ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

শীতেও চুল ঝলমলে

শীতেও চুল ঝলমলে
×

প্রাকৃতিক সজীবতা ধরে রাখতে চুলের বাড়তি পরিচর্যা প্রয়োজন মডেল: আসিন জাহান; মেকওভার: শোভন’স মেকওভার; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

রোজী আরেফিন

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

শীতকালে ত্বকের মতো চুলেরও প্রয়োজন আলাদা যত্নের। ঠান্ডা আবহাওয়া, কম আর্দ্রতা আর গরমপানিতে গোসল–সব মিলিয়ে চুল হয়ে পড়ে রুক্ষ, ভঙ্গুর আর প্রাণহীন। অনেকের দেখা দেয় খুশকির সমস্যা। কারও আবার চুল অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা শুষ্ক হয়ে যায়। এ সময় নিয়মিত চুলের যত্ন না নিলে চুল পড়া, চুলে ফাটল ধরা বা চুলের আগা ফেটে যাওয়া যেন নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে। লিখেছেন রোজী আরেফিন

শীতের মৌসুমে চুল যাতে উজ্জ্বল এবং মোলায়েম থাকে সেজন্য বাড়তি পরিচর্যা প্রয়োজন। চলুন জেনে নেওয়া যাক এ সময়ে চুলে যত্নে কী কী করবেন–

শুষ্ক চুলের যত্ন 
শীতে বাতাসে আর্দ্রতা কম থাকায় চুলের প্রাকৃতিক তেল দ্রুত হারিয়ে যায়। ফলে চুল শুষ্ক ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। 

সমাধান 
সপ্তাহে অন্তত দুবার গরম নারকেল তেল বা অলিভ অয়েল দিয়ে ম্যাসাজ করুন। এতে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখে। গরমপানিতে নয়, হালকা কুসুম গরমপানিতে চুল ধোবেন। 
সালফেটমুক্ত মাইল্ড শ্যাম্পু ব্যবহার করুন, যাতে চুলের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট না হয়। 

তৈলাক্ত চুলের যত্ন 
অনেকের ধারণা, শীতে তৈলাক্ত চুলে যত্নের দরকার কম। এটি ভুল চিন্তা। ঘাম কম হলেও স্ক্যাল্পে জমে থাকা তেল আর ময়লার কারণে খুশকি ও চুল পড়া বেড়ে যেতে পারে। 
সমাধান: সপ্তাহে দুই-তিনবার মাইল্ড শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। 
লেবুর রস ও অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে স্ক্যাল্পে লাগান, ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এটি অতিরিক্ত তেল কমায় ও মাথা ঠান্ডা রাখে। 
ভারী তেল যেমন নারকেল বা ক্যাস্টল অয়েল না ব্যবহার করে হালকা তেল যেমন অরগান বা জোজোবা অয়েল ব্যবহার করতে পারেন। 

মাথার ত্বকের যত্ন 
শীতকালে মাথার ত্বকও শুষ্ক হয়ে পড়ে। ফলে খুশকি ও চুলকানি দেখা দেয়। 
সমাধান: সপ্তাহে অন্তত একদিন স্ক্যাল্প ক্লিনিং করুন। বেসন, দই ও অ্যালোভেরা জেল মিশিয়ে স্ক্রাব হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। 
রাতে ঘুমানোর আগে কয়েক ফোঁটা তেল আঙুলের ডগা দিয়ে মাথায় ম্যাসাজ করুন। এতে স্ক্যাল্পে রক্ত চলাচল বাড়ে, চুলের গোড়া শক্ত হয়।  
পর্যাপ্ত পানি পান করুন। শীতে পানি পান কম হওয়ার কারণে স্ক্যাল্পের শুষ্কতা বেড়ে যায়। 

শীতে রুক্ষ চুলে কোমলতা ফেরানোর উপায়
প্রথমত শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করা জরুরি। অনেকেই ভাবেন, শুধু শ্যাম্পু করলেই যথেষ্ট, কিন্তু শ্যাম্পু চুল পরিষ্কার করলেও চুলের প্রাকৃতিক তেল কিছুটা তুলে ফেলে। তাই প্রতিবার শ্যাম্পুর পর হালকা কন্ডিশনার ব্যবহার করলে চুলের আর্দ্রতা ফিরে আসে এবং রুক্ষতা কমে যায়। চুল শুকানোর সময় রোদে বা হিটার-ফ্যানের গরম বাতাস ব্যবহার না করাই ভালো। এতে চুলের কিউটিকল ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও আর্দ্রতা আরও কমে যায়। তাই চুল ধোয়ার পর তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে নিয়ে স্বাভাবিক বাতাসে শুকিয়ে নিন। 

