এই সুরে কাছে দূরে
রিক্তা রিচি
প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৭:০৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
মুখে হাজারবার ভালোবাসি বলার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভালোবাসার মানুষকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করা, যত্নে রাখা এবং সম্মান করা। জীবনে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, জয়-পরাজয় যাই আসুক না কেন, সম্পর্কের সুতা যেন সটান থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কেবল সঙ্গী আপনার প্রতি যত্নশীল হবে বিষয়টি এমন নয়। আপনারও তাঁর খেয়াল রাখতে হবে।
‘এই তো হেথায় কুঞ্জ ছায়ায়/স্বপ্ন মধুর মোহে/এই জীবনে যে কটি দিন পাবো/তোমায় আমায় হেসে খেলে/কাটিয়ে যাবো দোঁহে/স্বপ্ন মধুর মোহে।’–গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার
সম্পর্ক চারা গাছের মতো। যত্নে টেকে। মুখে হাজারবার ভালোবাসি বলার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভালোবাসার মানুষকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করা, যত্নে রাখা এবং সম্মান করা। সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, জয়-পরাজয় যাই আসুক না কেন, সম্পর্কের সুতা যেন সটান থাকে সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কেবল সঙ্গী আপনার প্রতি যত্নশীল হবে বিষয়টি এমন নয়। আপনারও তাঁর খেয়াল রাখতে হবে। আপনার মধ্যেও যে ভালোবাসা বেঁচে আছে, সব কাজের ভিড়ে আপনি যে তাঁকে খোঁজেন সেটি বোঝাতে হবে। হোক না বিয়ের ২০ বছর বা ৩০ বছর পেরিয়ে গেছে, কিংবা প্রেমের সম্পর্কের ৫-৭ বছর হয়ে গেছে। তাতে কী? যত্নের অভ্যাসে বদল না আনাই ভালো। সম্পর্কের বয়স বেড়ে গেলে অনেকেই বলেন–‘আরে ও তো আমারই’, ‘ও কোথায় আর যাবে’ কিংবা ‘যে থাকার সে থাকবেই’ ইত্যাদি। তাই তারা মনে করেন প্রিয় মানুষটিকে আগের মতো যত্ন করার দরকার নেই। বিপত্তি বাধে এখানেই। অবহেলা পেয়ে ধীরে ধীরে সঙ্গীর মনে কুয়াশা জমতে থাকে। ওপাশ থেকেও আপনার প্রতি এক ধরনের অবহেলার তীর আসতে থাকে। লেখক টমাস ফুলার বলেছিলেন, ‘ভালোবাসতে শেখো, ভালোবাসা দিতে শেখো, তাহলে তোমার জীবনে ভালোবাসার অভাব হবে না।’ সুতরাং ভালোবাসা পেতে হলে ভালোবাসতেও জানতে হবে।
শামীম হাসান ও রুমানা ইসলামের বিয়ের বয়স ১১। দুজনেই সুর ও সংগীতের মানুষ। ভালোবেসে বিয়ে করেছেন। আবার পরিবারের অমতে বিয়ে করার জন্য ১১ বার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। পেশাগত জীবন, গান ও শখের কাজগুলো ঠিক রাখার পাশাপাশি এখন সংসার করছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। সম্পর্ক তাজা রাখতে কোন কোন বিষয় মাথায় রাখতে হবে কথা হচ্ছিল সেসব নিয়ে। রুমানা ইসলাম জানান, জীবন কখনও এক রেখায় চলে না। তেমনি সম্পর্কেও অনেক আঘাত আসে, আসে ঝড়। সেসব প্রতিকূল সময়ে সঙ্গীকে ছেড়ে যাওয়া কিংবা কষ্ট দেওয়ার চিন্তা মাথায় আনা যাবে না। দুজনের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হলে যত দ্রুত সম্ভব তা আলোচনা করে ঠিক করতে হবে। তিনি মনে করেন, ভালোবাসার সম্পর্কে বিশ্বাস ও সমঝোতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দম্পতি শামীম হাসান ও রুমানা ইসলাম দুজনেই মনে করেন, ভালোবাসার মানুষ যখন প্রেমিক থাকে তখন দেখা হয় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। প্রত্যাশা তুলনামূলক কম থাকে। কিন্তু মানুষটি যখন সংসারসঙ্গী হয় তখন পার্টনারশিপ ২৪ ঘণ্টার। সেখানে বোঝাপড়া, ছোট ছোট সেক্রিফাইস খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একজন প্রেমিক বা প্রেমিকার প্রত্যাশা যতটা থাকে তার চেয়ে বেশি স্বামীর প্রতি স্ত্রীর কিংবা স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রত্যাশা ও দায়িত্ববোধ বেশি থাকে। ধৈর্য, ছাড় দেওয়ার মানসিকতা, পরস্পরকে সম্মান করার মানসিকতা, অবাস্তব প্রত্যাশা না করা সম্পর্ককে সুন্দর রাখে বলে জানান এ দম্পতি।
হ্যান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশনের মনোবিদ এবং টিম ম্যানেজার নাঈমা ইসলাম অন্তরা জানান, সম্পর্ক কখনোই নিজে নিজে টিকে থাকে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন, সম্মান, ভালোবাসা এবং বোঝাপড়া একটি সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী ও মধুর করে তোলে। সুন্দর সম্পর্ক এবং ভালোবাসার মানুষকে ভালো রাখার জন্য কী কী করা যেতে পারে সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন এ মনোবিদ। পরামর্শগুলো হলো–
খোলামেলা আলোচনা এবং সম্মানজনক যোগাযোগ বজায় রাখা
সুস্থ সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো কার্যকর যোগাযোগ। নিজের অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং সমস্যাগুলো শান্তভাবে প্রকাশ করলে ভুল বোঝাবুঝি কমে এবং বিশ্বাস বাড়ে।
পারস্পরিক সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা
দোষগুণ মিলেই মানুষ। সঙ্গীকে তার ব্যক্তিত্ব, মতামত, সীমাবদ্ধতাসহ গ্রহণ করতে হবে। এটি সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী করে। একবার তাঁর সীমাবদ্ধতাগুলো গ্রহণ করলেন, কিন্তু পরক্ষণে বারবার কথা শোনাবেন কিংবা বিভিন্নভাবে চাপ প্রয়োগ করবেন তা হবে না। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের চাপ দিলে সম্পর্ক দুর্বল হয়ে যায়।
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও প্রশংসা
সঙ্গীর ছোট ছোট কাজ, ভালো কাজের প্রশংসা করুন। সঙ্গীর রান্না, সাজ কিংবা যে কোনো কিছুর প্রশংসা করুন। একইসঙ্গে সম্পর্ক ও সংসারের প্রতি তাঁর একাগ্রতা ও দায়িত্বশীলতার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন।
একসঙ্গে মানসম্মত সময় কাটানো
কর্মক্ষেত্র, সংসার, নিজস্ব কাজ নিয়ে যতই ব্যস্ত থাকেন না কেন, ব্যস্ততার মধ্যেও একসঙ্গে সময় কাটান।
ক্ষমা করা
রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, ‘ক্ষমাই যদি করতে না পারো, তবে তাকে ভালোবাসো কেন?’ তাই সঙ্গীকে যেমন ভালোবাসতে হবে, তেমনি তাঁর ভুল হলে ক্ষমাও করতে হবে।
এরপরও সম্পর্কে কোনো সমস্যা হলে এবং তা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে প্রফেশনাল মনোবিজ্ঞানী বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন নাঈমা ইসলাম।
- বিষয় :
- ফ্যাশন
