ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ফুলের নকশায়

ফুলের নকশায়
×

পোশাকে ঋতুভিত্তিক ফুলের নকশা আজকাল বেশ চলছে

রিক্তা রিচি

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২২

| প্রিন্ট সংস্করণ

ফুলের আবেদন চিরন্তন। ঋতু বদলায়, সময় বদলায়, তবুও মানুষের মননে ফুলের জায়গা অপরিবর্তিত। সেই কারণে ক্রেতার চাহিদা মাথায় রেখে উদ্যোক্তা ও ডিজাইনাররা পোশাকে ফুলের মোটিফ ও নকশা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। কেউ ফুলেল নকশার সঙ্গে পলকা ডটের সংমিশ্রণে ফিরিয়ে আনছেন নব্বই দশকের আবহ, আবার কেউ ব্যবহার করছেন ডিজিটাল প্রিন্ট, হাতের কাজ ও এমব্রয়ডারির মতো বহুমাত্রিক মাধ্যম। লিখেছেন রিক্তা রিচি

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দসহ বিভিন্ন কবির কবিতায়, ভাবনায় ও চিত্রকল্পে বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে বাহারি ফুলের কথা। শিউলি, অপরাজিতা, কৃষ্ণচূড়া, রজনীগন্ধা তো বটেই; চালতা এমনকি ভাঁটফুলও বাদ যায়নি। কেবল কবি-সাহিত্যিক নন, ফুলের সৌন্দর্য যে কোনো মানুষের মন শোভিত করে। যে কোনো ঋতু যে কোনো উৎসবে মানুষ ফুল বেছে নেয়। নিজেকে সাজায় ফুলের গহনা দিয়ে। আবার ঘরেও রাখে তাজা ফুল। প্রকৃতির অনিন্দ্য সুন্দর ফুল স্থান পায় পোশাকের নকশায়-মোটিফেও। বসন্তকাল তো বটেই, গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরতেও ডিজাইনাররা ঋতুভিত্তিক পোশাকে ফুলের নকশা করেন। পদ্ম, শাপলা, শিউলি, সূর্যমুখী, অপরাজিতা, নয়নতারা, গোলাপ, জবা, জারুলসহ নয়নাভিরাম বিভিন্ন ফুল লক্ষ্য করা যায় শাড়ি, ওড়না, কামিজ ও স্কার্টে। পোশাকে ফুলের ব্যবহার বেশ পুরোনো হলেও এখন এর চাহিদা বেড়েছে। ছাপা নকশার পাশাপাশি অ্যাম্বুশ, ডিজিটাল প্রিন্ট, হাতের কাজ ও এমব্রয়ডারির মাধ্যমে ফুলেল নকশা ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে।  

অজানা ফুল থেকে শৈশবের স্মৃতি
শাড়িতে পরিচিত ও কম পরিচিত বিভিন্ন ফুলের নকশা ফুটিয়ে তোলে অনলাইন উদ্যোগ ‘সরলা’। সরলার উদ্যোক্তা মানসুরা স্পৃহা বলেন, ‘আমাদের সবারই ঘুরেফিরে প্রকৃতির কাছে ফিরতে হয়। অনেক ফুল আমরা চিনি না। অনেক ফুলের নামও জানি না। সেসব নাম না জানা ফুল-লতাপাতা পোশাকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। কারণ ফুলেল পোশাক পরে বিচরণ করলে মনে হয় ওই ফুলটিকেই আমি ধারণ করছি। এ কারণে আমরা ফুল নিয়ে বেশি কাজ করেছি। কাশফুল, জবা, দুপুরমণি, রঙ্গন, জারুল ফুল নিয়ে প্রচুর নিরীক্ষা করেছি।’
তিনি বলেন, ‘দুপুরমণি ফুলের ধারণা পেয়েছি শৈশব স্মৃতি থেকে। একদম ছোটবেলায় বিলের মধ্যে লাল টুকটুকে ফুল ফুটতে দেখেছি। এটি ঠিক দুপুরে ফুটত। ফুলটি শহরে কোনোদিন দেখিনি। নগরের বারান্দায় সেই ফুল দেখা যায় না। সেই শৈশবের ফুলকে পোশাকে দেখতে চেয়েছি, তাই শাড়িতে ফুটিয়ে তুলেছি দুপুরমণি ফুল। 

নকশায় ঐতিহ্য ও শিল্পের মেলবন্ধন
হরীতকীর কো-ফাউন্ডার অনিক কুণ্ডু বলেন, ‘বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। আমাদের দেশে অনেক ফুল পাওয়া যায়। মানুষও ফুল খুব ভালোবাসে। পোশাকে ফুলেল নকশা মানুষ বেশি পছন্দ করে বলেই আমরা এ নকশা বেশি করি। এ ছাড়া বড় বড় শিল্পী, ভাস্করের বিভিন্ন সৃষ্টিতে ফুলের নকশা, মোটিফ পাই। আলপনাতেও ফুলের মোটিফ থাকে। পৃথিবীতে যত নকশা আছে সবেতেই ফুলের উপস্থিতি রয়েছে। মুঘল আর্ট, ভারতীয় আর্ট, ইউরোপীয় আর্ট সবখানেই ফুলের ছোঁয়া রয়েছে। এ কারণেই ফুলের মোটিফ ও নকশা বেশি করা হয়।’ 
ফুলেল নকশার বিভিন্ন পোশাক নিয়ে কাজ করেন ‘সীবনী’র ডিজাইনার ও উদ্যোক্তা আবেদা খাতুন মিতুল। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অপরূপ প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করে। তাই আমি ডিজাইনে প্রকৃতির অনবদ্য উপহার ফুলকে বেছে নিই। আমরা শাড়িসহ বিভিন্ন পোশাকে কৃষ্ণচূড়া ফুল নিয়ে কাজ করছি বেশ কয়েক বছর ধরে। এ বছর ফারসি সালোয়ার-কামিজে ফুলেল মোটিভ রেখেছি। শাড়ি ও সালোয়ার কামিজে লাল গোলাপ, শিউলি, বাগানবিলাস রাখার চেষ্টা করেছি। ফুলেল নকশার সঙ্গে পলকা ডটের সংমিশ্রণে পোশাকে আনার চেষ্টা করেছি নব্বই দশকের আবহ।’ 

