সমুদ্রের বুকে ভিন্ন জনপদ
সমুদ্রের বুকে গড়ে ওঠা কোহ পানিই দ্বীপ মুসলিম জনপদ হিসেবে বিশেষ পরিচিত
রোজী আরেফিন
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
আমাদের থাইল্যান্ড ভ্রমণে ফুকেটের সমুদ্রসৈকত, দ্বীপপুঞ্জ ও নানা দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পাশাপাশি এমন একটি জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল, সত্যিকার অর্থে যেটা আমাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতায় আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। বলছিলাম ফাং না বে-তে অবস্থিত কোহ পানিই এর কথা, সমুদ্রের বুকে গড়ে ওঠা এটি একটি শতভাগ মুসলিম জনপদ। থাইল্যান্ডের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের তুলনায় জায়গাটি একেবারেই ভিন্ন। এখানে শুধু সমুদ্র আর পাহাড়ের সৌন্দর্য নয়, পানির ওপর মানুষের বসতি, তাদের জীবনযাপন এবং মুসলিম সংস্কৃতির পরিচয়ও কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমাদের রয়েছে।
ফুকেট থেকে এক দিনের ট্যুর প্যাকেজে আমাদের এই ভ্রমণ। যাত্রাপথে চারদিকে নীল-সবুজ সমুদ্র, দূরে মাথা তুলে থাকা বিশাল চুনাপাথরের পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে সবুজের সমারোহ দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছিল নৌযান। পথে বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্থানে থামার সুযোগ ছিল। বিভিন্ন বিচে আমরা থেমেছি, কায়াকিং করেছি, সমুদ্রের পানিতে সাঁতারও কেটেছি।
দূর থেকে কোহ পানিইকে দেখতে বেশ অদ্ভুত সুন্দর লাগে। সমুদ্রের ওপর কাঠের খুঁটির সাহায্যে তৈরি অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও চলাচলের পথ মিলিয়ে গড়ে উঠেছে পুরো জনপদ। কাছে পৌঁছে গ্রামের ভেতরে হাঁটতে শুরু করলে চোখে পড়ে কাঠের সরু পথ, একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত বাড়ি, ছোট ছোট দোকান এবং স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন ব্যস্ততা। চারপাশে পানি, অথচ সেই পানির ওপরই মানুষের বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক জীবন। দৃশ্যটি যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি ভাবনায়ও খোরাক জোগায়।
কোহ পানিইয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিচয় এর শতভাগ মুসলিম জনপদ হিসেবে গড়ে ওঠা। সমুদ্রের বুকে এমন একটি গ্রামে মসজিদ, নামাজের ব্যবস্থা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের নিজস্ব জীবনযাপন দেখতে পাওয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে অন্য মাত্রা দেয়। পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও এটি কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এখানে মানুষের ঘরবাড়ি, জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবন রয়েছে। সমুদ্রকে ঘিরে মাছ ধরা, মাছের ব্যবসা এবং পর্যটকদের জন্য বিভিন্ন সেবা স্থানীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এই গ্রামের ভেতরে ঘুরে দেখতে দেখতে বিভিন্ন ধরনের দোকান চোখে পড়ে। কোথাও হস্তশিল্পের সামগ্রী, কোথাও পোশাক ও কাপড়, আবার কোথাও পর্যটকদের জন্য নানা ধরনের স্মারকপণ্য সাজানো। এসব দোকান শুধু কেনাকাটার জায়গা নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকারও অংশ। বিভিন্ন দেশের পর্যটকরা এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, ছবি তুলছেন, দোকান দেখছেন এবং স্থানীয় পরিবেশ উপভোগ করছেন। ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা পর্যটকদের উপস্থিতিতে জায়গাটিতে আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্রের একটি প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
