গাজা-লেবাননের ধ্বংসস্তূপে ঈদ
গাজায় ঈদ আসে টিকে থাকার লড়াইয়ে ছবি: আনাদোলু নিউজ এজেন্সি
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:২৪ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১৩:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
ত্যাগের মহিমা, ভ্রাতৃত্ববোধ আর আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়ার বার্তা নিয়ে প্রতি বছর ঘুরে আসে ঈদুল আজহা। কিন্তু এবারের ঈদের আকাশ যেন বারুদের গন্ধে ভারী। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এবং বিশ্বজুড়ে এর বিরূপ প্রভাব এবারের ঈদকে পরিণত করেছে ইতিহাসের অন্যতম বিষাদময় ও ব্যয়বহুল এক উৎসবে।
ধ্বংসস্তূপে অস্তিত্বের লড়াই
গাজার চিত্র যেন এক জীবন্ত নরক। প্রিয়জন আর আপন নীড় হারিয়ে লাখো মানুষ আজ উদ্বাস্তু। গাজার এক নারী আয়া, ৯ সন্তানের জননী। যুদ্ধের আগে তাঁর জীবন ছিল স্থিতিশীল। কিন্তু এক রাতেই সব শেষ হয়ে যায়। চোখের সামনে স্বামী নিহত হন, আট বছরের মেয়ে গুরুতর আহত হয়। ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত এক সন্তানকে নিয়ে এক অমানবিক ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তিনি বেঁচে থাকার লড়াই করছেন। ইউনিসেফের সামান্য নগদ সহায়তায় কোনোমতে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি। এবারের ঈদে তার কোনো বড় চাওয়া নেই, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আয়া বলেন, ‘আমি কোনো তাঁবু চাই না, আমি কেবল নিরাপত্তা চাই। আমার সন্তানদের জন্য একটি ঘর চাই, যেখানে তারা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে।’
গাজার শিশুর কাছে ঈদের আনন্দ এখন এক সুদূর অতীত। একশনএইড ও এএফএসসি-এর সাম্প্রতিক তথ্যমতে, গাজার শিশুর কাছে ঈদের সংজ্ঞা বদলে গেছে। ১১ বছরের শিশু জানা জানায়, ‘আগে ঈদে আমরা নতুন জামা কিনতাম, সালামি পেতাম। এখন আমাদের ঘরই নেই। আমি আমার বন্ধু শাহদকে হারিয়েছি। এই ঈদে ও আমার সঙ্গে নেই। আমি রোজ ওকে স্বপ্ন দেখি।’ আরেক শিশু নূরের কথায় ফুটে ওঠে ভয়ংকর অর্থনৈতিক সংকটের চিত্র, ‘জিনিসপত্রের এত দাম যে বাবা নতুন জামা কিনে দিতে পারে না। এবারের ঈদের পরিবেশ মোটেও সুন্দর নয়।’
বারুদের ধোঁয়ায় ঢাকা আরেক প্রান্তর
যুদ্ধের এই ভয়াবহতা কেবল গাজাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা আছড়ে পড়েছে লেবাননেও। ২০২৬ সালের মে মাসে ইউনিসেফ ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শত শত শিশু হতাহত হচ্ছে। প্রাণ বাঁচাতে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে লাখো পরিবার। তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন লেবাননে। লেবাননের এক বাস্তুচ্যুত শিশু একশনএইডকে পাঠানো এক ভয়েস নোটে তার অসহায়ত্বের কথা জানায়, ‘এ বছর আমরা ঈদের কোনো নতুন জামা কিনব না, কোনো আত্মীয়ের বাড়িতেও বেড়াতে যাব না। কারণ বোমার ভয়ে আমরা বাড়িছাড়া। এই যুদ্ধে আমরা ছোটদের কী দোষ?’
ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ঈদ
যুদ্ধের প্রভাব শুধু মৃত্যুর পরিসংখ্যানেই আটকে নেই, এটি জন্ম দিচ্ছে ভয়াবহ অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দুর্ভিক্ষের। ইসলামিক রিলিফের মতে, বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ায় এটি হতে যাচ্ছে ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ঈদ। গাজা, লেবানন বা সুদানের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে কোরবানির মাংস বিতরণ বা সামান্য ত্রাণ পৌঁছানোর খরচও এখন আকাশছোঁয়া।
ঈদ আসে আনন্দ ভাগ করে নিতে, বৈষম্য ভুলে মানুষে মানুষে রচিত হয় সম্প্রীতির সেতুবন্ধ। যুদ্ধ ও আগ্রাসনের নারকীয় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা নিজেদের নিরাপদ ঘরে ঈদের আনন্দ উদযাপন করব, তখন কি একবারও মনে পড়বে না সেই শিশুদের কথা; যাদের উৎসবের পোশাকের বদলে পরতে হচ্ছে কাফনের কাপড়? যুদ্ধবিধ্বস্ত এই প্রান্তরগুলোতে এবারের ঈদ কোনো উৎসব নয়, বরং বেঁচে থাকার এক নীরব আর্তনাদ।
- বিষয় :
- গাজা
- লেবানন
- ঈদুল আজহা
- শাহেরীন আরাফাত
