ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

গারো পাহাড়ের লেবিনা থেকে ‘আনু’

গারো পাহাড়ের লেবিনা থেকে ‘আনু’
×

নিজের দোকানে লেবিনা কুবি

ইমতিয়াজ আহমেদ

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ০৭:২০ | আপডেট: ১৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:৪২

| প্রিন্ট সংস্করণ

আকাশে মেঘ করে আসা এক দুপুরে জামরুল গাছের নিচে বিষণ্ন মনে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল ছোট্ট মেয়েটি। তার দৃষ্টির সীমানাজুড়ে শুধুই গারো পাহাড়ের ঘন-গাঢ় সবুজ, যা গিয়ে মিশেছে মেঘলা দিগন্তে। ছোট্ট মেয়েটির নাম লেবিনা কুবি। সেদিন তার মন খারাপের কারণ ছিল–বড় বোন সুফলার বিয়ে। বাবার মৃত্যুর পর মা যখন সারাদিন মাঠে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতেন, তখন এ সুফলাই এগারো ভাইবোনের অভাবের সংসারে লেবিনাকে কোলেপিঠে করে বড় করেছেন। সেই খেলার সঙ্গী, পরম আশ্রয়ের বড় বোনটি বিয়ের পর স্বামীর হাত ধরে চলে যাবে টাঙ্গাইলের মধুপুরের গজারিচালা গ্রামে।

শেরপুরের ঝিনাইগাতীর ধানশাইল গ্রামের গারো পাহাড়ের পাদদেশ থেকে বড় বোনের এই বিদায় ছোট্ট লেবিনার বুকে গভীর শূন্যতা তৈরি করেছিল। কিন্তু রক্তের টান বড় অদ্ভুত। বিয়ের পর মধুপুরের জঙ্গলে জুমের নতুন ফসল তোলার উৎসবে যখন চারপাশ মাতোয়ারা, তখন বড় বোনের মন কাঁদছিল ফেলে আসা ছোট্ট বোনটির জন্য। অন্যদিকে বড় বোনের অপেক্ষায় রোজ পথ চেয়ে থাকত লেবিনা। অবশেষে একদিন সুফলা ও তাঁর স্বামী লিও চিচাম ঝিনাইগাতীতে বেড়াতে এসে লেবিনাকে নিজেদের কাছে মধুপুরের গজারিচালায় নিয়ে আসেন। ভর্তি করে দেন স্থানীয় দর্গাচালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বড় বোনের স্নেহছায়াতেই শুরু হয় লেবিনার নতুন জীবন।

প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে লেবিনা ভর্তি হন নেদুবাজার হাইস্কুলে। পাহাড়ি দুর্গম পথ মাড়িয়ে প্রতিদিন ছোট্ট একটি বাইসাইকেলে চড়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে স্কুলে যেতেন তিনি। ছাত্রাবস্থাতেই নিজের পায়ে দাঁড়ানোর এক প্রবল জেদ চেপে বসেছিল তাঁর মনে। পড়াশোনার খরচ জোগাতে কাজ করেছেন সিসিমপুর প্রকল্পে; যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় এনজিওর কাজে। অভাব নামক দানবটি একসময় তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এসএসসি পর্যায়ে এসে বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা।

২০১০ সাল। অল্প বয়সেই মিনস চিরানের সঙ্গে লেবিনার বিয়ে হয়। স্বামীর ঘরে মাথা গোঁজার জন্য এক টুকরো জমি ছাড়া আর কোনো সম্বল ছিল না। মূলত লেবিনার জীবনের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা শুরু হয় তখন থেকেই। স্বামীর একার রোজগারে যখন কোনোভাবেই সংসারের চাকা ঘুরছিল না, লেবিনা তখন আবারও এনজিওতে কাজ শুরু করেন।

মধুপুর উপজেলার একেবারে সীমান্তবর্তী গ্রাম গজারিচালা। রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য– সব ক্ষেত্রেই অবহেলিত এক জনপদ। এই পিছিয়ে পড়া গ্রামের নারীদের কাছে ধীরে ধীরে এক আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন লেবিনা। নিজের মেধা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি গ্রামের নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ নানা বিষয়ে পরামর্শ দিতে শুরু করেন। তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে থাকেন। বিয়ের পর প্রথম সন্তানের মা হন লেবিনা। সংসারের খরচ বাড়ে। রোজগার বাড়ানোর তাগিদে চাকরি ছেড়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন একটি দোকান দেওয়ার। পুঁজি বলতে হাতে মাত্র ৫০০ টাকা। এক টুকরো পলিথিন টানিয়ে সামান্য কিছু সদাইপাতি নিয়ে গ্রামের প্রথম নারী দোকানি হিসেবে যাত্রা শুরু করেন তিনি।

