ডিটক্সে সতেজ শরীর, মন ও ত্বক
প্রকৃতির সান্নিধ্য মনে সতেজতা ধরে রাখতে সাহায্য করে মডেল: জেহান; ছবি: নাজমুল হোসাইন হিমেল
তাসলিমা তামান্না
প্রকাশ: ২৮ অক্টোবর ২০২৬ | ০৭:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বর্তমান দ্রুতগতির বিশ্বে কাজের চাপ, মানসিক উদ্বেগ যেন নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া-দাওয়া, অপর্যাপ্ত ঘুম তো আছেই। দিনের পর দিন এত অনিয়মে শরীর ও মনে প্রায়ই বিষাক্ত উপাদান জমে দেখা দেয় ক্লান্তি; যার প্রভাব পড়ে ত্বকেও। দিন দিন ত্বকের ঔজ্জ্বল্য কমে যায়, শরীর-মনে ভর করে অবসাদ, অস্থিরতা। কাজেও দেখা দেয় মনোযোগের ঘাটতি। এ জন্য মাঝেমধ্যে নিজের দৈনন্দিন অভ্যাসগুলোয় পরিবর্তন আনা জরুরি। শরীর, ত্বক ও মনকে সতেজ রাখতে অনেকে ‘ডিটক্সিফিকেশন’-এর ওপর জোর দেন। এটি শরীর-মনের ভারসাম্য ও প্রাণশক্তি ফেরাতে সহায়তা করতে পারে। সেই সঙ্গে ত্বকও ফিরে পায় হারানো ঔজ্জ্বল্য।
ডিটক্সিফিকেশন কী
সাধারণভাবে ডিটক্সিফিকেশন বা বিষমুক্তকরণ হলো শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ ও বিপাকক্রিয়ায় তৈরি বর্জ্য অপসারণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে ডিটক্স বলতে শুধু শরীরের বর্জ্য অপসারণ নয়, বরং খাদ্যাভ্যাসে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, ত্বকের সঠিক পরিচর্যা এবং মানসিক চাপ কমিয়ে সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলাকেও বোঝানো হয়।
শরীরের যত্নে চাই ভেতর থেকে সুস্থতা
শরীর সুস্থ রাখতে ভেতর থেকে সুস্থতা প্রয়োজন। দিনাজপুরের রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের পুষ্টিবিদ লিনা আকতারের মতে, শরীর পরিষ্কারের জন্য বিশেষ ডিটক্স বা বিষমুক্তকরণ পানীয়ের প্রয়োজন নেই। সুস্থ জীবনযাপনই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, শরীর থেকে ক্ষতিকর পদার্থ দূর করতে লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও অন্ত্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করে। সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এসব অঙ্গের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এ জন্য কিছু পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। যেমন–
পর্যাপ্ত পানি পান করুন: পানি শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে এবং প্রস্রাবের মাধ্যমে বর্জ্য অপসারণে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত ঘুমান: নিয়মিত ভালো ঘুম শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সুস্থতা বজায় রাখে।
অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ খাবার খান: পেয়ারা, লেবু, বিভিন্ন ফল, শাকসবজি, গ্রিন টি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে।
অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন: অ্যালকোহল লিভারের ক্ষতি করতে পারে।
গাঁজানো খাবার খান: টক দইয়ের মতো খাবার অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
সালফারসমৃদ্ধ খাবার খান: পেঁয়াজ ও রসুন শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রমে সহায়তা করে।
ত্বকের ডিটক্সে পরিচ্ছন্নতাই মূল মন্ত্র
রাস্তাঘাটের ধুলাবালি, দূষণ, ঘাম ও রোদের সংস্পর্শে ত্বকে ময়লা, অস্বস্তি তৈরি হয়। সজীবতা ধরে রাখতে শরীরের মতো ত্বকও বিষমুক্তকরণ জরুরি। কার্নিভাল মেকওভারের স্বত্বাধিকারী তাসলিমা পলাশীর মতে, ত্বককে ডিটক্স করার অর্থ অতিরিক্ত স্ক্রাবিং, শক্তিশালী রাসায়নিক কিংবা নানা ধরনের ফেসপ্যাক ব্যবহার নয়। এতে ত্বকে জ্বালা ও সংবেদনশীলতা বাড়তে পারে। তিনি জানান, ত্বক ডিটক্সিফাই করতে প্রচুর পানি পান করতে হবে। ফল, ফলের রস, ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ ফল, টমেটো, বিটা ক্যারোটিনযুক্ত গাজর, বিভিন্ন সবজি খেতে হবে। তাঁর মতে, ফলমূল ও সবজি ত্বককে ভেতর থেকে বিষমুক্ত করে। তিনি আরও জানান, দিনে দুবার ফেসওয়াশ বা ফেস ক্লিনজার দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। ত্বকের ধরন অনুযায়ী এসব পণ্য বেছে নেওয়া জরুরি। বাইরে থেকে ফিরে মুখ পরিষ্কার করলে ঘাম, ধুলাবালু ও প্রসাধনীর অবশিষ্টাংশ দূর হয়। ত্বকের ধরন অনুযায়ী হালকা, নন-কমেডোজেনিক ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করতে পারেন। শুষ্ক ত্বকের জন্য তুলনামূলক ঘন ময়েশ্চারাইজার উপকারী হতে পারে। এর পাশাপাশি দিনের বেলায় বাইরে যাওয়ার আগে এসপিএফ ৩০ যুক্ত ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে প্রয়োজনে আবারও সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এ ছাড়া ছাতা, টুপির ব্যবহার রোদ থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
