ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নারীর মধ্যে বিষণ্নতার হার বেশি

নারীর মধ্যে বিষণ্নতার হার বেশি
×

কামাল চৌধুরী

কামাল চৌধুরী

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৬ | আপডেট: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:২১

আমাদের সমাজের সামাজিক রীতিনীতি অনুযায়ী একজন নারীকে তাঁর বিয়ের পর নিজের বাড়ি, অর্থাৎ বাবা-মায়ের বাড়ি ছেড়ে স্বামীর বাড়িতে বা শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে বসবাস করতে হয়। নারীর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মেয়েদের যতই তাঁর বাবা-মা মানসিকভাবে প্রস্তুত করুক না কেন যে তাঁকে একদিন শ্বশুরবাড়ি বা স্বামীর বাড়িতে যেতে হবে, বিষয়টি বাস্তবে যখন ঘটে তখন থেকেই এক ধরনের চাপে পড়ে যায় মেয়েটি। নতুন পরিবেশ, নতুন সংসার, নতুন একজন মানুষের সঙ্গে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাতে যাচ্ছে। এটি মানিয়ে নেওয়া খুব সহজ নয়।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিয়ের পর নিজের বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্যও শ্বশুর-শাশুড়ি বা স্বামীর অনুমতি লাগে। অনেক সময় তা পছন্দ করাও হয় না। মেয়েটিকে বোঝানো হয়, ওটি তোমার বাড়ি না, এটিই তোমার বাড়ি। প্রতিনিয়ত মেনে নেওয়া, মানিয়ে নেওয়া– সবকিছু মিলে সামাজিক-মানসিক চাপ তৈরি হয়। 

আবার যদি স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বা পরিবারের অন্য কারও সঙ্গে বনিবনা না হয়, এ অবস্থাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলতে পারে। মেয়েটি স্বামীর বাড়িতে যাবে–এটি আমাদের সামাজিক রীতি, কোনো সন্দেহ নেই। এর বিপরীতটা খুব একটা দেখা যায় না যে বিয়ের পর ছেলে তাঁর স্ত্রীর বাড়িতে এসে থাকছে। সামাজিক চোখেও এটি তেমন ইতিবাচকভাবে নেওয়া হয় না। 

সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি, নারীর দিক থেকে ডিভোর্সের হার অনেক বেড়ে গেছে। এ বিষয়ে অনেক ধরনের কথাবার্তা, লেখালেখি চলছে–নারীরা কেন বেশি ডিভোর্স দিচ্ছে? নারীরা কি বেশি স্বাধীনচেতা হয়ে যাচ্ছে? এ বিষয়ে সমাজ অনেককেই খুব বাঁকা চোখে দেখছে এবং নারীর প্রতি দোষের দিকটা ছুড়ে দিচ্ছে। আমাদের পরিবর্তিত সমাজে নারীরা এখন আগের মতো অসহায় নয়।

শিক্ষা খাত বা জাতীয় পর্যায়ে পরীক্ষায় নারীরা পুরুষের চেয়ে এগিয়ে। পরবর্তী সময়ে হয়তো চাকরিজীবনে পিছিয়ে যাচ্ছে। কারণ, নারীরা চাকরি করবে কী করবে না, তা অনেক সময় বিয়ের পর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ি বা পরিবারের অন্য সদস্যরা ঠিক করেন। তারা অনেক সময় সিদ্ধান্ত দিয়ে দিচ্ছেন, ছেলের বউয়ের চাকরি করার প্রয়োজন নেই। এটি নারীর মধ্যে অনেক সময় হীনম্মন্যতা তৈরি করে। 

এটি মানতেই হবে সামাজিক অনেক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। আর্থিক নিশ্চয়তার অভাব তৈরি হচ্ছে। নিরাপত্তার অভাব তৈরি হচ্ছে। সন্তানদের মানুষ করার যে নিরন্তর চেষ্টা, সেখানে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। নারীর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য, সেটিও কিছুটা তাদের মানসিক চাপ বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে মানুষ সবচেয়ে বেশি যে মানসিক রোগে আক্রান্ত, সেটি হলো বিষণ্নতা। এ রোগে নারী পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি ভুগছে। ২০১৮-১৯ সালের ওই সমীক্ষা অনুযায়ী, গুরুতর মাত্রার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় (প্রাপ্তবয়স্ক) ভুগছে ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে নারী ১৯ ও পুরুষ ১৫ শতাংশ। 

সব মিলিয়ে নারী ভালো নেই, তাদের সাপোর্ট সিস্টেম দুর্বল। তাদের অনেক সময় অনেক কিছু মানিয়ে নিতে হয়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হলে অনেক সময় শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনও মেনে নিতে হয়, যা তাদের মানসিক অসুস্থতার জন্য অনেকাংশে দায়ী। 

লেখক: অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×