শখের নকশা থেকে সফলতার গল্প
‘ছাপ্পা’র শোরুমে নিজ হাতে তৈরি পণ্যের সঙ্গে জান্নাত রফিক
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:২৫ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১৩:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে বিবিএ-এমবিএ সম্পন্ন করা একজন সাধারণ শিক্ষার্থীর জীবনে স্বপ্ন ছিল গতানুগতিক। পড়াশোনা শেষে করপোরেট দুনিয়ায় ভালো একটি চাকরি–এমনই প্রত্যাশা ছিল পরিবারের। কিন্তু জান্নাত রফিকের গল্পটা একটু অন্যরকম। তাঁর গল্পের শুরুটা কোনো বহুজাতিক কোম্পানির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নয়, বরং রং আর কাঠের ব্লকের শব্দে। শখ থেকে শুরু হওয়া এক উদ্যোগ কীভাবে আজ একটি সফল ব্যবসায় পরিণত হয়েছে, তারই অনন্য দৃষ্টান্ত জান্নাত রফিকের প্রতিষ্ঠান ‘ছাপ্পা’।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ব্লক ও রঙের কাজের প্রতি জান্নাতের গভীর ভালোবাসা তৈরি হয়। নিজের ডিজাইন করা ব্লকের জামা পরে ক্যাম্পাসে যেতেন তিনি। বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতরা তাঁর সেই নকশা দেখে মুগ্ধ হতেন এবং প্রশংসা করতেন। একদিন তাঁর জামার কাজ দেখে প্রতিবেশী এক আন্টি নিজের দুই বাচ্চার জন্য জামা ডিজাইন করে দেওয়ার অনুরোধ করেন। এই ছোট অনুরোধই জান্নাতের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এরপর কয়েকটি শাড়ি ডিজাইন করেন তিনি। বন্ধু ও প্রতিবেশীদের উৎসাহে ধীরে ধীরে ছাপ্পার যাত্রা। ছাপ্পা নামটির পেছনের গল্পও বেশ সাধারণ, তবে অর্থবহ। কাঠ ব্লকের নকশা এবং ব্লকে রং মেখে কাপড়ে ছাপ দেওয়ার ধারণা থেকেই এই নাম নির্বাচন করেন জান্নাত।
পড়াশোনা শেষে যখন জান্নাত পুরোদমে ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন স্বভাবতই পরিবারের দিক থেকে চাপ আসে। ‘আইবিএ থেকে পড়ে ব্যবসা কেন?’ ‘বন্ধুরা তো চাকরিতে অনেক দূর এগিয়ে গেছে।’ এমন সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তাঁকে। পরিবারের কথা ভেবে তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে যোগ দেন। কিন্তু চাকরি ও ব্যবসা একসঙ্গে চালিয়ে নেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে জান্নাত লক্ষ্য করেন, ৮ ঘণ্টা চাকরি করে তিনি যে বেতন পাচ্ছেন, ব্যবসার আয় তার চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি। এই উপলব্ধি তাঁকে একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বাবা-মাকে বুঝিয়ে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
যে কোনো নারীর উদ্যোগে পরিবারের সমর্থন কতটা জরুরি, তা জান্নাতের গল্পে স্পষ্ট। স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি সবার কাছ থেকে তিনি অভাবনীয় সমর্থন পেয়েছেন। জান্নাত বলেন, ‘আমার শ্বশুর এই কাজ দারুণ পছন্দ করতেন। সংসারের সব দায়িত্ব শাশুড়ি নিজের কাঁধে তুলে নেন, যাতে আমি ব্যবসায় পর্যাপ্ত সময় দিতে পারি। পরিবারের এই নিঃশর্ত ভালোবাসাই আমাকে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার ইসলামনগর লাব্বায়েক মোড়ে রয়েছে ‘ছাপ্পা’র শোরুম। প্রায় তিন বছর আগে জান্নাত তা গড়ে তোলেন। শাড়ি দিয়ে শুরু হলেও ছাপ্পা এখন কুর্তি, শীতের চাদর ও ব্লাউজ নিয়ে কাজ করছে। শুধু দেশি পণ্যই নয়, চীন থেকে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, যেমন–ম্যাসাজার জুতো, লেডিস ব্যাগ, ট্রাভেল ব্যাগ, ক্রুশেটের পোশাক, বেবি আইটেম, ধূপ বার্নার ও সিরামিকের শোপিসও আমদানি করেন জান্নাত। নারীর অন্তর্বাস নিয়েও কাজ করছেন তিনি, যার জন্য ‘সিক্রেট এমব্রেস’ নামে আলাদা একটি গ্রুপ রয়েছে। চাকরি ছাড়ার পর গত এক বছরে জান্নাত তাঁর ব্যবসাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছেন। বর্তমানে তাঁর মাসিক আয় দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে।
বর্তমানে অনলাইনে অসংখ্য উদ্যোক্তা কাজ করছেন। এটিকে জান্নাত বেশ ইতিবাচক হিসেবে দেখেন। তবে ছাপ্পার বিশেষত্ব হলো এর পণ্যের মান ও স্বচ্ছতা। অনলাইনে ক্রেতার বিশ্বাস অর্জন করা বড় চ্যালেঞ্জ হলেও ছাপ্পা শুরু থেকেই এ জায়গায় কাজ করে যাচ্ছে। নিয়মিত উৎপাদন প্রক্রিয়ার ভিডিও, পণ্যের আসল ছবি এবং প্যাকেজিংয়ের দৃশ্য শেয়ার করার মাধ্যমে ক্রেতাদের বাস্তব ধারণা দেওয়া হয়।
জান্নাতের মতে, ‘সংখ্যার চেয়ে গ্রাহকের সন্তুষ্টি ও আস্থাকে বেশি গুরুত্ব দিই আমরা। ভালো মানের পণ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগী এড়িয়ে সরাসরি উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করি।’
গ্রাহকদের যে কোনো অভিযোগ বা গঠনমূলক সমালোচনা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে ছাপ্পা এবং দ্রুত যাচাইয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান ও প্রয়োজন অনুযায়ী সেবার মান উন্নত করা হয় বলে জানান জান্নাত। জান্নাত মনে করেন, সরকার যদি সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল মার্কেটিং সহায়তা দেয়, তবে এই খাত আরও শক্তিশালী হবে। নিরাপদ পেমেন্ট ব্যবস্থা, কম খরচে ডেলিভারি এবং উদ্যোক্তাবান্ধব নীতিমালা তৈরি করাও জরুরি।
- বিষয় :
- জীবনের গল্প
- নারী উদ্যোক্তা
- লাবণী মণ্ডল