পথের ধারের ফুলও অনুপ্রেরণা
পথে পথে ফুটে থাকা নাম না জানা কোনো ফুলও স্থান পাচ্ছে পোশাকে। নীল অপরাজিতা, কাঠগোলাপ, বাগানবিলাস ইত্যাদি তো আছেই। ক্রেতার চাহিদা বেশি থাকায় অনেক উদ্যোক্তা ও ডিজাইনার সারাবছর অপরাজিতা ও কাঠগোলাপকে প্রাধান্য দিয়ে নকশা করেন। শাড়ি, কুর্তি, কামিজে হ্যান্ডপেইন্টের মাধ্যমে এ ফুল ফুটিয়ে তোলেন। কেউ কেউ কাঠ ব্লকের ছাঁচ তৈরি করেন ফুলের আদলে। এরপর মনের মতো করে ছাপচিত্র করেন। রাজধানীর চকবাজার, নিউমার্কেটের বিভিন্ন স্টেশনারি দোকানে সেসব ব্লক কিনতে পাওয়া যায়। উদ্যোক্তা ছাড়াও অনেক ফ্যাশনসচেতন নারী নিজের উদ্যোগে পরনের জামা কিংবা উৎসবের শাড়িতে ব্লক কিংবা হ্যান্ডপেইন্ট করিয়ে থাকেন। নিউমার্কেটের দক্ষিণ ভবনের তৃতীয় তলা থেকে মনের মতো ব্লকের কাজ করিয়ে নেওয়া যায়।  

সারা বছরের প্রিয় শিউলি
শরতের ফুল হলেও সারা বছর শিউলি ফুলের পোশাকের চাহিদা থাকে। মূলত সুতি, সিল্ক, মসলিন কাপড়ে স্কিনপ্রিন্ট কিংবা হ্যান্ডপেইন্টের মাধ্যমে এ ফুল ফুটিয়ে তোলা হয়। কেউ কেউ অ্যাম্বুশের কাজের মাধ্যমে উজ্জ্বল কিংবা হালকা রঙের শাড়িতে এ ফুলের নকশা করেন। 

কেমন ফেব্রিক
হরীতকী সিল্ক, হাফসিল্ক, সেমি-মসলিন কাপড়ে বাহারি রং এবং বিচিত্র ফুলের নকশা করে। সরলা মুন সিল্ক ও সেমি-মসলিন শাড়িতে উপস্থাপন করে ফুল। অন্যান্য অনলাইন ব্র্যান্ড লিনেন, জর্জেট, সুতি, মিক্সড কটন, কোটা কটন ফেব্রিকের শাড়ি, কামিজ ও গাউনে ফুলেল নকশা ফুটিয়ে তোলে। 

কারিগরি বৈচিত্র্য 
সব সময় পরিবেশবান্ধব ও সাসটেইনেবল উপকরণ ব্যবহারের চেষ্টা করে ‘সীবনী’। ব্র্যান্ডটির পোশাকে ব্লক, স্ক্রিনপ্রিন্ট, টাইডাই বা বাটিক, হ্যান্ড এমব্রয়ডারি, হ্যান্ডপেইন্ট বেশি করা হয়। হরীতকী সবসময় ডিজিটাল প্রিন্ট ও স্কিনপ্রিন্ট নিয়ে কাজ করে বলে জানান অনিক কুণ্ডু। তিনি বলেন, ‘আমরা শিউলি, কৃষ্ণচূড়া, টিউলিপসহ বিভিন্ন ফুল নিয়ে কাজ করি। আবার ফুলের মোটিফকে ভেঙে নকশায় রূপান্তর করি। নকশায় খাঁটি ফুলকে ব্যবহার করা না গেলে মোটিফ ভেঙে এক নতুন নকশা তৈরি করি। জবা, গোলাপ, পদ্মসহ বিভিন্ন মোটিফ নিয়ে কাজ করা হয়।’ 

মানানসই কাটছাঁটে
সুতি ও লিনেন ফেব্রিকের ফুলেল নকশার পোশাকের কাটছাঁট চেনা গণ্ডির মধ্যে হয়। মসলিন, সেমি-মসলিন, হাফসিল্কের পোশাকের কাটছাঁটে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। গোল, আয়তাকার, ব্যান্ড কলার, বোট নেক ইত্যাদি কলারের পোশাক বেশি দেখা যায়। 

দরদাম
ফুলেল নকশার শাড়ির দাম দুই থেকে তিন হাজার টাকার মধ্যে হয়ে থাকে। স্কার্ট এক হাজার ৫০০, কামিজ এক হাজার ৫০০ এবং গাউন দুই হাজার ৫০০ করে পাওয়া যায়। বিভিন্ন মার্কেট থেকে আরও কমে কেনা যাবে। 

মডেল: সামিয়া সুলতানা; মেকওভার: রাজিয়া’স মেকওভার; পোশাক: হরীতকী; ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য

আরও পড়ুন

×