স ম সা ম য়ি ক
নারী সুরক্ষায় দরকার রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন
অ্যাডভোকেট সালমা আলী
অ্যাডভোকেট সালমা আলী
প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬ | ০৭:২২ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ১৮:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি অল্পবয়সী মেয়েদের ওপর যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণের বেশ কয়েকটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। নারী নির্যাতনের এই চিত্র অবশ্য একেবারেই নতুন নয়। তবে ১১ বা ১২ বছরের শিশুর ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বা হওয়া, ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হওয়া কিংবা ধর্ষকের সঙ্গেই তার বিয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা–এসবই আমাদের সমাজে বিদ্যমান নারীবিদ্বেষী ও পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার এক ব্যাপক অবক্ষয়ী রূপকে উন্মোচিত করে। লিখেছেন মানবাধিকার আইনজীবী এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির (বিএনডব্লিউএলএ) উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সালমা আলী
-------------------------------------------------------------------
ক্ষমতায় আসা প্রতিটি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যেই একটি বদ্ধমূল প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়–তারা মনে করে, অত্যন্ত কঠোর কোনো আইন প্রণয়ন করে এবং দু-একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়ে নিজেদের দায়বদ্ধতা প্রমাণ করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইনের এই অতিরিক্ত কঠোরতার সুযোগ নিয়ে অপরাধী বা ধর্ষকরা আগের চেয়ে আরও বেশি সংঘবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
যাদের আমরা ‘পাওয়ার রেপিস্ট’ (ক্ষমতাদর্পী) বা ‘স্যাডিস্ট রেপিস্ট’ (বিকৃত মানসিকতার ধর্ষক) বলে থাকি, তারা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধগুলো অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে সংঘটন করে। এই অপরাধীদের ধরতে গেলে দেখা যায়, তারা ভয়ংকর রকমের ধূর্ত। আইন যতই কঠোর হচ্ছে, তারা প্রমাণ বা আলামত নষ্ট করার জন্য তত বেশি মরিয়া হয়ে উঠছে। এখন তারা ভুক্তভোগীকে কেবল হত্যা করেই ক্ষান্ত হয় না, বরং শরীর টুকরো টুকরো করে গুম করে ফেলে। কারণ তারা জানে, ভুক্তভোগী বেঁচে না থাকলে অপরাধী শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়বে। অত্যন্ত সুকৌশলে প্রমাণ নষ্ট করার এই অশুভ প্রবণতার ফলে সমাজে অপরাধ তো কমেইনি, বরং তা আরও পৈশাচিক ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
আইন প্রণয়নের পাশাপাশি এর যথাযথ প্রয়োগের অভাব আমাদের অন্যতম বড় দুর্বলতা। ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল ঘটনায় ভুক্তভোগীকে কেন্দ্র করে যে ‘ভিকটিম সেন্ট্রিক সাপোর্ট সার্ভিস’ বা সহায়তা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, তা আমাদের নেই। আসামির ভয়ে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে বছরের পর বছর পালিয়ে বেড়াতে হয়। আসামিরা সাধারণত পেশিশক্তি ও অর্থবিত্তে বলীয়ান হয়; বিপরীতে প্রচণ্ড অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করে ভুক্তভোগীর পরিবার।
অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনায় কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী থাকে না। যথাসময়ে প্রমাণ বা আলামত যদি আদালতে উপস্থাপন করা না যায় এবং বিচারপ্রক্রিয়া যদি দীর্ঘায়িত হয়, তখন অপরাধ প্রমাণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এ দীর্ঘসূত্রতার কারণেই অনেক ভুক্তভোগী হাল ছেড়ে দেন, পালিয়ে বেড়ান কিংবা মামলা তুলে নিতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত নির্মমভাবে আসামির সঙ্গেই ভুক্তভোগীর বিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টাও চোখে পড়ে, যা সমাজের জন্য এক অশনিসংকেত।
আমাদের সমাজে অপরাধ প্রতিরোধের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি এবং কোনো সরকারেরই এদিকে দৃশ্যমান কোনো নজর ছিল না, এখনও নেই। সব পর্যায়ে নারীবান্ধব পরিবেশের অভাব প্রকট। বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের শিকার হচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যাশিশুরা। স্কুল-কলেজ, বস্তি, রাস্তাঘাট, কলকারখানা থেকে শুরু করে যাতায়াতের পথ–কোথাও নারীবান্ধব পরিবেশ না থাকায় বেশির ভাগ ভুক্তভোগী অভিযোগ করতেই সাহস পায় না। তারা ভয় পায়, অভিযোগ করলে সমাজে তারা আরও বেশি লাঞ্ছিত হবে, তাদের বা তাদের বোনদের বিয়ে ভেঙে যাবে। থানায় গেলেও অনেক সময় পুলিশ মামলা নেয় না; উল্টো আসামিপক্ষের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে আপস-মীমাংসার জন্য ভুক্তভোগীকে চাপ দেয়। এই ভয়াবহ অরাজকতার কারণেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে।
স্কুল, কলেজ কিংবা মাদ্রাসা– সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা অপরিহার্য। কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন কেউ যোগ দিলে তাঁকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া উচিত, কোন ধরনের আচরণ যৌন হয়রানির পর্যায়ে পড়ে এবং তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ এসব নীতিমালা শুধু কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ।
দেশে অসংখ্য আইন এবং মহামান্য হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তা কেউই যথাযথভাবে মানছে না। অপরাধ প্রতিরোধের কোনো পূর্বপ্রস্তুতি আমাদের নেই; বরং কোনো অঘটন ঘটলে তা ধামাচাপা দেওয়ার এক অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতির। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার মেলে না। দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপ্রার্থীদের অনেকেই হতাশ হয়ে মামলা তুলে নেন। তাছাড়া তদন্ত কমিটির ওপর ভুক্তভোগীদের আস্থার সংকটও প্রকট। অনেক সময় অভিযুক্ত প্রভাবশালী শিক্ষকরা প্রকাশ্যে ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেন, ‘অমুক শিক্ষক তদন্ত করলে আমি তা মানব না।’ এই চিত্র আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়েরই নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে একটি সুদৃঢ় ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা আজ সময়ের দাবি। মামলাগুলোকে যদি উপযুক্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা না হয় এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর যদি যথাযথ মনিটরিং না থাকে, তবে কোনো আইনই কাজে আসবে না। আমাদের প্রয়োজন দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচারপ্রক্রিয়া। রায়ের প্রয়োগ এমনভাবে দৃশ্যমান হতে হবে, যাতে মানুষের মনে এই বোধ জন্মায়–অপরাধ করলে তাঁর শাস্তি অবধারিত।
রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমার একটি জরুরি প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনের আগে ইশতেহারে নারী ও শিশুর সুরক্ষায় তারা যেসব অঙ্গীকার করেছিল, গত তিন মাসে সেগুলোর বাস্তবায়নে তারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে? আগামী তিন মাসেই বা তাদের কর্মপরিকল্পনা কী? দেশে যেভাবে ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি মহামারির আকার ধারণ করেছে, তাতে আমরা তাদের সেই অঙ্গীকারগুলোর প্রথম পদক্ষেপ এখনই দেখতে চাই। আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর একটি দৃশ্যমান ও ইতিবাচক ফলাফল আমাদের প্রাপ্য।
