আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার দিবস
বিচারব্যবস্থা: প্রেক্ষিত বাংলাদেশ
প্রতীকী ছবি
সানজিদা আহমেদ
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৪ | ২২:৩৫ | আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৪ | ১৩:৫০
প্রায় ১২ দশক আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘প্রশ্ন’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে’। মূলত বিচারপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা বা অবিচারের বিষয়ে তিনি এ কথা লিখেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, বিচার নিয়ে অনিয়ম তখনও ছিল। সম্প্রতি সে অবস্থার কি ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হয়েছে? বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন সানজিদা আহমেদ
-----------------------------------------------------------------
বিশেষ কিছু ক্ষেত্র ছাড়া আমাদের দেশে বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এক সাধারণ ঘটনা। অথচ বিশেষায়িত কোনো মামলা নয়; বরং ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য সব মামলার দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি হওয়া আইন ও সংবিধানের দাবি। সংবিধানের ১৯ (১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্থপতি আলেকজান্ডার হ্যামিল্টনের বক্তব্য– ‘সমাজের প্রথম কর্তব্য হলো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।’ সমাজ তথা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এটি।
ন্যায়বিচার ও সমতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সুবিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সমতল ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়। আধুনিক কল্যাণ রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, সমাজের সব শ্রেণির নাগরিকের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা বিধান করা। সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে একমাত্র আইন-আদালতের মাধ্যমেই মানুষ তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। দেশে বিচারব্যবস্থায় দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ বরাবরের। অপরাধ তদন্তে রাজনৈতিক প্রভাব, তদন্ত কর্মকর্তার উদাসীনতা, গাফিলতি ও অনৈতিকতায় ভিকটিমদের প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ আছে। তদন্তে অহেতুক বিলম্বের কারণে অনেক মামলার বিচারকাজই শুরু করা সম্ভব হয় না। অবস্থার এত অবনতির অভিযোগ যে, অনেক ক্ষেত্রে বিচার পাওয়ার ন্যূনতম সম্ভাবনাও থাকে না।
বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে ন্যায়বিচারের অবস্থা সম্পর্কে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘সমসাময়িক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে আইনি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এখনও ঘটেনি। আমরা এখনও সেই পাকিস্তান আমলের আইন নিয়ে চলছি। এ আইনের ধারাবাহিকতায় মানুষের আচরণেরও কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘শাসক ও শোষিত হওয়ার ব্যবস্থা অনেকটাই দৃশ্যমান। এই যে সময় অনুসারে আইনের আধুনিকায়ন ঘটছে না, এটি হতাশাজনক।’
দেশে চলমান অনেক আইন আছে, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি বলে জানান এ আইন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থি আইনের মধ্যে অন্যতম হলো ফৌজদারি আইন। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের সব ধারা বাতিল হয়নি। উল্টো বাতিলকৃত ধারাকে কেন্দ্র করে পোশাক শ্রমিকদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। একটি ধর্ষণ মামলা যখন ৩০ বছর ধরে চলে সেটি যিনি বিচার চাইছেন, তাঁকে আরও বেশি ভুক্তভোগী করে তোলে। সাম্প্রতিক সময়ের আইনগুলোর মধ্যে টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১-এর ৯৭ ক (১) ধারা মতে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে যে কোনো টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যবহারকারীর প্রেরিত বার্তা ও কথোপকথন প্রতিহত, রেকর্ড ধারণ বা তৎসম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য সরকার নির্ধারিত সময়ের জন্য গোয়েন্দা সংস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থার কোনো কর্মকর্তাকে ক্ষমতা প্রদান করতে পারবে। উক্ত কার্যক্রমে সার্বিক সহায়তা প্রদানের জন্য টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানকারীকে নির্দেশ দিতে পারবে এবং পরিচালনাকারী উক্ত নির্দেশ পালন করতে বাধ্য থাকবেন। এই ধারাটি জনগণের গোপনীয়তা রক্ষাকে প্রশ্নের সম্মুখীন করে। পুলিশ ইচ্ছা করলেই একজন ব্যক্তির তথ্য যে কোনো সময় নিয়ে নিতে পারছে, যা ব্যক্তির গোপনীয়তায় বাধা তৈরি করে।’
