ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

বাবার দীর্ঘ ছায়া, পরম মমতা

বাবার কথা

বাবার কথা
×

অমিতাভ রেজা চৌধুরী

অমিতাভ রেজা চৌধুরী, চলচ্চিত্র নির্মাতা

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু শূন্যস্থান কখনও পূরণ হয় না, কিছু স্মৃতি কখনও মলিন হয় না। যাঁর ছায়ায় একদিন আমরা নিশ্চিন্তে বড় হয়েছি, যাঁর আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছি জীবনের পথে, সেই মানুষটা আজ দূরে থাকলেও তাঁর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে। সেই বটবৃক্ষকে স্মরণ করে ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে আজকের এই আয়োজন...

বাবা বলতে আমরা অনেক কিছু বুঝি। বাবা মানে আশ্রয়, নিরাপত্তা, পরিবারের কর্তা। কিন্তু আমার কাছে বাবা শুধু এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। আমার বাবা হারুন রেজা চৌধুরী ছিলেন একজন মানুষ, একজন চিন্তাশীল নাগরিক এবং একজন আধুনিক মননের অধিকারী; যার প্রভাব আজও আমার জীবন ও চিন্তার গভীরে রয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জের হাওরঘেরা এক গ্রামে জন্ম নেওয়া আমার বাবা ছিলেন বামপন্থা রাজনীতির প্রতি গভীরভাবে সংবেদনশীল একজন মানুষ। তিনি কখনও তাঁর বিশ্বাস আমার ওপর চাপিয়ে দেননি। ধর্ম, রাজনীতি কিংবা জীবনদর্শন–কোনো বিষয়েই তিনি আমাকে নির্দিষ্ট কোনো পথে হাঁটতে বলেননি। বরং তিনি আমাকে শিখিয়েছেন প্রশ্ন করতে, চিন্তা করতে এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে। আজ বুঝি, এটাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা। ছোটবেলায় যখন আমাদের বাসায় প্রথম রঙিন টেলিভিশন এলো, মনে হয়েছিল বাবাই বুঝি পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাবান মানুষ। পরে যখন তিনি একটি গাড়ি কিনলেন, তখন মনে হলো বাবাই জীবনের সবকিছু। বড় হতে হতে বুঝলাম, সবচেয়ে বড় সম্পদ এসব নয়; তাঁর সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মুক্তচিন্তা এবং জ্ঞানপিপাসা। আমার বোধ হওয়ার পর থেকে এমন কোনো একুশে ফেব্রুয়ারি মনে পড়ে না, যেদিন বাবা আমাকে বইমেলায় নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন। তিনি আমাকে প্রচুর বই কিনে দিতেন। বইয়ের ভেতর দিয়েই আমি পৃথিবীকে চিনতে শিখেছি। ছোটবেলায় চাণক্য সেনের ‘পিতা-পুত্র’ পড়ে বইয়ের বাবার সঙ্গে আমার বাবাকে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করতাম। তখন বুঝিনি, আমার নিজের বাবার চরিত্রই হয়তো কোনো এক উপন্যাসের নায়ক হওয়ার মতো গভীর এবং সমৃদ্ধ। জীবনের এক অসাধারণ মুহূর্তে আমি সেই বাবাকেই নিয়ে হেঁটেছি প্যারিসের রাস্তায়। তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছি ইতালির ভ্যাটিকান সিটিতে। ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় যে পৃথিবীকে কল্পনা করতাম, সেই পৃথিবীতে বাবাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি ছিল অবর্ণনীয়। মনে হয়েছিল, হাওরের সেই গ্রামের মানুষটি তাঁর স্বপ্নেরও অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে এসেছেন।
আজ বাবা আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর শেখানো মুক্তচিন্তা, তাঁর বইপ্রেম, তাঁর মানবিকতা এবং পৃথিবীকে কৌতূহল নিয়ে দেখার অভ্যাস আমার প্রতিটি সিদ্ধান্তে, প্রতিটি সৃষ্টিতে বেঁচে আছে। আমি যখন পৃথিবীর দিকে তাকাই, তখন অনেক সময় মনে হয় আমি আমার চোখ দিয়ে নয়, আমার বাবার চোখ দিয়েই পৃথিবীকে দেখছি।
এ উত্তরাধিকারই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। 

আরও পড়ুন

×