ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

দলিত নারীর দারিদ্র্য বহুমাত্রিক

দলিত নারীর দারিদ্র্য বহুমাত্রিক
×

শিক্ষা-চিকিৎসা পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার দলিত নারী

বাসন্তী সাহা

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫১ | আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘‘দলিত কলোনিগুলোয় মেয়েদের জন্মই হয় বিয়ে ও বাচ্চা হওয়ার জন্য। মেয়েরা প্রাইমারি গণ্ডি পেরোলেই বিয়ে দিতে হয় তাদের। আমার ২৩ বছর বয়সে বিয়ে হয়, তখন আমি ছিলাম গণকটুলি কলোনির সবচেয়ে ‘বুড়ো মেয়ে’। আমি যাদের পড়াতাম, তাদের অনেকের তখন বিয়ে হয়ে গেছে।” কথাগুলো বলছিলেন করুণা রানী দাস। 

বিয়ের পর মিরপুর রবিদাসপাড়ায় থাকেন করুণা। ইডেন কলেজ থেকে স্নাতক করা করুণা বলেন, ‘বিয়ের পর এক বছর দেরি হয়েছিল বাচ্চা হতে। তখনই শ্বশুরবাড়ির লোকজন বলতে শুরু করেছিল, বয়স্ক মেয়ে, লেখাপড়া জানা মেয়ে, বাচ্চা হবে না।’ তারপর দুই বাচ্চার মা হয়ে চাকরি ছেড়ে ‘সংসারী’ হয়েছেন করুণা। লেখাপড়া শিখে ঘরের চৌকাঠ পেরোনোর যে সূচনা করেছিলেন, সেই চৌকাঠেই আটকে আছেন এখনও। তিনি বলেন, ‘জীবনে একটা দিনও মনে করতে পারি না, যেদিন পরিবারে, কলোনিতে বা বাইরে খারাপ কথা শুনতে হয়নি আমাকে। জীবনে কোনোদিন স্কুলে যেতে পারিনি। একটা শব্দও লিখতে পারি না। কিন্তু আজ খুব ইচ্ছে করে পড়তে, লিখতে। আমার মতো আরও নারী আছেন আমাদের কলোনিতে, যারা আজ লেখাপড়া শিখতে চান।’ কথাগুলো চিটাগং রোডের সিটি কলোনির সুমিতা রানীর। যুগ যুগ ধরে জাতপাত-অস্পৃশ্যতার কাছে হেরে যাওয়া মানুষদের একজন তিনি। 

জন্ম ও পেশাগত কারণে বৈষম্যের অস্পৃশ্যতার শিকার জনগোষ্ঠী দলিত হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশে এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬৫ লাখের মতো। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক মানুষ দলিত নারী, যারা পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কারণে দলিত সমাজের মধ্যেও সবচেয়ে কম সুযোগ পেয়ে নিম্নস্তরে বসবাস করছে। ফলে তারা একজন দলিত পুরুষের তুলনায় অধিকতর সহিংসতা ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সম্পদে মালিকানা না থাকা তাকে একেবারে প্রান্তিক করে ফেলেছে। ফলে সে বাইরের সমাজে অস্পৃশ্য ও নিজেদের অধিকারহীন, ক্ষমতাহীন নারী, বিয়ে আর সন্তান উৎপাদনই যার অমোঘ পরিণতি। 

সমাজ ও সভ্যতা এগিয়ে চলেছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের ছোঁয়ায় মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে। শিক্ষার বিস্তারও হয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু কুসংস্কার, কূপমণ্ডূকতা কমেনি। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবিদ্বেষও কমছে না। কিছু কিছু প্রথাগত ও কাঠামোগত বঞ্চনার কারণে দলিতরা উপেক্ষিত হয়েই থাকছে। যেমন জাতপাতনির্ভর সমাজ ব্যবস্থার কারণে দলিত নারীরা কলোনিগুলোয় এক ধরনের বিচ্ছিন্ন জীবন কাটায়। কারণ, মূল স্রোতের মানুষ তাদের অস্পৃশ্য বলে মনে করে। সমাজের মূল স্রোতের মানুষের কোনো উৎসব-পার্বণে তারা অংশগ্রহণ করতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের সব অধিকার থেকে যুগের পর যুগ বঞ্চিত থাকার ফলে দলিত নারীদের অশিক্ষা, অপুষ্টি, বাল্যবিয়ে ও নানা রকম পারিবারিক কুসংস্কার ঘিরে রাখে, যা দলিত নারীদের দলিত হিসেবে ও নারী হিসেবে দুইভাবে বঞ্চিত করে। 

দলিত নারীর দারিদ্র্যও বহুমাত্রিক। নিজের কোনো আয় না থাকার কারণে দরিদ্র, অধিকার ভোগ করতে না পারার কারণে দরিদ্র আর সংসারে বা নিজের জীবনের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে দরিদ্র। এমনকি প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা থেকেও তারা বঞ্চিত। মা ও শিশু ক্লিনিক এবং সরকারি হাসপাতালগুলোয় যদিও সবার জন্য সমান স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে, কিন্তু সেখানেও এই নারীরা যেতে পারেন না। যেতে পারেন না দুটো কারণে। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নারীর স্বাস্থ্য সমস্যাকে উপেক্ষা করে এবং হাসপাতাল বা ক্লিনিকের ডাক্তার ও অন্যান্য কর্মীর অসহযোগিতা ও আচরণ তাদের সেবার জন্য যেতে নিরুৎসাহিত করে। 

লেখক: কান্ট্রি ফোকাল পয়েন্ট-বাংলাদেশ, এশিয়া দলিত রাইটস ফোরাম-এডিআরএফ

আরও পড়ুন

×