ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

বাবার দীর্ঘ ছায়া, পরম মমতা

পিতা মানে উদার আকাশ

পিতা মানে উদার আকাশ
×

ফরিদা জামান

ফরিদা জামান, চিত্রশিল্পী ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চারুকলা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৩২ | আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু শূন্যস্থান কখনও পূরণ হয় না, কিছু স্মৃতি কখনও মলিন হয় না। যাঁর ছায়ায় একদিন আমরা নিশ্চিন্তে বড় হয়েছি, যাঁর আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছি জীবনের পথে, সেই মানুষটা আজ দূরে থাকলেও তাঁর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে। সেই বটবৃক্ষকে স্মরণ করে ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে আজকের এই আয়োজন...

পেশায় আমার বাবা সালামত উল্লাহ ছিলেন ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইন্টেলিজেন্সের (এনএসআই) উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। যে কারণে তাঁর জীবনে ছিল চরম গোপনীয়তা আর শৃঙ্খলার মোড়ক। এ কড়া আবরণের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক পরম স্নেহশীল, মুক্তমনা ও সংস্কৃতিবান সত্তা। 
বাবার জন্ম চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের সাচিয়াখালী গ্রামে। ব্রিটিশ আমলে ফরেস্ট সার্ভিস ও সেনাবাহিনী ঘুরে দেশভাগের পর তিনি পুলিশ বিভাগে যোগ দেন। সে যুগে পুলিশে দুর্নীতির দুর্নাম থাকায় আমার দাদা প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাবা দাদাকে কথা দিয়েছিলেন– তিনি চিরকাল সৎ থাকবেন। আমৃত্যু তিনি সেই ওয়াদা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে গেছেন। স্পেশাল ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশে এনএসআইর চট্টগ্রাম ও রাজশাহী কার্যালয় নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন।
উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা হলেও আমাদের যাপিত জীবন ছিল সাদামাটা। সরকারি পদমর্যাদার কারণে গাড়ি, আর্দালি, পিয়ন– সব কিছুরই প্রাপ্য ছিল তাঁর। কিন্তু তিনি আমাদের এসবের ছায়াও মাড়াতে দেননি। আমাদের বাড়িতে কখনও সরকারি আসবাবপত্র ঢোকেনি; নিজেদের যা ছিল, তা দিয়েই চলত জীবন। ১০ বোন, এক ভাইয়ের বিশাল পরিবারে বাবা আমাদের শিখিয়েছিলেন– কীভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে আত্মনির্ভরশীল হতে হয়।
কাজের প্রতি চূড়ান্ত নিবেদিত হলেও পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন আদ্যোপান্ত এক বন্ধু। তিনি এত জোরে হা হা করে হাসতেন, তাঁর অট্টহাসির শব্দ বহুদূর থেকে শোনা যেত। আমার চারুকলার স্যার– কাইয়ুম স্যার, রফিকুন নবী স্যারদের সঙ্গে বাবা এত সহজে মিশে যেতেন, কেউ বুঝতেই পারতেন না তিনি একজন শীর্ষ গোয়েন্দা কর্মকর্তা। আমার চিত্রশিল্পী হয়ে ওঠার পেছনে বাবার নিঃশর্ত প্রশ্রয় সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ছোটবেলায় ইটের গুঁড়া আর চক দিয়ে দেয়ালজুড়ে ম্যুরাল এঁকেছি। বাবা পরম উৎসাহে বন্ধুবান্ধবদের ডেকে মেয়ের কীর্তি দেখাতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় ভর্তির সময়ে বাবা তেমন উৎসাহ দেখাননি, বাধাও দেননি। হাশেম মামার (শিল্পী হাশেম খান) উৎসাহেই মূলত চারুকলায় ভর্তি হওয়া। তবে পড়ার সময় বাবা নিজের হাতে করা বাগানের সবজি নিয়ে হোস্টেলে হাজির হতেন। শুধু আমাকে নয়, অন্য মেয়েদেরও নাম ধরে ডেকে বলতেন, ‘এই কোথায় গেলি তোরা? আয়, আয়, দেখ তোদের জন্য কী নিয়ে এসেছি!’
বিজ্ঞান থেকে শুরু করে তন্ত্রশাস্ত্র– নানা বিষয়ে গভীর পড়াশোনা ছিল তাঁর। বই পড়ে নিজে বুঝতেন, আমাকেও ডেকে ডেকে বোঝাতেন। ভাইবোনদের নিয়ে নিয়ম করে নাটক বা সিনেমা দেখতে যেতেন, অবসরে ব্রিজ খেলা শেখাতেন। এভাবেই অবচেতন মনে তিনি আমাদের ভেতর শিল্পের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। 

আরও পড়ুন

×