ঐতিহ্যের সীমানা পেরিয়ে ‘তন্তুর সাতকাহন’
নিজ হাতে তৈরি পণ্যের সঙ্গে সিনথিয়া জিম
আশরাফুল ইসলাম আকাশ
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:২১ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৮:১৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুশিকাটা বা ক্রোশেট বললেই আমাদের চোখে সাধারণত কী ভেসে ওঠে? ড্রয়িংরুমের সোফার কুশন কভার, টেলিভিশনের ঢাকনা, বিছানার চাদর কিংবা বড়জোর শীতের দিনে পরার জন্য উলের তৈরি গলাবন্ধনী। আমাদের দেশে কুশিকাটার কাজ মূলত এই গণ্ডির ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল দশকের পর দশক। একটু বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বিশ্ববিখ্যাত পপতারকা সেলেনা গোমেজ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোগুলোর র্যাম্পে মডেলরা অনায়াসে হেঁটে চলেছেন কুশিকাটার তৈরি আধুনিক টপস বা গাউন পরে।
পাশ্চাত্যের এ আধুনিক ফ্যাশন ট্রেন্ড দেখে অনেকের মতোই অনুপ্রাণিত হন সিনথিয়া জিম। তবে তিনি স্বপ্ন দেখলেন, বাংলাদেশে কুশিকাটার কাজকেও গতানুগতিক ধারা থেকে বের করে আনবেন। সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তি থেকেই জন্ম নেয় তাঁর উদ্যোগ–‘তন্তুর সাতকাহন’।
গল্পের শুরুটা সিনথিয়া জিমের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগে। পুঁজি বলতে ছিল টিউশনি করে জমানো সামান্য কিছু টাকা। সেই টাকা পকেটে নিয়েই তিনি চলে যান মিরপুর-১০ নম্বরের সুতার বাজারে। কিনে আনেন প্রাথমিক কিছু সুতা আর কুশিকাটার হুক। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা ছিল না, ভরসা ছিল ইউটিউব। ভিডিও দেখে দেখেই আয়ত্ত করেন বুননের নানা কৌশল। জিম জানান, প্রথম দিকে নিজের জমানো টাকার সঙ্গে স্বামীর দেওয়া কিছু অর্থ মিলিয়ে মাত্র ছয় হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু হয় ‘তন্তুর সাতকাহন’-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা। সেই ছয় হাজার টাকা আজ পরিণত হয়েছে প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকার চলতি পুঁজিতে। ব্যবসায়ের লভ্যাংশ দিয়েই ব্যবসাকে বড় করছেন তিনি।
জিম বুঝতে পেরেছিলেন, শুধু গতানুগতিক কুশিকাটার কাজ দিয়ে বর্তমান প্রজন্মের ক্রেতাকে আকৃষ্ট করা কঠিন। তাই তিনি একটি নারী উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের ওপর কোর্স করেন। এই কোর্সের জ্ঞান তিনি প্রয়োগ করেন তাঁর কুশিকাটার বুননে। এখন ‘তন্তুর সাতকাহন’-এ বড় বিছানার চাদরের বদলে পাওয়া যায় হাল ফ্যাশনের সব পণ্য। এর মধ্যে রয়েছে–কোরিয়ান ট্রেন্ডি হেয়ার ক্লিপ, স্ট্রবেরি ক্লিপ, ফ্লোরাল বুকে (ফুলের তোড়া), অ্যামিগুরুমি (থ্রিডি পুতুল), ব্যাগ চার্মস, ফোন চার্মস, স্কার্ট এবং বিকিনি টপস।
‘তন্তুর সাতকাহন’-এর কার্যক্রম বর্তমানে পরিচালিত হচ্ছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। জিম খেয়াল করেছেন, মফস্বল বা জেলা শহরগুলোয় হস্তশিল্পের প্রতি মানুষের আগ্রহ থাকলেও অতিরিক্ত দামের কারণে অনেকেই তা কিনতে পারেন না। তাই তিনি চেষ্টা করেছেন পণ্যের দাম মধ্যবিত্তের হাতের নাগালে রাখতে। ২০ টাকার ছোট কি-রিং থেকে শুরু করে দুই-চার হাজার টাকার এক্সক্লুসিভ পণ্য–সবই রয়েছে তাঁর সংগ্রহে। অনলাইনে প্রতি মাসে ৮-১০টি কাস্টমাইজড বড় অর্ডারের পাশাপাশি অফলাইনে স্থানীয় শোরুম এবং মেলাগুলোতেও তাঁর পণ্যের দারুণ চাহিদা রয়েছে।
আমাদের সমাজে বিয়ের পর মেয়েদের ক্যারিয়ার বা নিজের উদ্যোগ নিয়ে কাজ করাটা বেশ চ্যালেঞ্জিং। জিমের ক্ষেত্রে গল্পটা খানিক ভিন্ন। এই সফলতার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা তাঁর স্বামী, যিনি আর্থিকভাবে সাহায্যের পাশাপাশি পণ্যের মান যাচাই ও মতামত দিয়ে তাঁকে সাহায্য করেন। বাবা সামাজিকমাধ্যমে মেয়ের কাজের প্রচার করেন গর্বের সঙ্গে আর শাশুড়ি ঘরের কাজের চাপ কমিয়ে তাঁকে কাজ করার সুযোগ করে দেন। আত্মীয়স্বজনের কাছে প্রশংসায় ভাসান পুত্রবধূকে। জিম বলেন, ‘পরিবারের এমন সমর্থন পেলে যে কোনো নারীর পক্ষেই অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমাকে দেখে এখন আশপাশের অনেক গৃহিণীও নতুন কিছু করার অনুপ্রেরণা পাচ্ছেন।’
জিমের মতে, কুশিকাটার রয়েছে এক মনস্তাত্ত্বিক দিক। বুননের এ কাজটি এক ধরনের ‘সেলফ-হিলিং থেরাপি’ হিসেবে কাজ করে, যা দৈনন্দিন জীবনের মানসিক চাপ কমাতে দারুণ সহায়ক। ব্যবসার ক্ষেত্রে তিনি বিশ্বাস করেন ‘স্লো অ্যান্ড স্টেডি উইনস দ্য রেস’ নীতিতে। ব্যাংক লোন বা ঋণের মানসিক চাপ নিয়ে রাতারাতি বড় হওয়ার চেয়ে নিজের উপার্জিত মুনাফা দিয়ে ধীরে ধীরে ব্যবসাকে বড় করতে চান তিনি। ভবিষ্যতে শুধু পণ্য বিক্রি নয়, ‘তন্তুর সাতকাহন’কে ঘিরে এক অভিনব স্বপ্ন দেখেন এ উদ্যোক্তা। তিনি এমন একটি ‘ক্রোশেট ক্যাফে’ তৈরি করতে চান, যেখানে দেশি-বিদেশি সব ধরনের সুতার সংগ্রহ থাকবে। ক্যাফেতে আসা মানুষ কফি পানের পাশাপাশি নিজেদের পছন্দমতো কুশিকাটার কাজ করতে পারবেন, শিখতে পারবেন।
- বিষয় :
- আশরাফুল ইসলাম আকাশ
- নারী উদ্যোক্তা
