দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত হোক
স ম সা ম য়ি ক
শিরীন হক
প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ | ১২:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারীকে আমরা এখনও মানুষ মনে করি না। প্রাপ্তবয়স্ক নারীই হোক, আর কন্যাশিশুই হোক–আমরা তাদের মানুষই মনে করি না। নারীবিদ্বেষ অনেক পুরুষের মাথায় গ্রথিত। এটিকে আমরা পরিবর্তন করতে পারলাম না।
অতিসম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে আলোচিত যে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো, এই ঘটনার বিস্তারিত সংবাদ পড়েছি, তাতে আমি স্তব্ধ! এত বছর আমরা কী করলাম তাহলে? এত সংগ্রাম করলাম, কিছুই তো অর্জন করতে পারলাম না! এই মেয়েটি বা ওর মতো আরও অনেককে রক্ষা করা গেল না। গত বছর মে মাসে মাগুরার আলোচিত এক শিশু ধর্ষণ থেকে শুরু করে পরপর কতগুলো বালিকা এর শিকার! কী ভয়ংকর একটি সমাজে বাস করছি! কী ভয়ংকর একটি দেশে বাস করছি!
এটিই হওয়া উচিত এখন সরকারের এক নম্বর ইস্যু। নারীর ওপর সহিংসতা কীভাবে কমাবে, কীভাবে রোধ করবে, কীভাবে এটির প্রতিকার হবে, কীভাবে বিচার হবে–এগুলো হওয়া উচিত আজকের জাতীয় আলোচ্যসূচির এক নম্বর ইস্যু। সমাজ নারীকে কীভাবে দেখে, নারীর সঙ্গে কী আচরণ করে এবং কীভাবে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়–এ নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
একটি ঘটনার পরে আবার আরেকটি ঘটনা যখন ঘটছে, তখন ওই আগেরটি চাপা পড়ে যাচ্ছে। এটিই স্বাভাবিক; কারণ একজন মানুষের পক্ষে এত মানসিক চাপ নেওয়া সম্ভব না। একটি ঘটনা নিয়ে আমরা হয়তো কিছুদিন গলা ফাটালাম, তারপরে আরেকটি ঘটনা ঘটবে, তখন আমরা সেটি নিয়ে সোচ্চার হলাম; তারপরে আরেকটি ঘটনা ঘটবে। কিন্তু নারীর ওপর সহিংসতা রোধে বা কমাতে দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান বা প্রতিকার হচ্ছে না। ঘটনাকেন্দ্রিক হয়ে গেছি আমরা।
অথচ যে সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক ব্যবস্থা এই ঘটনাগুলোকে ঘটতে দেয়; সেই ব্যবস্থা কীভাবে ভাঙব, সেই ব্যবস্থাকে কীভাবে সমূলে উৎপাটন করব–সেই আলোচনা আজ জাতীয় আলোচ্যসূচির একদম প্রথম ভাগে থাকা দরকার।
দ্রুত বিচার আর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবির সঙ্গে আমি গলা মেলাতে পারি না। আমি চাই, আইনসিদ্ধ যে প্রক্রিয়া, তার মধ্য দিয়েই তদন্ত হবে; তদন্ত হয়ে তার বিচার হবে। দ্রুত বিচার, দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি–এগুলো দিয়ে কোনোদিন অপরাধ দমন হয় না। আমি চাই একটি দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত হোক। পুলিশের সক্ষমতা আছে তদন্ত করার, যদিও সব ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ দেখা যায় না।
অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটছে। কারণ তাহলে তো আর সাক্ষী থাকবে না। এখন যেহেতু পল্লবীতে সংঘটিত ধর্ষণ ও হত্যার অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা গেছে, এর সুযোগ নেওয়া উচিত শুধু বিচার আর শাস্তির জন্য না; তার মনস্তত্ত্বটা বোঝার জন্য। কোন কারণে এই ধরনের পুরুষ তৈরি হয়; সব পুরুষ তো এরকম না! কী ধরনের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক গঠন তাদের–সেটি বোঝা দরকার। আমি মনে করি, যারা মনোবিজ্ঞানী এবং অপরাধবিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন, তাদের উচিত এখন এগিয়ে আসা। তাদের উচিত এই মানুষগুলোর নিবিড় ও গভীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা এবং জানার চেষ্টা করা–সমাজের কোন উপাদানগুলো এই ধরনের মানুষ তৈরি করে।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, নারীপক্ষ সাবেক নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান
- বিষয় :
- শিরীন হক
- নারী ও শিশু নির্যাতন