কোহ পানিইয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও ছিল আমাদের ট্যুর প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। বিচের কাছেই বেশ বড় একটা রেস্তোরাঁয় আমাদের বুফে লাঞ্চের আয়োজন ছিল। থাই খাবারের মধ্যে টম ইয়াম স্যুপ এবং পাপায়া সালাদ আমার বিশেষ ভালো লেগেছে। তবে এখানে ফ্রাইড রাইস ও চিকেন ফ্রাইয়ের পাশাপাশি সাধারণ ভাত ও মসুর ডালের মতো পরিচিত খাবার ছিল। স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়ার পাশাপাশি পরিচিত খাবার খাওয়ার সুযোগও পাওয়া গেছে। ভ্রমণের মধ্যে এমন খাবারের বিরতি সবার জন্যই বেশ উপভোগ্য ছিল।
এ জনপদের আরেকটি পরিচিত আকর্ষণ পানির ওপর তৈরি ভাসমান ফুটবল মাঠ। জায়গার সীমাবদ্ধতার মধ্যেও স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে তৈরি এ মাঠটি বেশ ব্যতিক্রমী। সমুদ্রের ওপর গড়ে ওঠা একটি গ্রামে ফুটবল খেলার জন্য এমন ব্যবস্থা দেখে স্থানীয় মানুষের সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের পরিচয় পাওয়া যায়। কোহ পানিইয়ের পরিচিতির পেছনে এই মাঠেরও ভূমিকা রয়েছে।
ফুকেট থেকে এ ধরনের এক দিনের প্যাকেজে কোহ পানিইয়ের পাশাপাশি ফাং না বের অন্যান্য দ্বীপ ও প্রাকৃতিক আকর্ষণ ঘুরে দেখার সুযোগ থাকে। প্যাকেজভেদে বিভিন্ন দ্বীপে নৌভ্রমণ, কায়াকিং, সাঁতার এবং সমুদ্রের গুহা বা লেগুন দেখার ব্যবস্থা থাকতে পারে। জনপ্রতি আনুমানিক এক হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৯০০ থাই বাথ খরচ হতে পারে; যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় পাঁচ হাজার ৫০০ থেকে ১৪ হাজার ৩০০ টাকা। সাধারণত প্যাকেজে নৌভ্রমণ, গাইড, যাতায়াত ও দুপুরের খাবারের মতো সুবিধা থাকে। তবে কোন কোন জায়গা ঘোরানো হবে এবং কায়াকিং বা জাতীয় উদ্যানের প্রবেশমূল্য অন্তর্ভুক্ত কিনা, তা বুকিংয়ের আগে নিশ্চিত হওয়া ভালো।
কোহ পানি আসলে শুধু সমুদ্রের ওপর গড়ে ওঠা বাড়িঘর কিংবা চারপাশের পাহাড়ের দৃশ্যর জন্যই বিখ্যাত নয়। বরং এ জায়গাটি শতভাগ স্বতন্ত্র মুসলিম জনপদের জনবসতি হিসেবেও বেশ নামডাক করেছে। এখানে প্রায় প্রতিদিনই নানা দেশের পর্যটকের ভিড়ের মধ্যেও এখানকার মানুষের তাদের নিজস্ব পরিচয়, ধর্মীয় পরিবেশ ও দৈনন্দিন জীবনযাপন বেশ চমকপ্রদভাবে ধরে রাখেন।
এ জনপদের ইতিহাসও বেশ চমকপ্রদ। প্রায় ২০০ বছর আগে ইন্দোনেশিয়া থেকে আসা জেলে তোহ বাবু ও তাঁর সঙ্গী পরিবারগুলো মাছ ধরার উপযুক্ত জায়গার সন্ধানে এসে এখানে বসতি গড়েন। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, নতুন জায়গার সন্ধান পেয়ে তোহ বাবু পাহাড়ের ওপর পতাকা ওড়ান আর সেই পতাকা থেকেই ‘পানিই’ নামটির উৎপত্তি বলে মনে করা হয়।
থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোর বাইরে গিয়ে এমন একটি জনপদ ঘুরে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে–সত্যি বলতে, অভিজ্ঞতাটা আমার জন্য দারুণ! প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মানুষের ইতিহাস, জীবনযাপন ও সংস্কৃতিকে একসঙ্গে জানার এ অভিজ্ঞতা কোহ পানিইকে আমার ভ্রমণস্মৃতিতে এক বিশেষ জায়গা করে দিয়েছে।
- বিষয় :
- সমুদ্রসৈকত