গজারিচালা গ্রামের পাশেই সুবিশাল রাবার বাগান। প্রতিদিন অনেক পর্যটক এই পথ ধরে যাতায়াত করেন। কলা ও আনারস চাষিরা কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নিতে আসেন। লেবিনার দোকানে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে চায়ের আড্ডা আর বেচাকেনা। এরপর ধারদেনা করে ছোট্ট একটি ছাপরা ঘরে দোকানটিকে বড় করেন তিনি। চায়ের পাশাপাশি শুরু হয় মুদি মালের বিক্রি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। মাটির ঘর ভেঙে তুলেছেন টিনের ঘর। দুই সন্তান প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। হাঁস-মুরগির পাশাপাশি খামারে পালন করছেন গাভি। জমানো টাকায় স্বামীকে কিনে দিয়েছেন একটি মোটরসাইকেল। 

নিজের জীবনের পালাবদলের পাশাপাশি লেবিনা সাক্ষী হয়েছেন প্রকৃতির এক নির্মম পরিবর্তনের। স্মৃতির পাতা উল্টে তিনি বলেন, ‘প্রথম যেদিন এই গ্রামে পা রাখি, তখন দেখেছি শাল-গজারির গহিন বন। বাগডাশ, কালোমুখো হনুমান, বনবিড়াল, বন্য শূকর, বনমোরগ আর বিষাক্ত সাপখোপের অবাধ বিচরণ ছিল। জুমের আবাদেই সংসারের সারা বছরের খরচ চলে যেত।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি আরও বলেন, ‘২০০০ সালের পর থেকে শুরু হলো নির্বিচারে বন উজাড়। যে যেভাবে পারল গাছ কেটে জঙ্গল সাফ করে ফেলল। আমরা যে জমিতে জুম চাষ করতাম, প্রভাবশালীরা তা দখল করে নিল। একসময় এই গ্রামে অনেক আদিবাসী পরিবার ছিল, এখন আছে মাত্র ৫০ ঘরের মতো। তাদেরও ভিটেমাটি ছাড়া নিজস্ব কোনো জমি নেই, সবাই দিনমজুরি করে খায়।’

তবে এত হতাশার মধ্যেও আশার আলো দেখেন তিনি। জানান, গ্রামে শিক্ষার হার এখন বেড়েছে। অনেকেই সরকারি চাকরি করছেন। তবে রাস্তাঘাট আর স্বাস্থ্যসেবায় এখনও অনেক পিছিয়ে তারা। 

লেবিনার এই লড়াইয়ের সবচেয়ে মুগ্ধ দর্শক তাঁর বড় বোন সুফলা বলেন, ‘সে আমার খুব আদরের। নিজের সন্তানের মতো তাকে বড় করেছি। অভাবকে জয় করে আজ সে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, এটা দেখলে আমার খুব শান্তি লাগে।’

স্বামী মিনস চিরানও স্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ‘অনেক অভাবের সময় আমরা একসঙ্গে পার করেছি। যখন আমার হাতে কোনো কাজ ছিল না, তখন সে শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরেছে। ব্যবসা সামলানোর পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া থেকে শুরু করে সংসারের সব খোঁজখবর সে-ই রাখে।’

গজারিচালা গ্রামে লেবিনার দোকানটি আজ সবার কাছে ‘আনুর দোকান’ নামে পরিচিত। গারো ভাষায় ‘আনু’ শব্দের অর্থ ‘বোন’। অর্থাৎ এটি পুরো গ্রামের ‘বোনের দোকান’। গ্রামে ঢুকলেই সবার নজরে পড়ে আনুর দোকানের সাইনবোর্ড। সব ধর্ম, বর্ণ আর শ্রেণি-পেশার মানুষ এই দোকানে বসে চা পান করেন, গল্প জুড়ে দেন।

ঘরের চার দেয়ালে বন্দি না থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে নিজের ভাগ্য বদলানোর যে দৃষ্টান্ত লেবিনা স্থাপন করেছেন, তা সত্যিই বিরল। লেবিনাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের আদিবাসী মেয়েরা আজ হাইস্কুল ও কলেজে যাচ্ছে। অনেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্পের কাজ করছেন, কেউবা বিউটি পার্লারে কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

আরও পড়ুন

×