ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

৫৬ বছর ধরে নারী আন্দোলনের বন্ধুর পথচলা

৫৬ বছর ধরে নারী আন্দোলনের বন্ধুর পথচলা
×

ডা. ফওজিয়া মোসলেম, ২০২১ সাল থেকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন

দ্রোহী তারা

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:১২ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২৬ | ১৯:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসকে যদি একটি দীর্ঘ, বহমান নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়, তবে তার উৎসধারা খুঁজে পাওয়া যাবে বঞ্চনা, সংগ্রাম ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার গভীর গিরিখাতে। সেই নদী কখনও শান্তভাবে প্রবহমান নয়; বরং প্রবল স্রোতে বারবার ভেঙেছে সামাজিক অনুশাসন ও পিতৃতান্ত্রিক শৃঙ্খলের পাষাণ প্রাচীর। আজ সেই নদী এসে দাঁড়িয়েছে এমন এক মোহনায়, যেখানে যুগান্তকারী অর্জন ও তীব্র প্রতিক্রিয়া পাশাপাশি অবস্থান করছে। এই দীর্ঘ ও বন্ধুর পথের এক অবিচ্ছেদ্য নাম ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ’। ১৯৭০ সালে কবি ও নারী আন্দোলনের অবিসংবাদিত অগ্রদূত বেগম সুফিয়া কামালের হাত ধরে যার পথচলা শুরু।

এই আন্দোলনের মূল দর্শন দাঁড়িয়ে আছে মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার সেই চিরন্তন বাণীর ওপর–‘মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও অধিকারে সমান’। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের বৈষম্যহীনতা ও ন্যায়বিচারের আদর্শ বুকে ধারণ করে নারী মুক্তি ও সমতার সংগ্রামকে তারা এগিয়ে নিয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। কিন্তু এই পথ কখনোই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বর্তমান সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম যখন তাঁর দীর্ঘ পথচলার স্মৃতিচারণ করেন, তখন ভেসে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সামাজিক মনস্তত্ত্বের ছবি। ছাত্রজীবন শেষে তিনি যখন আন্দোলনে যুক্ত হন, নারী আন্দোলন তখনও কোনো সুসংগঠিত রূপ পায়নি; বরং তা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু সমাজকল্যাণমূলক উদ্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

তৎকালীন সমাজে নারীর জন্য নির্ধারিত ভূমিকা ছিল ছকে বাঁধা–একজন আদর্শ গৃহিণী, একজন ‘ভদ্র’ নাগরিক, বড়জোর কিছু দাতব্য কাজে অংশগ্রহণকারী। কিন্তু সেই নিশ্ছিদ্র কাঠামোর ভেতরে নারীর অধিকার, তাঁর স্বতন্ত্র মানবিক সত্তা কিংবা রাষ্ট্রের একজন পূর্ণাঙ্গ নাগরিক হিসেবে তাঁর স্বীকৃতির প্রশ্নটি ছিল প্রচণ্ডভাবে অনুপস্থিত। ফওজিয়া মোসলেম স্মরণ করেন, সেই সময়কার সবচেয়ে বড় এবং কঠিন কাজটি ছিল নারীদের এই সহজ অথচ মৌলিক সত্যটি বোঝানো যে, ‘মানুষ হিসেবে তাদেরও নিজস্ব অধিকার আছে।’

অধিকারের এ প্রাথমিক সচেতনতার বীজই পরবর্তী সময়ে বিশাল মহিরুহ হয়ে আন্দোলনের শক্ত ভিত গড়ে দেয়। সময়ের পরিক্রমায় এ আন্দোলন এক অভাবনীয় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে গেছে। একসময় যে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল কেবল ‘অধিকার সম্পর্কে ধারণা দেওয়া’, আজ তা পরিণত হয়েছে সেই অধিকারকে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি নীতিমালায় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে। ডা. ফওজিয়ার মতে, নারী আন্দোলনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন হলো এই মনস্তাত্ত্বিক উত্তরণ। আজকের নারী আর কেবল সচেতন নন; তিনি অধিকার দাবি করেন, বৈষম্যের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন তোলেন এবং নিজের প্রাপ্য আদায়ে দৃঢ় অবস্থান নেন। 

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু আন্দোলনের তৃণমূল পর্যায়ের যে বাস্তবতার কথা তুলে ধরেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি যখন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন মহিলা পরিষদ দেশব্যাপী বিস্তৃত। কিন্তু কাজের মূল চ্যালেঞ্জটা ছিল একদম শিকড়ে–সমাজের বদ্ধমূল মানসিকতা পরিবর্তনে। একসময় পারিবারিক সহিংসতাকে সমাজের বৃহত্তর অংশ ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবেই মেনে নিত। নারীর প্রতি সহিংসতা বা গায়ে হাত তোলা যেন ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এক অঘোষিত অধিকার। এই পাথরসম নীরবতা ভাঙা ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। মালেকা বানুর ভাষায়, ‘বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ শুরু থেকেই একটি বিষয়ে আপসহীন ছিল; সহিংসতা কোনোভাবেই নারীর প্রাপ্য নয়, এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।’

