ঠাকুরবাড়ির রূপচর্চার ধারা
ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা রূপচর্চায় ঘরোয়া উপাদান বেছে নিতেন
ঋতু রায়
প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ | ০৭:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
পঁচিশে বৈশাখ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী। কবির জোড়াসাঁকোর বাড়িটি নানা কারণেই বিশেষ। সেখানে শুধু সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা হতো তা নয়। আধুনিক জীবনবোধ, পোশাক-আশাক ও সৌন্দর্যবোধেরও এক অনন্য ঠিকানা এ বাড়ি। ঠাকুরবাড়ির নারীরা যেমন ছিলেন শিক্ষিত, তেমনি ছিলেন রূপসচেতন। বাড়ির মেয়ে-বউরা ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য ধরে রাখতে প্রাকৃতিক, ঘরোয়া ও ভেষজ উপাদানেই ভরসা রাখতেন। লিখেছেন ঋতু রায়
রবীন্দ্রনাথের মাতামহী দিগম্বরী দেবীর গায়ের রং ছিল দুধে আলতা। কবিগুরুর মা সারদা সুন্দরী দেবীর গায়ের রং ছিল গৌরাঙ্গী। জন্মসূত্রে দুধে আলতা গায়ের রং পেলেও সে সময় তিনি ছিলেন বেশ রূপসচেতন। কেবল নিজেই যত্ন নিতেন তা নয়, সন্তানদের ত্বকের যত্নের ব্যাপারেও ছিলেন যত্নশীল। ছোটবেলায় কবিকে তাঁর মা বাদাম বাটার সঙ্গে কমলালেবুর খোসা বাটা ও দুধের সর মিশিয়ে গোসল করাতেন। নজর রাখতেন পুত্রবধূদের সৌন্দর্যের দিকেও। সে সময় শোনা যেত অতি সাধারণ ঘরের, সাধারণ রূপের বালিকারা ঠাকুরবাড়ির বউ হয়ে অন্তঃপুরে পা রাখলেই হয়ে উঠতেন অপরূপা। এর পেছনের রহস্য জানতেও উদগ্রীব থাকতেন সবাই। সারদা সুন্দরী নিজে বসে থেকে গৃহপরিচালিকাদের দিয়ে পুত্রবধূদের গায়ে উপটান মাখাতেন।
ঠাকুরবাড়ির ছোট ছেলেমেয়েরা; যারা বাইরের পরিবেশে অর্থাৎ রোদে খেলা করত, তাদেরও হলুদ-ডাল আর লেবুর রস মাখিয়ে দেওয়া হতো। ঝামা পাথর দিয়ে কনুই, গোড়ালি ঘষে দেওয়া হতো। গোসল শেষে খাঁটি সরিষার তেল-অলিভ অয়েল মাখানোর অভ্যাস ছিল সে বাড়িতে।
ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপাদান
ঠাকুরবাড়ির নারীরা ত্বক পরিচর্যায় প্রাকৃতিক ও ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে বেসন, দুধ, হলুদ, ডাল, চন্দন, গোলাপজল, জাফরান ইত্যাদির ব্যবহার ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব উপাদান ত্বক পরিষ্কার, কোমল ও সতেজ রাখতে সহায়ক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মধুর সঙ্গে ডিমের সাদা অংশ ও বার্লি গুঁড়া মিশিয়ে মুখে মাখা হতো। কাঠবাদামের উপটানও ছিল ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বউদের রূপচর্চার উপাদান। দুধের মধ্যে ১০-১২টি কাঠবাদাম তিন-চার ঘণ্টা ভিজিয়ে বেটে নিতেন। অল্প দুধ ও জাফরান মিশিয়ে রূপটান বানিয়ে ত্বকে লাগাতেন। এতে ত্বকের ঔজ্জ্বল্য বজায় থাকত।
মসুর ডাল বেটে এর সঙ্গে কমলালেবুর খোসা বাটা মিশিয়ে ত্বকে ব্যবহার করতেন ঠাকুরবাড়ির নারীরা। নিয়মিত এর ব্যবহারে রোদে পোড়া কালচে দাগ দূর হতো। ত্বকের ময়লা কাটাতে ময়দার সঙ্গে দুধের সর মিশিয়েও শরীরে মাখা হতো।
