতীয়ভাবে বাংলা নববর্ষ এবং অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের এক প্রস্তুতি সভা শেষে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বিভ্রান্তি ও বিতর্ক নিরসন করতেই ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নামটি নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, এই উৎসব যেন সব বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য। সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নাম হিসেবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ সমাজে ঐক্য ও সম্প্রীতি আরও জোরদার করবে।

তিনি আরও আশ্বস্ত করেন, শোভাযাত্রার নকশা, মোটিফ, লোকজ উপাদান এবং সৃজনশীল প্রকাশ– সবই আগের মতো অক্ষুণ্ন থাকবে। পাশাপাশি রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য আয়োজনও যথারীতি অনুষ্ঠিত হবে।

গত ৩০ মার্চ পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রা সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে শুরু হয় প্রস্তুতি। ঢাকের বাদ্য আর রংতুলির ছোঁয়ায় জমে ওঠে আয়োজনের পরিবেশ।

মূলত চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ১৯৮৯ সালে প্রথম বের হয় এই শোভাযাত্রা, যার নাম ছিল ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’। পরে নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে পরিচিতি পায় এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে ওঠে। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো এই শোভাযাত্রাকে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামেই বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে এর স্বীকৃতি আরও দৃঢ় করে।

গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নাম পরিবর্তন করে ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’ করা হয়, যা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি হয়। গতকাল নতুন করে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ নাম ঘোষণার ফলে সেই বিতর্ক আবারও সামনে আসে।

এদিকে নাম পরিবর্তন প্রসঙ্গে ইউনেস্কো ঢাকার হেড অব অফিস অ্যান্ড রিপ্রেজেন্টেটিভ সুজান ভাইজ নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে জানান, ইউনেস্কো নামকরণ-সংক্রান্ত জাতীয় সিদ্ধান্তে কোনো অবস্থান নেয় না। কারণ, এ ধরনের বিষয় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নিজস্ব এখতিয়ার ও সিদ্ধান্তের আওতাভুক্ত। বর্তমানে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অব দ্য ইনট্যানজ্যাবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটিতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা অন পহেলা বৈশাখ’ নামেই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যদি বাংলাদেশ সরকার এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়, তবে ইউনেস্কোর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হবে। ইনট্যানজ্যাবল কালচারাল হেরিটেজ কনভেনশনের অপারেশনাল ডিরেকটিভস অনুযায়ী, এ ধরনের অনুরোধ সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র করতে পারে এবং তা কমিটির অধিবেশনের অন্তত তিন মাস আগে জমা দিতে হয় বিবেচনার জন্য।

এদিকে শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তনের ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ শুধু একটি নাম নয়; এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক। বারবার নাম পরিবর্তন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর অযাচিত হস্তক্ষেপ।

বাংলা নববর্ষ সামনে রেখে এবারের শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘নববর্ষের ঐক্য, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’। এই ভাবনাকে কেন্দ্র করে চারুকলায় তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন প্রতীকী মোটিফ, যেখানে লোকজ ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং সামাজিক বার্তার সমন্বয় ঘটেছে।

আরও পড়ুন

×