শ্রেণিকক্ষের মায়া ছেড়ে ধুলোমাখা পথে
ধূসর হয়ে পড়া বাংলাকে আদি সবুজে ফেরানোর তাগিদেই উদ্যোক্তা হন মেহেরুন নেছা শাহেলী
লাবণী মণ্ডল
প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৬ | ০৭:০৯ | আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ | ১০:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
পাহাড়ের কোলঘেঁষে থাকা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির এক ছিমছাম গ্রাম। প্রকৃতির এক অকৃত্রিম, সবুজে ঘেরা স্নিগ্ধ পরিবেশে বেড়ে উঠেছিলেন মেহেরুন নেছা শাহেলী। ছোটবেলা থেকেই মেধার দ্যুতি ছড়িয়েছেন। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সমাজের অন্যতম সম্মানজনক পেশা–শিক্ষকতা। কলেজের ইংরেজির প্রভাষক হিসেবে চোখের সামনেই সাজানো ছিল এক নিরাপদ, ছকবাঁধা জীবন। কিন্তু কিছু মানুষের জন্মই হয়তো হয় প্রচলিত ছক ভাঙার জন্য। আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে, জীবনের সেই সুরক্ষিত ও ‘নিরাপদ’ বৃত্তটি স্বেচ্ছায় ভেঙে ফেললেন শাহেলী। ব্ল্যাকবোর্ড আর চক-ডাস্টারের মায়া ছেড়ে তিনি নেমে পড়লেন বাংলার ধুলোমাখা পথে। মিশে গেলেন প্রান্তিক কৃষকদের ঘাম আর মাটির গন্ধের সঙ্গে।
তাঁর এই অভাবনীয় পথ পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল একটাই–মানুষের পাতে, বিশেষ করে আগামী প্রজন্মের জন্য ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দেওয়া। শাহেলীর ভাবনাটা ছিল খুবই স্পষ্ট ও দূরদর্শী, ‘শিক্ষকরা আমাদের সন্তানদের পড়াশোনায় শিক্ষিত করবেন আর আমি সেই সন্তানদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিরাপদ খাদ্যের জোগান দেব।’
তবে একজন নারীর জন্য এই পথচলা মোটেও কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। শিক্ষকতার মতো সম্মানজনক ও আর্থিকভাবে নিরাপদ পেশা ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়ানোকে পরিবার ও সমাজ সহজে মেনে নেয়নি। অনেকেই তাঁকে ‘পাগল’ আখ্যা দিয়েছেন। সমাজ ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন তুলেছে– একজন নারী হয়ে কেন পুরুষের মতো মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াতে হবে? কিন্তু তীব্র স্রোতের বিপরীতে একাই নৌকার হাল ধরেছিলেন শাহেলী। এই জেদ আর দায়বদ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় তাঁর স্বপ্নের উদ্যোগ–‘আহরোণ’। এই নামের পেছনের গল্পটি কেবল আবেগের নয়, বাংলার শিকড় আর খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি এক অসীম শ্রদ্ধার নিদর্শন। উদ্যোগের শুরুতে হারানো ঐতিহ্য খুঁজতে শাহেলী গিয়েছিলেন সুন্দরবনের গহিন অরণ্যে। সেখানে মধু সংগ্রহ করতে যাওয়া মৌয়াল আর প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে মিশতে গিয়ে তিনি খেয়াল করেন, তারা প্রমিত উচ্চারণে ‘আহরণ’ শব্দটি বলতে পারে না। আঞ্চলিকতার টানে তারা বলে–‘আহরোণ’। তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ যাকে ‘ভুল উচ্চারণ’ বলে তাচ্ছিল্য করবে, শাহেলী সেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর মুখের ভাষাকেই পরম মমতায় বুকে টেনে নিলেন। তাদের ঘাম আর শ্রমের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানের নাম রাখলেন ‘আহরোণ’।