এই অবস্থান শুধু কোনো নীতিগত বুলি ছিল না; বরং তা ছিল সামাজিক চেতনার ক্যানভাসে এক প্রবল আলোড়ন। আশির দশক থেকেই সংগঠনটি পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি পরিবারে সংলাপ, সচেতনতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসে। ২০১০ সালে দেশে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন’ প্রণয়নের পেছনে এই দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে।

একই সঙ্গে, সমাজের বুকে একটি দুঃসাহসী বার্তা দেওয়া হয়েছিল–যদি একটি সম্পর্ক ‘টক্সিক’ বা বিষাক্ত হয়ে ওঠে, তবে নিজের আত্মসম্মান ও জীবন বাঁচাতে সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পূর্ণ অধিকার নারীর রয়েছে। এই ধারণা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ডালপালা মেলেছে। আজকের প্রজন্মের নারীরা অনেক বেশি আত্মসচেতন। তারা মুখ বুজে অত্যাচার সহ্য করেন না, বরং আইনি সহায়তা চান এবং প্রয়োজনে একটি অস্বাস্থ্যকর সম্পর্কের শৃঙ্খল ছিন্ন করার সাহস দেখান।

গত ৫৬ বছরে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলনে যে অর্জনগুলো এসেছে–আইন প্রণয়ন, সম্পত্তিতে সমান অধিকারের দাবি, কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ, নারী শিক্ষায় অভাবনীয় অগ্রগতি তা নিঃসন্দেহে গৌরবময়। ইতিহাস সাক্ষী, যখনই সমাজে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলাতে শুরু করে, তখনই সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। নারী আন্দোলনের এই অগ্রগতি যত দৃশ্যমান হয়েছে, সমাজের গভীরে প্রোথিত পুরুষতন্ত্রের পাল্টা আঘাতও তত তীব্র হয়েছে।

বর্তমান বাস্তবতা বড়ই অদ্ভুত। একদিকে নারীরা হিমালয় জয় করছেন, মহাকাশ গবেষণায় যুক্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে সহিংসতার ধরন ও মাত্রা কমেনি, বরং এর রূপ বদলেছে। সাইবার বুলিং, অনলাইন হয়রানি থেকে শুরু করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি–সব মিলিয়ে নারী আন্দোলন আজ এক নতুন ও জটিল সন্ধিক্ষণে। এমনকি অর্জিত অধিকারগুলোকেও ধর্মের বা প্রথার অপব্যাখ্যা দিয়ে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক অশনিসংকেত সমাজে দেখা যাচ্ছে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের কৌশলেও এসেছে পরিবর্তন। এখন আর সব দাবির জন্য রাস্তায় নামতে হয় না, প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। তবে নগরজীবনের ব্যস্ততা, সময়ের সীমাবদ্ধতা এবং আর্থসামাজিক পরিবর্তনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠনের ধরনেও পরিবর্তন আনা জরুরি হয়ে পড়েছে।

নারী আন্দোলন কখনোই কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপের লড়াই ছিল না; এটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আইনজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, সাংবাদিক–সবাই মিলে যখন ‘ইউনিফর্ম সিভিল কোড’ বা অভিন্ন পারিবারিক আইনের মতো জটিল ইস্যুতে যৌথ আওয়াজ তোলেন, তখনই এই আন্দোলনের প্রকৃত শক্তি দৃশ্যমান হয়।

এই জটিল বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে ডা. ফওজিয়া মোসলেম মনে করেন, মাঠের লড়াইয়ের কোনো বিকল্প নেই; ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই হবে। অন্যদিকে, মালেকা বানু জোর দেন বৃহত্তর ঐক্যের ওপর। যারা এই অগ্রগতি রুখে দিতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে যেমন প্রতিরোধ গড়তে হবে, তেমনি যারা সমাজকে এগিয়ে নিতে চায়, তাদের সবাইকে নিয়ে একটি শক্তিশালী ও অভেদ্য জোট বাঁধতে হবে।

কারণ, সমাজের এক ডানা বেঁধে রেখে কোনো রাষ্ট্র কখনোই মুক্তির আকাশে উড়তে পারে না। অধিকার সচেতনতা থেকে দাবি, দাবি থেকে আইন প্রণয়ন এবং এখন সেই অধিকারকে জীবনের প্রতিটি স্তরে চর্চা করার যে বাস্তবতা–নারী আন্দোলনের এই দীর্ঘ পথচলা শেষ হয়নি। বরং বাংলাদেশের রূপান্তরের ইতিহাসে এটি এক নতুন, আরও চ্যালেঞ্জিং অধ্যায়ের সূচনা করেছে মাত্র।

আরও পড়ুন

×