ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সামাজিক সংকটের নির্মম প্রতিচ্ছবি

সামাজিক সংকটের নির্মম প্রতিচ্ছবি
×

কখনও প্রতিবেশী, কখনও আত্মীয়, কখনও শিক্ষক, আবার কখনও পরিবারের অত্যন্ত পরিচিত কেউ হয়ে উঠছে শিশুর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক -ছবি :: ইউনিসেফ

ওয়াসিউর রহমান তন্ময়

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:২৬ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১৩:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

কতটা নির্মম আর ভয়াবহ হলে একটি শিশুকে ধর্ষণের পর এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা সম্ভব? সম্প্রতি এক শিশুর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, আসামি জবানবন্দিতে সেই লোমহর্ষক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। এসব শুনেও কি আমাদের বিবেক সত্যিই জাগ্রত হয়? নাকি কয়েক দিনের সামাজিক মাধ্যমে ঝড় আর চায়ের কাপের আলোচনার পর আমরা আবার সব ভুলে যাই? লিখেছেন ওয়াসিউর রহমান তন্ময়
-----------------------------------------------------------

গণমাধ্যমের সামনে যখন এক শোকাহত বাবা দাঁড়িয়ে বলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ বিচার হবে না’–তখন সেটি শুধু একজন অসহায় বাবার ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়। এটি পুরো বিচারব্যবস্থা ও সমাজের প্রতি আমাদের সবার গভীর অনাস্থারই এক মর্মান্তিক প্রকাশ। কারণ আমরা জানি, এই ঘটনার ক্ষত শুকানোর আগেই আরেকটি নতুন ঘটনা হয়তো সামনে আসবে। তখন আগের শিশুটির নাম ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে সংবাদপত্রের পুরোনো পাতায়, যেমন হারিয়ে গেছে আছিয়ার নাম।

গত কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চারটি কন্যাশিশুকে (যাদের বয়স ৪ থেকে ১০ বছর) ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। মিরপুর, সিলেট, ঠাকুরগাঁও, মুন্সীগঞ্জ–কোথাও আমাদের শিশুরা নিরাপদ নয়। প্রতিদিন খবরের কাগজ খুললেই চোখে পড়ে নতুন কোনো শিশুর ওপর নির্যাতনের খবর। কখনও প্রতিবেশী, কখনও আত্মীয়, কখনও শিক্ষক, আবার কখনও পরিবারের অত্যন্ত পরিচিত কেউ হয়ে উঠছে শিশুর সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো এসব ঘটনা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়। এটি ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের গভীরে ছড়িয়ে পড়া এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি ও জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।

পরিসংখ্যান কী বলছে?
মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই অন্তত ৫৬ জন ১২ বছরের কম বয়সী শিশু যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। একই সময়ে ১৮০টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যার মধ্যে ৮১ জন ভুক্তভোগীর বয়স ১৮ বছরের নিচে। এই ৮১ জনের মধ্যে ১৬ জনের বয়স ছয় বছরের কম ও ৪০ জনের বয়স সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে। এই সংখ্যাগুলো শুধু কিছু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি শিশুর ভেঙে যাওয়া নিরাপত্তাবোধ, একটি পরিবারের মানসিক বিপর্যয় এবং আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি।

পরিস্থিতির অবনতি বোঝার জন্য আগের বছরের তথ্যগুলোও পর্যালোচনা করা জরুরি। ২০২৫ সালে সাত থেকে ১২ বছর বয়সী ১৪৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৩ এবং ২০২৩ সালে ছিল ৫৮। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এই ধরনের জঘন্য অপরাধ দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

একইভাবে ছয় বছরের নিচে শিশুর ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায়। ২০২৫ সালে ছয় বছরের কম বয়সী ৭১ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ২৪ এবং ২০২৩ সালে ৩৬। এত ছোট শিশুদের বিরুদ্ধে এমন নির্মম সহিংসতা কোনোভাবেই একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক সমাজের চিত্র হতে পারে না।