‘আহরোণ’-এর কার্যক্রম বাজারের গতানুগতিক আর দশটা ব্যবসার মতো নয়; এটি মূলত একটি শুদ্ধতার আন্দোলন। শাহেলীর মূল লক্ষ্য– অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী খাবারগুলোকে ভেজালের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করে তাদের আদি স্বাদ ও পুষ্টিগুণে ফিরিয়ে আনা। যে অঞ্চলের যে পণ্যটি বিখ্যাত, সেটি সেখানেই নিজস্ব নিবিড় তত্ত্বাবধানে উৎপাদিত হয়। তিনি সরাসরি প্রান্তিক কৃষকদের কাছে যান, তাদের বোঝান কীভাবে রাসায়নিকমুক্ত প্রাকৃতিক আবাদ কৃষকের নিজের এবং সর্বোপরি সমাজের জন্য কল্যাণকর। যারা উদ্বুদ্ধ হন, তাদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ করে বাজারজাত করে ‘আহরোণ’। শীতের কুয়াশায় যশোরের ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড় উৎপাদন থেকে শুরু করে, বছরের চার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে খাঁটি মধু সংগ্রহ কিংবা নিজস্ব তত্ত্বাবধানে খাঁটি ঘি তৈরি–প্রতিটি ধাপে রয়েছে শাহেলীর সরব ও সজাগ উপস্থিতি।
দীর্ঘ সাত বছরের এই নিরলস পরিশ্রমে ‘আহরোণ’ আজ আস্থার এক অবিচল নাম। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কর্মী নিয়ে ২০ জনের একটি পরিবার এখন ‘আহরোণ’, যাদের মাসিক বিক্রি ছুঁয়েছে প্রায় ৮ লাখ টাকা। শাহেলীর ব্যবসায়িক দর্শন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ–‘সততা টিকে থাকে, সততা নিজেই কথা বলে।’ বাজারের অসুস্থ দামের প্রতিযোগিতায় তিনি নেই। তিনি বিশ্বাস করেন, ক্রেতাকে আগে আদি খাদ্যের প্রকৃত স্বাদ ও ঘ্রাণ চিনতে হবে। বাংলার আবহাওয়ায় কোন ঋতুতে খাবারের স্বাদ কেমন বদলায়, সে বিষয়ে তিনি গ্রাহকদের সচেতন করেন। যখন এই সততার সঙ্গে পণ্যের মানের হুবহু মিল পাওয়া যায়, তখন ক্রেতার আস্থা চিরস্থায়ী হয়।
এ স্বচ্ছতার কারণেই ‘আহরোণ’-এর ‘রিপিট কাস্টমার’ বা ফিরে আসা ক্রেতার হার অবিশ্বাস্যভাবে ৯৯ শতাংশ! মূলত স্বাস্থ্য সচেতন মানুষ, বিশেষ করে মায়েরা চোখ বন্ধ করে ভরসা করেন শাহেলীর ওপর। কারণ এখানে পণ্যের পাশাপাশি শতভাগ সঠিক তথ্যও সরবরাহ করা হয়।
মেহেরুন নেছা শাহেলী বর্তমানে এক সন্তানের জননী। কোলে নিজের ছোট্ট সন্তানকে নিয়েই তিনি নিরাপদ খাদ্যের সন্ধানে চষে বেড়াচ্ছেন বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সংসার, সন্তান আর ব্যবসা–সব মিলিয়ে এক চূড়ান্ত ব্যস্ত জীবন তাঁর। কিন্তু ক্লান্তি তাঁকে ছুঁতে পারে না। ফুলটাইম উদ্যোক্তা হিসেবে এই ছুটে চলাটাকে তিনি দারুণ উপভোগ করেন। কারণ এই ছুটে চলার জ্বালানি হলো দেশ, মাটি আর মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা।
একজন নারী, একজন মা এবং একজন স্বপ্নবাজ উদ্যোক্তা হিসেবে মেহেরুন নেছা শাহেলী আজ এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা। তিনি প্রমাণ করেছেন– বুকে সততা আর চোখে প্রবল সদিচ্ছা থাকলে, স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়েও বিজয়ের এক নতুন ইতিহাস রচনা করা যায়। ধূসর হয়ে পড়া বাংলাকে আদি সবুজে ফেরানোর এই লড়াইয়ে শাহেলী এক অপরাজিতা।
- বিষয় :
- লাবণী মণ্ডল
- উদ্যোক্তা
- নারী উদ্যোক্তা
