আপন আলোয় সাইদা খানম
দেশের প্রথম পেশাদার নারী আলোকচিত্রী সাইদা খানম [২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৭-১৮ আগস্ট ২০২০] ছবি: জান্নাতুল মাওয়া
জান্নাতুল মাওয়া
প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪০ | আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২৫ | ১৫:৫২
আমি যদি আলোকচিত্রের জগতে না আসতাম, তাহলে হয়তো সাইদা খানমকে এমন করে জানা হতো না। এর আগে শুধু বাংলাদেশের স্বনামধন্য পুরুষ আলোকচিত্রীদের নাম জানা ছিল। আলোকচিত্র নিয়ে অধ্যায়ন করার সময় আমার পূর্ববর্তী নারী ফটোগ্রাফারদের সম্পর্কে খোঁজ করতে গিয়েই তাঁকে জানা। তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হয় দৃক গ্যালারিতে, ‘নারী’ শীর্ষক আমাদের একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে।
সাইদা খানমের জন্ম ১৯৩৭ সালের ২৯ ডিসেম্বর পাবনায় এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে। তাঁর অন্য ভাই-বোনরাও নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। সৃজনশীল পরিবারে বেড়ে ওঠায় সাইদা খানমের ভেতর যে শিল্পবোধের জন্ম নেয়, তা থেকেই আলোকচিত্রসহ বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমের প্রতি তাঁর অদম্য আকর্ষণ ছিল। ক্যামেরার পাশাপাশি তাঁর কলমও চলত সমান তালে।
তিনি যে সময় পেশাদার আলোকচিত্রী হিসেবে যাত্রা শুরু করেন, তখন বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীদের জন্য এ ধরনের পেশায় আসা ছিল একেবারেই বিরল এবং তা চালিয়ে যাওয়া সহজ কোনো বিষয় ছিল না। সাইদা খানম ছিলেন এ অঞ্চলের প্রথম পেশাদার নারী আলোকচিত্রী। যখন বাঙালি মুসলিম মেয়েদের জনসমক্ষে আসাকে নিরুৎসাহিত করা হতো, তখন তিনি আলো-আঁধারের জাদুতে ফ্রেমে বন্দি করতেন মানুষের বিশেষ মুহূর্ত। এমনকি তখনকার দিনে মা-বাবা ছেলেদেরও এ পেশায় খুব একটা সমর্থন দিতে চাইতেন না। সেখানে সাইদা খানম এই চ্যালেঞ্জিং পেশায় স্বনামে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
ফটোগ্রাফি অন্তর্মুখী বা ঘরমুখী পেশা নয়; বহির্জগতেই এর প্রধান বিচরণ। বাইরের সব প্রতিকূলতা সামলে প্রেস ফটোগ্রাফি থেকে শুরু করে আলোকচিত্রের নানা শাখায় বিচরণ করেছেন তিনি। ছবি তোলার সময় মানুষের ছোড়া ঢিল থেকে শুরু করে সমাজের কটূক্তিও সহ্য করতে হয়েছে তাঁকে।
খুব অল্প বয়সেই ক্যামেরার প্রতি আকর্ষণ তৈরি হয় সাইদা খানমের। তাদের পাবনার বাড়িতে প্রায়ই বক্স ক্যামেরা নিয়ে ফটোগ্রাফার এসে তাঁর খালার এবং পরিবারের ছবি তুলতেন। তখনও তিনি জানতেন না, একদিন তিনি নিজেই এ পেশা গ্রহণ করবেন।
১৩-১৪ বছর বয়সে তিনি ছবি তোলা শুরু করেন। কিশোরী সাইদা খানমের প্রথম ছবিটি ছিল বক্স ক্যামেরায় তোলা কলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সামনে এক কাবুলিওয়ালার। প্রথমদিকে তিনি ছবি তুলতেন একটি বক্স ক্যামেরায়। পরে তাঁর বোন হামিদা খানম যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে গিয়ে তাঁর জন্য একটি রোলিকর্ড ক্যামেরা নিয়ে আসেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকার এক প্রদর্শনীতে তিনি এই ক্যামেরায় তোলা ছবি নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি জার্মানি থেকে আন্তর্জাতিক ফটোগ্রাফি পুরস্কার অর্জন করেন।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, বরং বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত অন্যদের ছবি, টিউটোরিয়াল এবং আলাপচারিতার মধ্য দিয়েই তিনি ছবি তোলার আদ্যোপান্ত শিখেছিলেন। গোলাম কাসেম ড্যাডি ও মনজুর আলম বেগের মতো গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রীদের সান্নিধ্য এবং তাদের কাছ থেকে উৎসাহ ও পরামর্শও পেয়েছিলেন তিনি। মাত্র ১৯ বছর বয়সে তিনি বেগম পত্রিকার (পূর্ব বাংলার প্রথম সচিত্র নারীদের সাপ্তাহিক) ফটোসাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
তিনি অনেক বিশ্বখ্যাত ব্যক্তির ছবি তুলেছেন– রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ, মহাকাশচারী মাইকেল কলিন্স, এডউইন অলড্রিন ও নিল আর্মস্ট্রং, মাদার তেরেসা, শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, কাজী নজরুল ইসলাম, জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, অড্রে হেপবার্ন, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন প্রমুখ রয়েছেন এ তালিকায়।
ফটোগ্রাফির পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা করতেন। তাঁর ছোটগল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে– ‘ধুলোমুঠি’, ‘উপন্যাসত্রয়ী’, ‘আমার চোখে সত্যজিৎ রায়’ এবং আত্মজীবনী ‘স্মৃতির পথ বেয়ে’।
সাঈদ খানম ১৯৭৩ সালে কলকাতায় অল ইন্ডিয়া ফটোজার্নালিজম কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে অংশ নেন। সত্যজিৎ রায় ও মাদার তেরেসাকে নিয়ে তাঁর একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৯ সালে তিনি একুশে পদক পান।
অনেকের মতো সাইদা খানমকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে আমার। তিনি যেমন বিনয়ী, স্বল্পভাষী; তেমনি ছিলেন শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের অধিকারী। মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতা ছিল অসামান্য। সম্ভবত এ কারণেই তিনি বিখ্যাত সব মানুষের কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন এবং তাদের ব্যক্তিগত পরিসরে গিয়ে বিশেষ মুহূর্ত ধারণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ এবং সত্যজিৎ রায় ছিলেন অন্যতম।
বেগম পত্রিকার প্রচ্ছদসহ অন্যান্য পত্রিকায় তিনি তুলে ধরেছেন নারীর সক্রিয় উপস্থিতি। শহর থেকে গ্রাম, খ্যাতিমান থেকে সাধারণ– সবাই তাঁর ছবিতে জায়গা পেয়েছেন। তবে তাঁর ছবির নারী চরিত্রগুলো একদিকে রোমান্টিক, আবেগপ্রবণ, বিষণ্ন, অন্যদিকে সংগ্রামী ও স্বাধীনচেতা।
সাইদা খানম ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন। জীবদ্দশায় তাঁর কাজ নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা বা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অধ্যায়ের সমাপ্তি যেন! সাইদা খানমের ব্যক্তিগত সংগ্রহের অনেক ছবি এখনও অনাবিষ্কৃত। তিনি রেখে যাওয়া আলোকচিত্র ও গ্রন্থগুলোতেই বেঁচে থাকবেন; যা তাঁকে নিয়ে আমাদের গবেষণার রসদ জোগাতে পারে।
শ্রুতিলিখন: শাহেরীন আরাফাত