শুধু ধর্ষণের ঘটনাই নয়, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনাও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪টি ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়েছে। এর মধ্যে আট ভুক্তভোগীর বয়স ছয় বছরের নিচে এবং ১৬ জনের বয়স সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে (১ থেকে ১১ মে) ১৮টি ধর্ষণের ঘটনা রিপোর্ট হয়েছে, যার মধ্যে ১১ জনই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এই গতি দেখলে স্পষ্ট হয় পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বাস্তবতা আরও ভয়াবহ
মানবাধিকারকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যে পরিসংখ্যানগুলো আমরা দেখছি, তা প্রকৃত পরিস্থিতির একটি ক্ষুদ্র অংশমাত্র। বহু ঘটনা প্রকাশ পায় না। সামাজিক লজ্জা, ভয়, হুমকি, পারিবারিক চাপ কিংবা বিচারহীনতার দীর্ঘস্থায়ী আশঙ্কায় অনেক পরিবার অভিযোগ করতে চায় না বা পারে না। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপরাধীরা অপরিচিত কেউ নয়। প্রতিবেশী, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, পরিচিত ব্যক্তি, এমনকি শিক্ষকও অনেক ঘটনায় অভিযুক্ত। অর্থাৎ শিশুরা ঘরের বাইরে যেমন অনিরাপদ, তেমনি ঘরের ভেতরেও সুরক্ষিত নয়। এই রূঢ় বাস্তবতা আমাদের সামাজিক কাঠামো এবং পারিবারিক মূল্যবোধ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলে।

সম্প্রতি একটি ঘটনায় ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের ফলে তার সাত মাসের গর্ভধারণের ঘটনা পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। শিশুটির শারীরিক পরিবর্তন দেখে পরিবার বিষয়টি জানতে পারে এবং চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। এই ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও নজরদারির অভাবের এক নির্মম প্রতীক।

কেন বাড়ছে এই অপরাধ?
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ বা ‘দায়মুক্তি’ এমন ঘটনা বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ। অপরাধীরা জানে, আমাদের আইনি প্রক্রিয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই বিচার দীর্ঘায়িত হয়, প্রমাণ নষ্ট হয়, সাক্ষীরা ভয় পায় বা প্রভাবিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত অনেক অপরাধী আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যায়। এই বাস্তবতা অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক মূল্যবোধের তীব্র অবক্ষয়, নারীবিদ্বেষী মানসিকতা, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং শিশু সুরক্ষা বিষয়ে সচেতনতার অভাব। অনেক পরিবার এখনও শিশুর সঙ্গে ‘গুড টাচ’ (নিরাপদ স্পর্শ) এবং ‘ব্যাড টাচ’ (অনিরাপদ স্পর্শ) নিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা ও যৌন শিক্ষা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।

আমাদের করণীয় কী?
শুধু কঠোর আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, আইনের দ্রুত ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরিহার্য, যা অন্য অপরাধীদের জন্য একটি শক্ত বার্তা দেবে। একই সঙ্গে পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচারব্যবস্থার সক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা বাড়াতে হবে। 

স্কুল, মাদ্রাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিশুর জন্য নিরাপদ ও গোপনীয় অভিযোগ ব্যবস্থা থাকতে হবে, যাতে তারা ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারে। একই সঙ্গে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিং সহজলভ্য করতে হবে।

আরেকটি অত্যন্ত  গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভুক্তভোগীদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ। অনেক সময় নির্যাতিত শিশুই সামাজিকভাবে বৈষম্য, অপবাদ ও লজ্জার শিকার হয়। এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। অপরাধীর লজ্জা সমাজকে বহন করতে হবে, এটা কোনোভাবেই ভুক্তভোগীর নয়। একটি রাষ্ট্র তখনই নিজেকে সভ্য বলে দাবি করতে পারে, যখন তার শিশুরা নিরাপদ থাকে। প্রতিটি পরিসংখ্যান আমাদের বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত। কারণ প্রতিটি সংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানে একটি শৈশবের অকালে ঝরে যাওয়া। মনে রাখতে হবে, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের কোনো দয়া নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার অলঙ্ঘনীয় মৌলিক মানবাধিকার।

তবে সমাধান শুধু আইনি শাস্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠন–সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। 

লেখক: লিড, ইয়ুথ অ্যান্ড সোশ্যাল কোহিশন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন

×