প্রাকৃতিক উপাদানে ত্বকচর্চা
ত্বকের যত্নে ঘরোয়া উপাদান ব্যবহারের চল অনেক দিনের। বেসন, টকদই কিংবা মধুর মতো উপাদান দিয়ে কেউ কেউ ফেসপ্যাক তৈরি করেন। ঘরোয়া ফেসপ্যাক ব্যবহার করতে চাইলে অল্প পরিমাণে বেসন ও টকদই মিশিয়ে একটি সাধারণ প্যাক তৈরি করতে পারেন। মুখে লাগানোর পর আলতোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন; ত্বক ঘষে পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।
লেবুর রসের সঙ্গে অ্যাভাকাডোর পাল্প এবং আধা চামচ নারকেল তেল মিশিয়ে নিন। এ মিশ্রণ পুরো মুখে লাগিয়ে শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এরপর ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে ফেলুন। ত্বক ডিটক্স করার জন্য এটি বেশ কার্যকরী একটি প্যাক। কফি দিয়েও ত্বক ডিটক্স করতে পারেন। এর জন্য কোকো পাউডার, কফি, মধু ও দই একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। মিশ্রণটি মুখে লাগিয়ে ১০ মিনিট রেখে ধুয়ে নিন।
মনের ডিটক্সে চাই বিরতি
শরীর ক্লান্ত হলে যেমন বিশ্রামে প্রয়োজন, তেমনি মনের চাপ কমাতেও প্রয়োজন বিরতি। মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে আমাদের মন প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং নেতিবাচকতায় আচ্ছন্ন থাকে। মনের ওপর জমে থাকা এ অতিরিক্ত ভার আমাদের সামগ্রিক সুস্থতার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই মনকে বিষমুক্ত বা ‘ডিটক্স’ করা অত্যন্ত জরুরি।
ডিজিটাল বিরতি নিন: ঘুম থেকে উঠেই কিংবা ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় ফোনে থাকার অভ্যাস কমান। কাজের ফাঁকে কিছু সময়ের জন্য সামাজিক মাধ্যম থেকে দূরে থাকুন। অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করে দিন। এ ছোট পরিবর্তন মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করবে।
নিজের জন্য সময় রাখুন: প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট এমন কিছু করুন, যা আপনাকে আনন্দ দেয়। বই পড়া, গান শোনা, গাছের যত্ন নেওয়া, রান্না করা কিংবা পছন্দের কোনো কাজে সময় কাটানো হতে পারে সেই বিরতি। সবসময় উৎপাদনশীল থাকার চাপ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখাও জরুরি।
মেডিটেশন বা ধ্যান: মনকে বিষমুক্ত করার অন্যতম কার্যকর উপায় হলো মেডিটেশন বা ধ্যান। এটা এমন একটি অনুশীলন, যার মাধ্যমে মনকে একাগ্র করা যায় এবং মনের মধ্যে প্রশান্তি ও স্বচ্ছতা তৈরি করা সম্ভব হয়।
প্রতিদিন কয়েক মিনিট নিরিবিলি বসে শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে মনোযোগ দিন। চিন্তা এলেই নিজেকে দোষারোপ না করে ধীরে ধীরে মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন। নিয়মিত অনুশীলনে ধ্যান দৈনন্দিন জীবনে প্রশান্তির একটি অভ্যাস হয়ে উঠতে পারে।
চর্চা করুন কৃতজ্ঞতাবোধ: প্রতিদিন এমন তিনটি বিষয় মনে করার চেষ্টা করুন, যেগুলোর জন্য আপনি কৃতজ্ঞ। হতে পারে প্রিয়জনের সঙ্গে কাটানো সময়, কোনো ছোট সাফল্য কিংবা দিনের একটি সুন্দর মুহূর্ত। এই চর্চা জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো অনুধাবন সাহায্য করতে পারে।
প্রকৃতির কাছে যান: খোলা জায়গায় হাঁটা, গাছপালার মধ্যে কিছু সময় কাটানো কিংবা সকালের আলো উপভোগ করা মনকে সতেজ করতে পারে। সম্ভব হলে প্রতিদিন কিছুটা সময় ঘরের বাইরে কাটান।
প্রয়োজনে কথা বলুন: দীর্ঘদিন ধরে মন খারাপ, উদ্বেগ কিংবা মানসিক চাপ থাকলে বিশ্বস্ত কারও সঙ্গে কথা বলুন। প্রয়োজন হলে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিন। সব সমস্যার সমাধান একা খুঁজে বের করতে হবে এমন নয়। এসবের পাশাপাশি মন ডিটক্স রাখতে দৈনন্দিন জীবনে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস, যেমন–ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস অন্তর্ভুক্তি জরুরি।
শরীর, ত্বক ও মনকে সতেজ রাখতে একসঙ্গে সবকিছু বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। শুরুটা করতে পারেন ছোট কিছু অভ্যাস, যেমন–সকালে এক গ্লাস পানি পান, প্রতিদিন ফল ও সবজি খাওয়া, কিছুক্ষণ হাঁটা, নিয়মিত ত্বকের পরিচর্যা কিংবা ঘুমের আগে ফোন সরিয়ে রাখা ইত্যাদি দিয়ে। প্রয়োজনে নিজের জন্য আলাদাভাবে রুটিন তৈরি করুন। ধীরে ধীরে তা অনুসরণ করুন।
- বিষয় :
- ত্বক