চুলের যত্নে ঘরোয়া প্যাক
শীতকালে মাথার ত্বক শুষ্ক হয়ে খুশকি দেখা দেয়। এ জন্য এক টেবিল চামচ লেবুর রস ও দুই টেবিল চামচ টক দই মিশিয়ে মাথার ত্বকে লাগান। ৩০ মিনিট পর কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। এতে খুশকি কমবে ও চুলের গোড়া পরিষ্কার থাকবে। এ ছাড়া কয়েক ফোঁটা টি ট্রি অয়েল শ্যাম্পুর সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করলে এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টিফাঙ্গাল হিসেবে কাজ করে; যা খুশকি ও স্ক্যাল্পের চুলকানি দূর করতে সাহায্য করে। 
চুলে প্রাকৃতিকভাবে ঔজ্জ্বল্য ফেরাতেও ঘরোয়া কিছু প্যাক ব্যবহার করতে পারেন। যেমন–একটি ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে এক টেবিল চামচ মধু ও এক চা চামচ অলিভ অয়েল মিশিয়ে চুলে লাগান। ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এই প্যাক চুলে প্রোটিন ও আর্দ্রতা যোগ করে ঝলমলে করে তোলে। আরেকটি কার্যকর প্যাক হলো অ্যালোভেরা ও নারকেল দুধের মিশ্রণ। এটি চুলে প্রাকৃতিক ময়েশ্চার ফিরিয়ে আনে ও রুক্ষতা কমায়। পাকা কলা ও দইয়ের প্যাকও চুল নরম, মসৃণ ও চকচকে রাখতে অসাধারণ কাজ করে। 
শীতে চুলের বিভিন্ন সমস্যা ও সমাধান প্রসঙ্গে শোভন’স মেকওভারের স্বত্বাধিকারী ও কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা জানান, শীতে ত্বক শুষ্ক থাকায় খুশকি বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত হট অয়েল ম্যাসাজ করে স্ক্যাল্প হাইড্রেটেড রাখুন। ভালো মানের অ্যান্টি-ড্যানড্রাফ শ্যাম্পু, কন্ডিশনার ও সিরাম ব্যবহার করুন। তারপরও খুশকি না কমলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। চুল নরম ও উজ্জ্বল রাখতে কোলাজেন ট্রিটমেন্ট নিতে পারেন। পাশাপাশি ঘরোয়া সমাধান হিসেবে টক দই, মধু, কলা ও ডিমের প্যাক ব্যবহার করুন। 
চুল পড়া রোধে কী করবেন? 
শীতকালে ঠান্ডা আবহাওয়া ও কম রক্ত চলাচলের কারণে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে চুল ঝরে যায়। তাই সপ্তাহে কয়েকবার ভিটামিন-ই বা অলিভ অয়েল দিয়ে মাথায় আলতো ম্যাসাজ করুন। এতে রক্ত সঞ্চালন বাড়ে ও গোড়া মজবুত হয়। 
পেঁয়াজের রসও চুল পড়া কমাতে দারুণ কার্যকর। পেঁয়াজের রস মাথার ত্বকে লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন–এটি নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। 
রাতে সিল্ক বা সাটিনের বালিশের কভার ব্যবহার করুন। এতে চুলের ঘর্ষণ কমে ও ভাঙা প্রতিরোধ হয়। প্রতিদিন হেয়ার ড্রায়ার বা স্ট্রেইটনারের মতো গরম যন্ত্র ব্যবহার এড়িয়ে চলুন আর বাইরে গেলে টুপি বা স্কার্ফ দিয়ে চুল ঢেকে রাখুন।  

চুলের যত্নে খাদ্যাভ্যাস
দিনাজপুর রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের পুষ্টিবিদ লিনা আক্তার জানান, সাধারণত যেসব খাদ্যাভ্যাসের ঘাটতির কারণে চুলে সমস্যা হয়ে থাকে তা হলো আয়রন, পর্যাপ্ত প্রোটিন, বায়োটিনের ঘাটতি। এর পাশাপাশি শরীরে জিঙ্ক, ভিটামিন-সি, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিডের ঘাটতি হলে চুল পড়ার সমস্যা হতে পারে। খাদ্য গ্রহণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান না করা, ঘুম না হওয়া, দুশ্চিন্তাও এ সমস্যা বাড়ায়। খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করার পরও চুলের উন্নতি না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিশেষ করে আপনার শরীরে হরমোনের সমস্যা আছে কি না তা জানুন।
পুষ্টিবিদ লিনা আক্তার আরও জানান, চুলের পুষ্টি জোগাতে খাদ্যতালিকায় আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন–ডিম, ডাল, মাংস, গরুর কলিজা, ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড ও ভিটামিন-ই সমৃদ্ধ খাবার যেমন–বাদাম, বীজ জাতীয় খাবার রাখুন। এ ছাড়া তৈলাক্ত মাছ যেমন পাঙাশ, ইলিশ, রুই ইত্যাদি খান। খাদ্যতালিকায় সপ্তাহে দুদিন তৈলাক্ত মাছ রাখুন। পাশাপাশি ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন–আমলকী, লেবু, পেয়ারা, আমড়া এবং বায়োটিনসমৃদ্ধ খাবার বাদাম বীজ, পালংশাক, ডিমের কুসুম, দুধ, দই, পনির ইত্যাদি খেতে পারেন। 
নিয়মিত চুল পরিষ্কার রাখা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা ও চুলের ঘরোয়া যত্ন নেওয়া–এসব জিনিস ঠিকঠাক করতে পারলেই শীতেও আপনার চুল থাকবে খুশকি মুক্ত, মসৃণ, কোমল ও প্রাকৃতিকভাবে ঝলমলে। 

 

আরও পড়ুন

×