ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ৩০ বছর

বাস্তবতা বদলায়নি আজও

বাস্তবতা বদলায়নি আজও
×

দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় স্মৃতিস্তম্ভ ‘ইয়াসমিন সরণি’

সোহানা আহমেদ

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৫ | ০০:৪৯ | আপডেট: ২৮ আগস্ট ২০২৫ | ১৩:৫৬

১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট মাকে দেখার জন্য বাসে করে ঢাকা থেকে দিনাজপুরে বাড়ি ফিরছিলেন কিশোরী গৃহকর্মী ইয়াসমিন। ২৪ আগস্ট রাত ৩টার দিকে দিনাজপুরের দশমাইল মোড়ে নামেন ইয়াসমিন। বাসের সুপারভাইজার দশমাইল মোড়ে স্থানীয় ব্যক্তিদের জিম্মায় কিশোরী ইয়াসমিনকে দিয়ে যান। এর কিছুক্ষণের মধ্যে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানার টহল পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যান সেখানে আসে। তারা শহরে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যান ইয়াসমিনকে। এরপর পুলিশ ভ্যানের মধ্যেই কিশোরী ইয়াসমিনকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। তার মরদেহ রাস্তার পাশে ফেলে পালিয়ে যায় পুলিশ সদস্যরা।

ঘটনা জানাজানি হলে বিক্ষুব্ধ জনতা দিনাজপুর শহরের রাস্তায় প্রতিবাদ মিছিল বের করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তৎকালীন পুলিশ প্রশাসন হত্যা ও ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে ইয়াসমিনকে ‘যৌনকর্মী’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। বিক্ষোভের এক পর্যায়ের ২৭ আগস্ট দিনাজপুরে পুলিশের গুলিতে কাদের, সামু, সিরাজসহ সাতজন নিহত হন। ১৯৯৭ সালে রংপুর বিশেষ আদালত ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ২০০৪ সালে দিনাজপুর কোতোয়ালি পুলিশের তৎকালীন এএসআই ময়নুল ইসলাম, কনস্টেবল আব্দুস সাত্তার ও চালক অমৃত লালের ফাঁসি কার্যকর হয়। 

ইয়াসমিন নারী নির্যাতন প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। ২৪ আগস্টকে ঘোষণা করা হয় ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস।

১৯৯৫ থেকে ২০২৫– এই ৩০ বছরে আমরা কোথায় পৌঁছালাম? ২০১৩ সালে জাতিসংঘ ১৮ বছর থেকে ৪৯ বছর বয়সী বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় এক লাখ পুরুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছিল। এর ফলাফল ছিল বেশ অদ্ভুত– সাক্ষাৎকারে প্রায় ২৫ শতাংশ পুরুষ স্বীকার করেছেন, তারা জীবনে একবার না একবার হলেও একজন নারীকে ধর্ষণ করেছেন। দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষ জীবনে কখনও কোনো ধরনের আইনগত কোনো বিচারের সম্মুখীন হননি। 

আমাদের স্মরণশক্তি খুব কম। কখনও কখনও ‘বাঙালি খুব আবেগপ্রবণ জাতি’ ইত্যাদি বলে আমরা হয়তোবা এটিকে এড়িয়ে যাই। ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের পর গণমাধ্যম যে সাহসী ভূমিকা দেখিয়েছিল, সেই সাহস কি এই সময়ে কোনো গণমাধ্যম দেখাতে পারছে? কৌশলগত উন্নতি হলেও গণমাধ্যমের নৈতিক অবস্থান নিম্নগামী হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতি হয়েছে, সেটি আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা প্রতিনিয়তই তা দেখতে পাচ্ছি। খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের খবরে দেখতে পাচ্ছি। অনলাইনে ভাইরাল হচ্ছে, ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে–দলবেঁধে নারীর কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। লোকজন ভিডিও করছে। অনেক গণমাধ্যম এবং বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের বক্তব্যে পাল্টা নারীর বিরুদ্ধে দোষ চাপাতে দেখা যায়।

সমাজে ধর্ষকামী লোকটি সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠতে পারে না। পরিবারে ছোটবেলায় এক ধরনের প্রশ্রয় দেওয়া থেকে যেন সে ধরেই নেয় যে জন্মগত কারণে নারীর চেয়ে মহৎ। ওভাবেই সে বড় হতে হতে ভালো-মন্দের পার্থক্যটা বুঝতে পারে না। শিশুর চিন্তার বিকাশে পরিবারের একটা বড় ভূমিকা আছে। সেই সঙ্গে পারিপার্শ্বিকতাও অনেক সময় নির্ধারক হয়ে ওঠে। 

কেউ যদি তাঁর ছেলেকে মানুষ হয়ে উঠতে না শেখান, তাহলে তাঁর মেয়েটিও কিন্তু অন্য কোথাও নিরাপদে থাকবে না। এ কাজটা ঘরে ঘরে মা-বাবাকেই শুরু করতে হবে। তাদের ছেলেকে বোঝাতে হবে, চিরাচরিত যে পুরুষতান্ত্রিক প্রথার বাইরে আসতে শেখাতে হবে। পুরুষের যে ইগো কাজ করে, তার মূল কাজ নারীকে অবদমিত রাখা। ধর্ষণের ক্ষেত্রে এটি একটা বড় কারণ। এই পুরুষ ইগো থেকে বের হওয়ার পথ বের করাটা জরুরি। এক সরকার যায় আরেক সরকার আসে; কিন্তু এই মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের দিকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা জরুরি। দরকার শিক্ষার আমূল পরিবর্তন, যেখানে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার অবস্থান থাকবে, তেমনি থাকবে লিঙ্গীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে শরীর সম্পর্কে জ্ঞান বা সেক্স এডুকেশন। এর মধ্য দিয়ে অল্প বয়সী ছেলেমেয়েরা নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হবে। সেই সঙ্গে স্পর্শের ভালো-মন্দ বুঝতে পারবে।

ধর্ষণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে সামাজিক আন্দোলন আকারে গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই কেবল এর বিরুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত অর্জন সম্ভব। তবেই আমরা সামনে এগোতে পারব। নয়তো যেই তিমিরে ছিলাম, সেই তিমিরেই থেকে যাব।

লেখক: উন্নয়নকর্মী

আরও পড়ুন

×