ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সাড়ে ৬ হাজার ফুট উচ্চতায় যে গ্রাম

সাড়ে ৬ হাজার ফুট উচ্চতায় যে গ্রাম
×

গ্রামে যেতে উঠতে হবে সোজা পাহাড় বেয়ে

গোলাম কিবরিয়া 

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৫ | ০০:৩৫ | আপডেট: ৩০ জুলাই ২০২৫ | ১২:৫৪

পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি। রাস্তার এক ধারে ঘন সবুজ পাহাড়, অন্য ধারে হাজার হাজার ফুট নিচে ফেলে আসা মোহময় ফেওয়া হ্রদ। গন্তব্য সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত ছবির মতো সুন্দর এক গ্রাম ঘানদ্রুক।

সাড়ে ৬ হাজার ফুট উঁচুতে থাকা গ্রাম ঘানদ্রুকে যাত্রা আমাদের। নাগরকোট থেকে কাঠমান্ডু এলাম। ঘানদ্রুকের পারমিট নিলাম নেপাল ট্যুরিজম বোর্ড থেকে। তারপর আগে থেকেই বুকিং দিয়ে রাখা রাতের বাসে পোখারা যাত্রা। ভোরে পৌঁছে রিজার্ভ কার নিয়ে ঘানদ্রুকের উদ্দেশে ছোটা। সাধারণত খুব কম বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট সেখানে যান। তবে যারা অন্নপূর্ণা ট্র্যাক করেন, তারা এ গ্রাম ঘুরে যান, নইলে থেকে যান। ঘানদ্রুক গ্রামে যেতে উঠতে হবে সোজা পাহাড় বেয়ে ওপরে। পোখারা থেকে ঘানদ্রুক যাওয়ার জন্য গাড়ি রিজার্ভ করেছি আমরা। চাইলে শেয়ার জিপ বা বাসেও যাওয়া যায়। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি। অপার বিস্ময়ে প্রকৃতির রূপ উপভোগ করছি। রাস্তার এক ধারে ঘন সবুজ পাহাড়, অন্য ধারে হাজার হাজার ফুট নিচে ফেলে আসা মোহময় ফেওয়া হ্রদ। আমাদের ডান পাশ ঘেঁষে বয়ে চলেছে খরস্রোতা মাদি নদী।

আরেকটু ওপরে উঠে বাঁয়ে পড়ল সুন্দর এক জলপ্রপাত। ওটা পেরিয়েই অন্নপূর্ণা রেঞ্জের প্রবেশপথ। তখনও বিস্ময়ের মূল আকর্ষণ বাকি। গাড়ি থেকে নামার পর হাঁটা শুরু। লাগেজ বেশি থাকায় পোর্টার নিতে হলো। ভারী লাগেজ নিয়ে হাঁটা খুবই কষ্টদায়ক উঁচু-নিচু পাহাড়ি পথের যাত্রা। ক্লান্ত শরীর, তবে চোখ যেন ক্লান্ত হয় না চারদিকের রূপ-রং দেখে। ঘণ্টাখানেক হেঁটে ক্লান্ত শরীরে আমাদের হোটেলে পৌঁছালাম। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরের মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল, যখন হোটেলে এসে চারদিকের পরিবেশ দেখলাম। দূর থেকে ঝাপসা হয়ে আসা সুউচ্চ পর্বত নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে হঠাৎ। তখনও জানি না পরদিন আমাদের জন্য কী চমক অপেক্ষা করছে। এরপর গ্রাম ঘুরে দেখা। পাহাড়ি এই গ্রামের অলিগলিতে ফুলগাছের সমাহার। ঘুরং সম্প্রদায়ের বাড়ি, জাদুঘর দেখা হলো। রাতে ভালোই ঘুম হলো। আগে উঠতে হবে। কারণ খুব ভোরে দেখতে হবে অন্নপূর্ণা। সব সময় এর দেখা পাওয়া যায় না। মেঘের কোলে মুখ লুকায়। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন। এ যেন কল্পনাকেও হার মানায়। অপার বিস্ময়ে উপভোগ করলাম অন্নপূর্ণা সাউথ, মাছুপুছরে, গংগাপূর্ণা এবং হিমছুলি পর্বত। চারটি পর্বত একসঙ্গে এভাবে পরিষ্কার দেখব আশা করিনি। নিজ চোখের বিস্ময়ে ছবিতে ফুটিয়ে তোলা দুষ্কর। ঘণ্টা দুয়েক এ দৃশ্য উপভোগ করলাম।

ভোরে সূর্যোদয়ের সময় এই বরফ ঢাকা পর্বতশৃঙ্গগুলোর রং বদলানো এক অভাবনীয় দৃশ্য। ধীরে ধীরে পর্বতগুলো মেঘের কোলে মুখ লোকাচ্ছে। মনে মনে বললাম, সৃষ্টিকর্তার কী অপরূপ সৃষ্টি, আলহামদুলিল্লাহ।

ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনধারা 
ঘানদ্রুক গ্রাম অন্নপূর্ণা পর্বতমালার পশ্চিম ঢালে অবস্থিত, লুমলে ও ডাঙ্গসিং গ্রামের মাঝখানে। ঘানদ্রুক থেকে ঘোড়েপানি ও উল্লেরি পর্যন্ত পর্বতের চূড়াগুলো বনভূমিতে আবৃত। ঘানদ্রুক তুলনামূলক সহজেই পৌঁছানো যায়। পোখারার নয়াপুল থেকে প্রতি ২০ মিনিটে একটি বাস ঘানদ্রুকের উদ্দেশে ছাড়ে। নয়াপুল থেকে দূরত্ব আনুমানিক ৭২ কিলোমিটার। চাইলে আপনি পোখারা থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টা ট্র্যাক করেও ঘানদ্রুকে পৌঁছাতে পারেন। ঘানদ্রুক সাতটি ছোট গ্রাম নিয়ে গঠিত। এখানে প্রায় এক হাজার পরিবার বসবাস করে। এই গ্রামে মূলত গুরুঙ্গ জনগোষ্ঠী বসবাস করে, যারা তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আতিথেয়তার জন্য পরিচিত। তবে এখানে মাগার, কামি, সার্কি, ব্রাহ্মণ, ছেত্রি এবং নিউয়ার জাতিসত্তার লোকজনও বাস করে। ঘানদ্রুকে এমন অনেক পরিবার আছে; যাদের অন্তত একজন সদস্য ব্রিটিশ সেনাবাহিনী, ভারতীয় সেনাবাহিনী, নেপালি সেনা বা পুলিশের সঙ্গে যুক্ত। তবু কিছু পরিবার এখনও কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। নেপালের অধিকাংশ পাহাড়ি অঞ্চলের মতো ঘানদ্রুকের কৃষিজমিও সিঁড়ির মতো ছাদবিশিষ্ট। কৃষকরা ধান, ভুট্টা, শাকসবজি, আলু এবং সবুজ চা চাষ করেন। এ ছাড়া ভেড়া পালন বাড়ছে। তবে প্রধান আয়ের উৎস হলো বাহিনীতে কর্মরত সদস্যদের পাঠানো অর্থ। আতিথেয়তা খাতও বর্তমানে ঘানদ্রুককে কেন্দ্র করে দ্রুত বাড়ছে। পর্যটকদের আনাগোনা, ট্র্যাকিং ও হোমস্টে সংস্কৃতি এই শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করছে। ঘানদ্রুক গুরুঙ্গ সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এখানে আপনি স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, নাচ-গান এবং ঘরবাড়ির স্থাপত্যশৈলীর একঝলক দেখতে পাবেন। গ্রামে একটি গুরুঙ্গ জাদুঘরও আছে, যেখানে এই সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও সংস্কৃতির অনেক কিছু সংরক্ষিত আছে।

স্থানীয় খাবার
ঘানদ্রুকে ঘিরে থাকা হোমস্টে ও গেস্টহাউসগুলোয় স্থানীয় খাবার যেমন ডাল-ভাত-তরকারি, গুরুঙ্গ পা ও নেপালি আলু চানা পরিবেশন করা হয়। ঠান্ডা আবহাওয়ায় গরম চা ও স্থানীয় খাবার এক অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দেয়।

যাওয়ার আগে একজনের কথা না বললেই নয়। প্রথম দেখাতে রকস্টার মনে হলো। শরীরে ট্যাটু করা বিভিন্ন রকমের। কথা কম বলে। ঘানদ্রুকে যাওয়ার পথে প্রেমের সঙ্গে পরিচয়। আমাদের পোর্টার। ভারী সব লাগেজ নিয়ে এতটা পথ পাড়ি দেওয়া অনেক কষ্টকর হতো প্রেম না থাকলে। এক ঘণ্টার পথ ভারী লাগেজ নিয়ে গ্রামে দিয়ে আসে। যেদিন নেমে আসি মায়াবী এ গ্রাম থেকে সেদিন প্রেমও আমাদের সঙ্গে লাগেজ নিয়ে নেমে আসে। বিদায় দেওয়ার মুহূর্তে অদ্ভুত এক মায়া কাজ করে। প্রেম আমাকে জড়িয়ে ধরে। দ্রুত তাকে বিদায় করি। অদ্ভুত সব মায়াজালে জড়িয়ে পড়া আমার অভ্যেস। মায়াবী এ গ্রাম ঝাপসা হয়ে আসে।

টিপস: মার্চ থেকে মে এবং সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর– এই সময় ঘানদ্রুক ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। হালকা ট্র্যাকিং গিয়ার এবং গরম কাপড় সঙ্গে রাখা জরুরি।

ছবি: লেখকের সৌজন্যে

আরও পড়ুন

×