১ আগস্ট– বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস
শিশুর জীবনে প্রথম টিকা
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ | ১৯:২৭ | আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৫ | ১৯:২৯
শিশুর আগমন সবসময়ই আনন্দের। তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। সুস্থ-সবল শিশুই প্রত্যেকের কাম্য। শিশুর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে পরিবারের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এর মধ্যে প্রথম ও প্রধান চিন্তাটি হলো– কীভাবে, কোন ধরনের খাবার দিলে শিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠবে! অনেক সময় সঠিক জ্ঞানের অভাবে পুষ্টি ঘাটতি দেখা দেয়। এতে শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টি চাহিদা পূরণে দরকার সঠিক জ্ঞান ও যথাযথ পরিবেশ।
১ আগস্ট বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবস এবং ওইদিন থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ প্রতিবছর পৃথিবীর ১৭০টিরও বেশি দেশে পালন করা হয়। শিশুকে বুকের দুধ পান করাতে উৎসাহ দিতে এবং শিশুদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে ১৯৯২ সাল থেকে এ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
মাতৃদুগ্ধ কেবল শিশুর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধের মাধ্যমই নয়, এটি একটি স্বাস্থ্যবান সমাজ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তিও। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউনিসেফ এ মাতৃদুগ্ধপানকেই উল্লেখ করেছে– শিশুর জীবনের প্রথম টিকা। এ কথার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে– সুস্থ পৃথিবীর বুনিয়াদ: মাতৃদুগ্ধের মাধ্যমে শিশুর সুরক্ষা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন শিশু প্রয়োজনীয় পরিমাণে মায়ের দুধ পায় না, যা তাদের স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মৃত্যুহারেও প্রভাব ফেলে।
নবজাতকের জন্য সর্বোত্তম খাবার হলো মায়ের দুধ। জন্মের ১ ঘণ্টার মধ্যেই শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়াতে হয়। শিশু জন্মের পর ২ থেকে ৩ দিন মায়ের বুকে যে হলদেটে সোনালি, আঠালো দুধ নিঃসৃত হয় তাকে শাল দুধ বা কলোস্ট্রাম বলে। পরিমাণে বেশি না হলেও এতে নবজাতকের জন্য থাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি ও পানি। বিশ্বে প্রায় ২৭ লাখ শিশুর মৃত্যু হয় অপুষ্টির কারণে, যা মোট শিশু মৃত্যুর ৪৫ শতাংশ। বুকের দুধ খাওয়ালে ৫ বছরের কম বয়সী শিশুর অন্তত ৮ লাখ ২০ হাজার জনের জীবন বাঁচানো সম্ভব বলে এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে ইউনিসেফ। জন্মের প্রথম ১ ঘণ্টার মধ্যে মায়ের দুধ খাওয়ালে এ শিশু মৃত্যুর হার প্রায় ৩১ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব। এই শাল দুধকে শিশুর জীবনে প্রথম টিকা বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ অজ্ঞানতাবশত অনেকে এই দুধ ফেলে দেন। শিশুর জীবনে প্রথম ৬ মাস বুকের দুধই যথেষ্ট। এ থেকেই শিশু প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারে।
শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুল আহসান বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি নির্দেশনা আছে– ছয় মাস পর্যন্ত শুধু বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। ৬ মাস বয়স থেকে পরিপূরক খাবার দিতে হবে। পাশাপাশি দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে বুকের দুধ খাওয়া চালিয়ে যেতে হবে।’
শিশুর জন্য মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। মায়ের দুধ প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ খাবার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের মতে, প্রথম ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুর জন্য শুধু মাতৃদুগ্ধই যথেষ্ট– পানি, ফর্মুলা বা অন্য কোনো খাবার কিছুই নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মাতৃদুগ্ধ পানকারী শিশুর মৃত্যুঝুঁকি ১৪ গুণ কমে যায় ডায়রিয়ার ক্ষেত্রে এবং চার গুণ কমে নিউমোনিয়ার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে এখনও শুধু মাতৃদুগ্ধ পান করানো শিশুর হার ৬৪ শতাংশের মতো (২০২৩ সালের বিবিএস ও ইউনিসেফ যৌথ জরিপ অনুযায়ী)। যদিও এই হার আগের চেয়ে বেড়েছে; তবু অনেক শিশু এখনও প্রাকৃতিক এই খাদ্য থেকে বঞ্চিত। এ ক্ষেত্রে মাতৃদুগ্ধ ব্যাংকের ব্যবস্থা করতে পারলে অনেক শিশু যারা বিভিন্ন কারণে মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত থাকেন, তাদের কাছে এ প্রাকৃতিক টিকা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
মাতৃদুগ্ধপানের সুবিধাগুলো যতই পরিষ্কার হোক না কেন, বাস্তবে বহু মা এই প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হন। কর্মজীবী মায়েরা অনেক সময় মাতৃদুগ্ধ দান অব্যাহত রাখতে পারেন না। কারণ কর্মক্ষেত্রে নেই উপযুক্ত পরিবেশ বা মাতৃদুগ্ধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা।
এ ক্ষেত্রে কিছু সম্ভাব্য করণীয় নির্দেশ করেছেন বিশ্লেষকরা–
* মাতৃবান্ধব কর্মস্থল, যেখানে ডে-কেয়ার সেন্টার ও ব্রেস্টফিডিং কর্নার থাকবে।
* প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, যা এখনও অনেক পরিবারে শাল দুধ ফেলে দেওয়া বা দুধের পরিবর্তে মধু খাওয়ানোর মতো ক্ষতিকর রীতি প্রচলিত রেখেছে।
* জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য মিডিয়া ও কমিউনিটি পর্যায়ে প্রচারাভিযান।
শুধু শিশু নয়, মায়ের জন্যও মাতৃদুগ্ধ দান একটি আশীর্বাদ। এটি প্রসব-পরবর্তী রক্তপাত কমায়, জরায়ু সংকোচনে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। মাতৃদুগ্ধ কেবল একটি পুষ্টিকর খাদ্য নয়, এটি মা ও সন্তানের মধ্যে এক গভীর মানসিক বন্ধনও গড়ে তোলে; যা পরবর্তী সময়ে শিশুর মানসিক বিকাশ ও আত্মবিশ্বাস তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
মাতৃদুগ্ধ কেবল একটি প্রাকৃতিক প্রয়োজন নয়– এটি একটি মানবাধিকার। প্রতিটি শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গে এই অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা পিছিয়ে যাব একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের কাছ থেকে। তাই ২০২৫ সালের বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক– প্রতিটি মায়ের পাশে দাঁড়াবো, প্রতিটি শিশুকে তার প্রথম টিকাটি পৌঁছে দেব।
- বিষয় :
- লাবণী মণ্ডল
- মাতৃদুগ্ধ দিবস