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর ৫৭ ধারার কথা উল্লেখ করে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘যদিও ওই ধারাটি বিলুপ্ত করা হয়। তবে তা নতুন আঙ্গিকে যুক্তও হয়। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকের মতামত প্রকাশ করার অধিকার সংবিধানে দেওয়া আছে। অথচ ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা বিধিমালার আলোকে প্রচুর মিথ্যা মামলা হয়। সংবাদমাধ্যম হলো রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ। যদি সাংবাদিকদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, তবে ন্যায়বিচার সম্ভব কীভাবে! পূর্ববর্তী আইনগুলো ধারাবাহিকতায় ন্যায়বিচার পরিপন্থি আইনগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ বিশেষভাবে উল্লেখ্য।’
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণ প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। মূলত প্রতিনিধির মাধ্যমে জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা করবেন। এ ক্ষেত্রে নাগরিকের তথ্য জানার অধিকার ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্যতম আধার। তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুসারে, নাগরিকদের প্রশ্ন করার অধিকার দেওয়া হয়। এ ছাড়া জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য সুরক্ষা আইন ২০১১-এর ৫ (১) অনুসারে, ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোনো সঠিক তথ্য প্রকাশ করলে উক্ত ব্যক্তির সম্মতি ব্যতীত তাঁর পরিচিতি প্রকাশ করা যাবে না’ এবং ৫ (২) ধারা অনুসারে, ‘জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট সঠিক তথ্য প্রকাশের কারণে তথ্য প্রকাশকারীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কোনো বিভাগীয় মামলা দায়ের করা যাবে না।’
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, ‘যদিও এই ধারাটি জনগণের স্বার্থ সুরক্ষার ক্ষেত্রে অসাধারণ একটি উদ্যোগ; কিন্তু এর প্রয়োগ এখনও সঠিকভাবে নেই।’ আদালতের বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রথমত, প্রশাসনের হস্তক্ষেপের বাইরে থাকতে হলে বিচারব্যবস্থাকে বিচ্ছিন্ন করা প্রয়োজন।’ এ ছাড়া ন্যায়বিচার বাস্তবায়নের জন্য গোটা ব্যবস্থাকে মানববান্ধব করার বিষয়ে জোর দেন। সংবিধানে যদি অসমতার সুযোগ থাকে, সেটি প্রতিহত করার বিষয়েও খতিয়ে দেখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
মানবাধিকারকর্মী এবং নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের বাস্তবতা সম্পর্কে বলেন, ‘একজন নাগরিকের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও জীবনযাপনের জন্য আইন খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে নানা ধরনের আইন আছে। কিন্তু এসব আইনের মধ্যে রয়েছে অস্পষ্টতা। যে কারণে একেকজন আইনকে ভিন্ন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করেন। ফলে এর প্রয়োগ ভিন্ন ভিন্ন হয়। আইনের এই উন্মুক্ত ব্যাখ্যা অনেক বড় দুর্বলতা, যা নাগরিকের সুবিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক। এ ছাড়া গৃহকর্মীদের সুরক্ষার জন্য আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত কোনো আইন নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে শুধু বিচারে দীর্ঘসূত্রতাই নয়; বরং যথাসময়ে অপরাধের তদন্ত না হওয়াও বড় সমস্যা। ফলে একদিকে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন আর বিচারহীনতার কারণে অপরাধপ্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে।’
সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি এবং মানবাধিকারকর্মী ইলিনর রুজভেল্টের ভাষায়, ‘ন্যায়বিচার কখনোই এক পক্ষের জন্য হতে পারে না। তখনই এটি ন্যায়বিচার হিসেবে গণ্য হবে; যখন তা সব পক্ষের জন্য প্রতিষ্ঠা করা হবে।’
লেখক: জেন্ডার বিশেষজ্ঞ, ব্র্যাক
- বিষয় :
- ন্যায়বিচার
- বিচার ব্যবস্থা
- বাংলাদেশ