দাগ তুলতে ডাবের পানি
সে সময় ত্বকে ব্রণ হলে তার নিরাময়ে সহজ সমাধানকে বেছে নেওয়া হতো। বসন্ত বা ব্রণের দাগ তুলতে ডাবের পানিতে নরম কাপড় বা তুলা ভিজিয়ে নিয়মিত দাগের ওপর মাখতেন ঠাকুরবাড়ির নারীরা। এটি নিয়মিত মাখলে দাগ উবে যেত বলেই জানা গেছে।
ত্বকের উজ্জ্বলতায় ঘরোয়া ক্রিম
ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতে বাড়িতেই তৈরি করতেন বিশেষ ক্রিম। আধা আউন্স শক্ত প্যারাফিন, দুই আউন্স সাদা ভ্যাসলিন, আধা চা চামচ বোরিক পাউডার, ক্যামফর অয়েল, অল্প চন্দন তেল (ঘ্রাণের জন্য) লাগত ক্রিম তৈরির জন্য। প্যারাফিন গলিয়ে তা ছেঁকে আগুনে বসাতেন। তাতে সব উপাদান মিশিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে নামিয়ে নিতেন। কথিত আছে, এ ক্রিম মুখে মেখে খানিক পরে
কাপড় দিয়ে মুছে নিতেন।
সারাবছর গোসলের পর ব্যবহারের জন্য আরেকটি ক্রিম বানাতেন। এতে ত্বক মোলায়েম থাকত। এ ক্রিমের জন্য মৌচাকের মোম সংগ্রহ করতেন তারা। পাথরের বাটিতে ঘষে মোম গুঁড়া করে তার সঙ্গে অল্প নারকেল তেল মিশিয়ে নিতেন। ক্রিমের মতো করে কৌটায় ভরে রেখে সারাবছর ত্বকে লাগাতেন।
গ্লিসারিন সাবানের ব্যবহার
সে সময় সাবানের পরিবর্তে গ্লিসারিন সাবান, বেসন ইত্যাদি ব্যবহার করা হতো। লম্বা শিশিতে গ্লিসারিন, গোলাপজল আর কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে রেখে দেওয়া পানিই ছিল গোসলের সঙ্গী।
রবির রূপচর্চার রুটিন
ঠাকুরবাড়ির পুরুষরাও ত্বকের প্রতি বেশ যত্নশীল ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মোলায়েম ত্বকের জন্য আধা বাটা সরিষার সঙ্গে ডাল বাটা মিশিয়ে ত্বকে লাগাতেন। পরে অবশ্য তরল সাবানও ব্যবহার করতেন। তিনি ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বাড়িতে ফিরে ত্বকে আটার প্রলেপ লাগাতেন। সে বাড়ির মেয়েরাও এটি করতেন। এতে ত্বকের রোদে পোড়া দাগ অনেকটা হালকা হতো। গায়ের রং অন্য ভাইবোনদের চেয়ে চাপা হওয়ায় ছোটবেলায় মা তাঁকে বাদাম বাটা, দুধের সর ইত্যাদি মেখে গোসল করাতেন। কবি বড় হয়ে আমেরিকায় গিয়ে চুলে সেখানকার বিশেষ শ্যাম্পুও ব্যবহার করতেন।
খাদ্য তালিকায় দুধ, ফল ও শাকসবজি
ত্বকের সৌন্দর্য বাড়াতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের বিকল্প নেই। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাসেও ছিল ভিন্ন ধারা। সাধারণের সঙ্গে এ আচার মিলত না। তারা রোজ দুধ, শাকসবজি ও ফল খেতেন। সঠিক খাওয়া-দাওয়ার কারণেই তাদের ত্বক মোলায়েম ও উজ্জ্বল থাকত বলে ধারণা করা হতো। সকালে ঘুম ভাঙার পর আদা কুচি, অল্প আখের গুড় দিয়ে কল-বেরোনো ছোলা ও গোটা মুগ খেতেন। v
সূত্র: ঠাকুরবাড়ির রূপকথা: শান্তা শ্রীমানী
মডেল: জাকিয়া সুলতানা
ছবি: ফয়সাল সিদ্দিক কাব্য
- বিষয় :
- রূপচর্চা
