‘নিরাপদ নগরী, নির্ভয় নারী’
‘ইকোজ অব হার লাইফ’ নাটকের দৃশ্য
হিল্লোল চৌধুরী
প্রকাশ: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৩ | আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৭:২৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ ২৬ নভেম্বর কেবল বিনোদনের কেন্দ্র ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদের এক জীবন্ত মঞ্চ। কুয়াশাচ্ছন্ন নভেম্বরের সকালে একদল নারী শোনালেন তাদের সাহসিকতার গল্প। ‘স্টোরিজ অব কারেজ’ শীর্ষক এ পারফরম্যান্সে উঠে এলো নারীর জীবনের নানা বাধার কথা। তার চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে ধরা দিল তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য স্পৃহা। এ পরিবেশনার মধ্য দিয়েই একশনএইড বাংলাদেশ শুরু করে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে ১৬ দিনব্যাপী বিশেষ প্রচার অভিযান। ‘নিরাপদ নগরী, নির্ভয় নারী’–এই স্লোগানকে সামনে রেখে নারী ও কন্যাশিশুর জন্য একটি ভীতিমুক্ত শহর গড়ার প্রত্যয়ে শুরু হয়েছে এবারের আয়োজন।
মঞ্চে যখন জীবনের প্রতিধ্বনি
বাইরের প্রাঙ্গণ পেরিয়ে চিত্রশালা মিলনায়তনে যখন ‘ইকোজ অব হার লাইফ’ নাটকটি মঞ্চস্থ হচ্ছিল, তখন দর্শকদের গ্রাস করেছিল পিনপতন নীরবতা। গণপরিবহনে গাঘেঁষে দাঁড়ানো অপরিচিত হাত, ভিড়ের মধ্যে অশালীন স্পর্শ কিংবা পাবলিক স্পেসে নারীর প্রতিনিয়ত কুঁকড়ে যাওয়া–নাটকের প্রতিটি দৃশ্য যেন উপস্থিত দর্শকদের নিজেদের অভিজ্ঞতারই প্রতিধ্বনি। এটি কেবল অভিনয় ছিল না। ছিল সমাজকে আয়না দেখানোর এক সাহসী প্রয়াস।
পরিসংখ্যানের আয়নায় উদ্বেগজনক চিত্র
আবেগের পাশাপাশি আলোচনায় উঠে এলো কঠিন বাস্তবতা। একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির পরিসংখ্যানের মাধ্যমে পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। ‘নিরাপদ নগরী’ ক্যাম্পেইনের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ ও ২০২২ সালে অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েছে ৬৩ শতাংশ। এর নেতিবাচক প্রভাবে ৪২ শতাংশ নারী নিজেদের অনলাইন জগৎ থেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ভার্চুয়াল জগতের বাইরের চিত্রটিও ঠিক তেমনই উদ্বেগজনক। ফারাহ্ কবির জানান, ‘৬৩ শতাংশ নারী আজও ভয় বা আশঙ্কা নিয়ে ঘরের বাইরে পা রাখেন। গণপরিবহনে নিয়মিত হয়রানির শিকার হন ২২ শতাংশ নারী।’ তিনি স্পষ্ট করেন, প্রশ্রয় এবং জবাবদিহির অভাবেই এই সহিংসতা ক্রমেই ডালপালা মেলছে।
বিচারহীনতা ও সাংস্কৃতিক সহিংসতা
সহিংসতা কেন থামছে না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক এর জন্য ‘কালচারাল ভায়োলেন্স’ বা সাংস্কৃতিক সহিংসতা মেনে নেওয়ার প্রবণতাকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘‘সমাজের মানুষকে ‘নীরব সাক্ষী’র ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে।’’
অন্যদিকে, ইউএনডিপির জেন্ডার টিম লিড শারমিন ইসলাম আঙুল তোলেন বিচারহীনতার সংস্কৃতির দিকে। তাঁর মতে, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তাই অপরাধীকে বেপরোয়া করে তোলে। তাই পাঠ্যক্রমে জেন্ডার সংবেদনশীলতা অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে একদম গোড়া থেকেই মানসিকতা পরিবর্তনের ওপর জোর দেন তিনি।
নীতি ও নৈতিকতার মেলবন্ধন
কেবল সমস্যা নয়, আলোচনায় উঠে এসেছে সমাধানের পথ। বক্তারা একমত হন, এই লড়াইয়ে পুরুষদেরও সহযোগী হিসেবে পাশে প্রয়োজন। মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ড. প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, ‘পুরুষ ও ছেলেদের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও সংস্কারের মাধ্যমে পাশে না রাখতে পারলে সহিংসতা কমবে না।’
নগর পরিকল্পনায় নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন ঢাকা (উত্তর) সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ এস এম শফিকুর রহমান। আইনের প্রয়োগ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-পুলিশ কমিশনার মোছা. ফারহানা ইয়াসমিন আশ্বাস দেন, থানায় নারী পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি নাগরিকদের প্রতি দ্রুত রিপোর্ট করার আহ্বান জানান।
আগামীর পথচলা
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র নির্মাতা ফখরুল আরেফিন খান, সরকারি নীতিনির্ধারক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি প্রমাণ করে, এই দাবি এখন আর একক কোনো গোষ্ঠীর নয়। একশনএইড বাংলাদেশের উইমেন রাইটস অ্যান্ড জেন্ডার ইকুইটি টিমের প্রধান মরিয়ম নেছা জানান, এ প্রচার অভিযান চলবে আগামী ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
আয়োজকদের প্রত্যাশা–দেশের বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়বে এই আন্দোলনের ঢেউ। লক্ষ্য একটাই–এমন একটি নগরী গড়ে তোলা; যেখানে কোনো নারীকে ভয়ে সংকুচিত হতে হবে না; যেখানে তিনি হাঁটবেন মাথা উঁচু করে, নির্ভয়ে। এ আয়োজন সেই স্বপ্নের পথেই একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
- বিষয় :
- নারী
- হিল্লোল চৌধুরী
- নারী নির্যাতন প্রতিরোধ
