ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

বাবার দীর্ঘ ছায়া, পরম মমতা

প্রথম গুরু

প্রথম গুরু
×

সালমা আলী

সালমা আলী, মানবাধিকার আইনজীবী ও উপদেষ্টা, বিএনডব্লিউএলএ

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৬ | আপডেট: ২১ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিছু শূন্যস্থান কখনও পূরণ হয় না, কিছু স্মৃতি কখনও মলিন হয় না। যাঁর ছায়ায় একদিন আমরা নিশ্চিন্তে বড় হয়েছি, যাঁর আঙুল ধরে হাঁটতে শিখেছি জীবনের পথে, সেই মানুষটা আজ দূরে থাকলেও তাঁর ভালোবাসা জড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে। সেই বটবৃক্ষকে স্মরণ করে ‘বাবা দিবস’ উপলক্ষে আজকের এই আয়োজন...

আমার জীবনের প্রথম গুরু আমার আব্বা। তাঁর নাম সৈয়দ সিরাজুল হক। নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষের সমতা এবং সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম আমি করে আসছি, এর বীজ রোপিত হয়েছিল আমার বাবার হাতেই। আমাদের বাড়িটি ছিল আক্ষরিক অর্থেই একটি ‘নারীবান্ধব বলয়’। আমাদের সমাজে সাধারণত ধরে নেওয়া হয়, পরিবারের কর্তা মানেই বাবা এবং তাঁর কথাই শেষ কথা। আমার বাবার ক্ষেত্রে বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন ছিল। আমার মায়ের সঙ্গে তাঁর যে সম্পর্ক, সেখানে অপরিসীম পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান ছিল। মাকে তিনি যেমন গুরুত্ব দিতেন, তেমনি মায়ের সিদ্ধান্তগুলোকেও বিনম্রচিত্তে মেনে নিতেন। বাড়ির কর্তা হিসেবে কোনো পুরুষতান্ত্রিক দম্ভ তাঁর ছিল না। বাবার এ মানসিকতাই পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা আমার পরবর্তী জীবনের ভিত গড়ে দেয়।

ছবি :: মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান
আব্বা পেশায় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। মারা যাওয়ার সময় তিনি পুলিশের ডিআইজি (প্রিজন) পদে কর্মরত ছিলেন। পুলিশের মতো একটি কড়া পেশায় থাকলেও মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন দারুণ অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় ও মুক্তমনা। নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, স্থানীয় কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে মেশা, তাদের জীবনযাত্রা দেখা–এগুলো তিনি খুব উপভোগ করতেন। তাঁর সঙ্গে আমার চমৎকার সব স্মৃতি জড়িয়ে আছে। জীবনে প্রথম সিনেমা দেখতে যাওয়ার স্মৃতিটি আব্বার সঙ্গেই, গুলিস্তান সিনেমায়। ছোটবেলায় তাঁর হাত ধরেই জীবনের প্রথম অ্যাডভেঞ্চারগুলোর স্বাদ পেয়েছিলাম।
আমরা তিন বোন, তিন ভাই। ‘ছেলেকে নিয়ে বাইরে যাব, মেয়েকে নিয়ে নয়’– এমন কোনো বৈষম্যমূলক চিন্তা তাঁকে ছুঁতেও পারেনি। পরিবারের যে কোনো বিষয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে আমিই সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতাম। ১৯৬৪ সালের কথা। আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। হঠাৎ হার্ট ফেইলিউরে আব্বা মারা গেলেন। আমার জীবনের এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হলো। কিন্তু বাবা যে প্রগতিশীলতা, শিক্ষা ও সাহসের প্রদীপ আমার মনে জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিলেন, তা কখনও নিভতে দিইনি। আব্বা মারা যাওয়ার চার-পাঁচ বছর পর আমার জীবনসঙ্গীর সঙ্গে পরিচয় হয়। তাঁর মাঝে আমি আমার বাবার সেই প্রগতিশীল সত্তার প্রতিচ্ছবিই দেখতে পেয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে আমি আমার শ্বশুরবাড়িতেও এক অসাধারণ প্রগতিশীল পরিবেশ পেয়েছি। আমার নানি শাশুড়ি ছিলেন জোবেদা খানম চৌধুরী, যিনি দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মুসলিম নারী রাজনীতিবিদ। আমার শ্বশুর আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ তোফাজ্জেল আলী এবং শাশুড়ি সারা আলী–তারাও ছিলেন দারুণ আলোকিত মানুষ। আমার শাশুড়ি মহিলা পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। এতসব আলোকিত মানুষের সান্নিধ্যই আমার জীবনে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজের ক্ষেত্র গড়ে তোলা সম্ভব করেছিল। তবে তা ধারণ করা সম্ভব হয়েছিল আমার বাবার দেওয়া সেই শুরুর স্বাধীনতা আর সঠিক শিক্ষার কারণে। 

আরও পড়ুন

×